kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৫ আষাঢ় ১৪২৭। ৯ জুলাই ২০২০। ১৭ জিলকদ ১৪৪১

ইকামা থাকার পরও সৌদি থেকে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে প্রবাসী কর্মীদের

গত দুই দিনে ফিরেছেন ১০৫ জন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ঢাকার দোহার জয়পাড়া ইউনিয়নের আব্দুল লতিফ মোল্লার ছেলে আনোয়ার হোসেন। আট লাখ টাকা খরচ করে চার বছর আগে পাড়ি দিয়েছিলেন সৌদি আরব। উচ্চ সুদে ঋণের টাকা আর জমি বিক্রি করে ‘ফ্রি ভিসা’য় বিদেশ যান তিনি। সেখানে চার বছর কাজ করে দেশে সর্বমোট পাঠিয়েছিলেন পাঁচ লাখ টাকা। কিন্তু ইকামার মেয়াদ থাকার পরও জোরপূর্বক গত শুক্রবার সৌদি থেকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় আনোয়ার হোসেনকে। মাথায় চার লাখ টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে আনোয়ার হোসেন এখন পাগলপ্রায়।

আনোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘দুই ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে গিয়েছিলাম সৌদি আরব। চার বছর পর আবারও নতুন করে ইকামা লাগিয়েছিলাম সপ্তাহখানেক আগে। কিন্তু ইকামা থাকার পরও কাজ করতে যাওয়ার সময় আটক করে আমাকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে।’ তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এখন মাথায় ঋণের বোঝা, কিভাবে এই টাকা পরিশোধ করব আর ছেলেদের মুখে কী দেব আল্লাহই জানে!’ কাঁদতে থাকেন আনোয়ার হোসেন। একইভাবে ইকামা থাকার পরও জোরপূর্বক পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার গইলা গ্রামের বাচ্চু সরদারকে। বাচ্চু ছয় লাখ টাকা খরচ করে আড়াই বছর আগে গিয়েছিলেন সৌদি আরব। ভিটেমাটি বন্ধক আর ঋণ করে বিদেশ গেলেও অভিবাসন ব্যয়ের টাকা ওঠানোর আগেই দেশে ফেরত আসতে হয়েছে। বাচ্চু সরদার বলেন, ‘আড়াই বছরে ঋণের তিন লাখ টাকাও পরিশোধ করতে পারিনি। এর মধ্যে ইকামা থাকা সত্ত্বেও আমাকে ধরে ফেরত পাঠিয়েছে। এখন আমি পথের ফকির হয়ে গেছি।’

সৌদি আরবফেরত আনোয়ার হোসেন আর বাচ্চু সরদারই নন, ইকামা থাকার পরও সৌদি থেকে এখন প্রতি সপ্তাহেই প্রবাসী কর্মীদের দলে দলে দেশে ফেরত আসতে হচ্ছে। সৌদি সরকারের বিশেষ অভিযানে আটক হয়ে তাঁদের খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে দেশে। দেখা গেছে, সৌদি আরব থেকে ধরপাকড়ের মুখে চলতি মাসেই দেশে ফিরতে হয়েছে ৪৪১ প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীকে। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে, এভাবে চলতি বছরে সৌদি থেকে প্রায় ১২ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিক দেশে ফিরলেন। উচ্চ সুদে ঋণ, ভিটেমাটি বিক্রি কিংবা বন্ধক রেখে পরিবারের অভাবমোচনের স্বপ্ন নিয়ে সৌদি গেলেও অল্প সময়ের মধ্যেই দেশে ফেরত এসে অনেকেরই পথে বসার উপক্রম হয়েছে।

সবশেষ গত দুই দিনে সৌদি আরব থেকে আরো ১০৫ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে গত সোমবার রাত ১১টা ২০ মিনিটে সৌদি এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ৪২ জন ও মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টা ১৫ মিনিটে ৬৩ জন দেশে ফিরে আসেন। অন্য দিনের মতো গতকালও ফেরত আসা কর্মীদের বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সহযোগিতায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রগ্রাম থেকে খাবার পানিসহ নিরাপদে বাড়ি পৌঁছানোর জন্য জরুরি সহায়তা দেওয়া হয়।

ফেরত আসা ব্যক্তিদের একজন পিরোজপুরের শামীম আহম্মেদ বলেন, ‘মাত্র দেড় মাস আগে সাড়ে তিন লাখ টাকা দিয়ে সৌদি আরব গিয়েছিলাম। কিন্তু ইকামা থাকা সত্ত্বেও আমাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।’ আরেক কর্মী মুন্সীগঞ্জের মহিউদ্দিন জানান, দশ বছর ধরে সৌদি আরবে ছিলেন। ইকামাসহ বৈধভাবেই ছিলেন। দুই দিন আগে এশার নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়ার জন্য রুম থেকে বের হলে সৌদি ইমিগ্রেশন পুলিশ তাঁকে আটক করে। ওই সময় তিনি ইকামার কাগজপত্র দেখালেও তাঁকে ছেড়ে না দিয়ে ধরে নিয়ে যায়। আটকের কারণ জানতে চাইলে উল্টো মারধর করা হয়।

শুধু শামীম ও মহিউদ্দিনই নন, এমনই দুর্ভোগের কথা জানান নোয়াখালীর সাইফুল, কুমিল্লার রাজু মিয়া, ঢাকার রাসেলসহ আরো অনেকে। দেশে ফেরা কর্মীদের অভিযোগ, তাঁদের ইকামা থাকা সত্ত্বেও তাদের ধরে সবজি, খেজুর ও পানি বিক্রিসহ ভিক্ষা করার মতো মিথ্যা অভিযোগ এনে দেশে পাঠানো হচ্ছে।

ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘প্রতি সপ্তাহেই কমবেশি সৌদি থেকে প্রবাসীরা দেশে ফিরছেন। আর চলতি মাসেই দেশে ফিরলেন ৪৪১ কর্মী। এ বছর ১০ থেকে ১১ হাজার কর্মী সৌদি আরব থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সাধারণত ফ্রি ভিসার নামে গিয়ে এক নিয়োগকর্তার বদলে আরেক জায়গায় কাজ করলে কর্মীদের ফেরত পাঠানো হতো। কিন্তু এবার ফেরত আসা কর্মীদের অনেকেই বলছেন, তাঁদের বৈধ ইকামা ছিল। আসলেই এমনটা হয়েছে কি না সেটা দূতাবাস ও মন্ত্রণালয় খতিয়ে দেখতে পারে। কেন বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে সেই কারণটা বের করে করণীয় ঠিক করা উচিত, যাতে নতুন করে যাঁরা যেতে চাইছেন তাঁরা বিপদে না পড়েন।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা