kalerkantho

রবিবার। ১৬ কার্তিক ১৪২৭ । ১ নভেম্বর ২০২০। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

বিশ্ব ডাক দিবস

পাঁচ বছরে লোকসান ১৭২৬ কোটি টাকা

অচলাবস্থায় দেশের বেশির ভাগ পোস্ট অফিস

তানজিদ বসুনিয়া   

৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘যত লিখে যাই, তবু না-ফুরায়, চিঠিতো হয় না শেষ’ কবি প্রণব রায়ের এ কাব্যগীতি কিংবা রানারকে নিয়ে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার ‘রাত নির্জন, পথে কত ভয়, তবুও রানার ছোটে/দস্যুর ভয়, তারও চেয়ে ভয় কখন সূর্য ওঠে’ লাইনের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় চিঠি নিয়ে মানুষের আবেগ কিংবা পোস্ট অফিসের কর্মীদের ব্যস্ততা। এই তো দশক দুয়েক আগেও দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল চিঠি। দূরবর্তী কোনো শহরে কর্মরত ছেলেকে মা-বাবার উপদেশ মিশ্রিত আশীর্বাদ কিংবা পরিবারের হালহকিকত জানানো, ভাইয়ের কাছে বোনের অনুযোগ-আবদার, স্বামীর কাছে নিজের রাগ-অভিমান মিশ্রিত ভালোবাসার বার্তা আদান-প্রদানের প্রধান মাধ্যম ছিল চিঠি। পত্র কিংবা মানি অর্ডারের জন্য ডাক হরকরার পথ চেয়ে থাকা মা-বাবা কিংবা ফিরতি চিঠির দিন গুনতে থাকা সহধর্মিণীকে অপেক্ষার প্রহর পার করতে দেখা যায় না এখন আর।

ডাক বিভাগের মাধ্যমে এখনো চিঠি আদান-প্রদান চললেও সেগুলো মূলত বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিস আদেশ, ব্যাংক, বীমা কম্পানির করপোরেট চিঠি। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে জৌলুস হারিয়ে ফেলছে একসময়ের ব্যস্ততম পোস্ট অফিসগুলো। অফিসে বসে অলস সময় কাটাচ্ছেন পোস্ট অফিসের কর্মচারীরা। আর বছরের পর বছর ধরে লোকসান গুনতে হচ্ছে সরকারকে। এভাবে গত পাঁচ বছরে সরকারকে লোকসান গুনতে হয়েছে এক হাজার ৭২৬ কোটি টাকারও বেশি।

ডাক বিভাগ সূত্র জানায়, ২০১৩-১৪ সালে তাদের মোট আয় ছিল ২১৯ কোটি টাকা আর ওই বছর ব্যয় হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি, ৪৪৮ কোটি টাকা। পরের তিন বছর সরকারের লোকসান হয়েছে যথাক্রমে ২৩৪ কোটি, ৩৬৪ কোটি ও ৪৫২ কোটি টাকা।

ডাক বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে মোট পোস্ট অফিসের সংখ্যা ৯ হাজার ৮৮৬টি। পোস্ট অফিসগুলো চালাতে ডাক বিভাগে মোট ৩৯ হাজার ৮৮৮ জন কর্মরত আছেন। দীর্ঘদিন থেকে সংস্কারের জন্য বড় ধরনের বরাদ্দ না হওয়ার কারণে বর্তমানে বেশির ভাগ ডাকঘরের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের পোস্ট অফিস দেখে ডাক বিভাগের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

২০০৪ সালেও দেশে যেখানে ২৩ কোটি চিঠি লেনদেন হয়েছে, সেখানে ২০১৭-১৮ সালে তা এসে ঠেকেছে মাত্র চার কোটি ১৭ লাখে।

দেশব্যাপী প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সাড়ে ৯ হাজারেরও বেশি পোস্ট অফিসের বেশির ভাগই আশানুরূপ সার্ভিস না পাওয়ায় মানুষ সম্ভাবনাময় এ সেবা খাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বলে মনে করে অনেকে। গত রবিবার বনানী ও গুলশান পোস্ট অফিসে গিয়ে মানুষের ভিড় পাওয়া গেলেও তারা সবাই ছিল মূলত ডাক বিভাগের সঞ্চয় সেবার গ্রাহক। গুলশান পোস্ট অফিসের পোস্ট-মাস্টার আবদুস সালাম আজাদ বলেন, ‘তথ্য-প্রযুক্তির উন্নয়ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মায়ের চিঠি, ভাই-বোনের চিঠি কমে গেছে। এখন ব্যাংক-বীমা কম্পানির হাজার হাজার চিঠি আসে; কিন্তু আগের মতো সেই আবেগটা নেই।’

তবু আশায় বাঁধি বুক : এরই মধ্যে দেশের সব ডাকঘরকে একটি ইলেকট্রনিক নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে ‘ডাক বিভাগের কার্যপ্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়করণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। এর ফলে মানি অর্ডার, চিঠি নিবন্ধন, ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকসহ অন্য কাজগুলো একীভূত সফটওয়্যারের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। এ ছাড়াও ‘তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর গ্রামীণ ডাকঘর নির্মাণ’ প্রকল্পের কাজও শেষ হয়েছে।

ডাক বিভাগের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটি (লোকসান) মূলত দীর্ঘদিনের অবস্থা। দীর্ঘদিন সময়ের সঙ্গে সংগতি রেখে ডাক বিভাগের তেমন পরিবর্তন আনা হয়নি, এর উন্নয়নের দিকে তেমন নজর দেওয়া হয়নি। এ বিভাগের জন্য প্রযুক্তিগত এবং মানবসম্পদের পরিবর্তন জরুরি।’

মন্তব্য