kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

বিশ্ব নদী দিবস আজ

বিষাক্ত তরলের ভাগাড়ই রইল বুড়িগঙ্গা-তুরাগ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিষাক্ত তরলের ভাগাড়ই রইল বুড়িগঙ্গা-তুরাগ

বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে গতকাল রাজধানীর শাহবাগে শোভাযাত্রা বের করে কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠন। ছবি : কালের কণ্ঠ

সোয়ারিঘাট থেকে আটিবাজার কিংবা বছিলা থেকে কলাতিয়া যেতে বুড়িগঙ্গা কিংবা তুরাগের অংশের পানির রং একই। কোথাও গাঢ় কালো, কোথাও বা তামাটে। খালি চোখেই ঘন অবস্থা বুঝতে অসুবিধা হয় না কারো। ঢেউয়ের তালে ভেসে ওঠা পানির ফেনা গিয়ে তীরের যেখানে আছড়ে পড়ে সেই ইট কিংবা লোহার পিলারের ক্ষয় দেখেও তা স্পষ্ট হয়। বছিলার নৌকা মাঝি আফজাল হোসেন বলেন, ‘এইডিরে পানি কইয়েন না, এইডি ক্ষার অইয়া গেছে গা, ইট আর লোহাও খাইয়া ফালাইতাছে। আপনে হারা নদী খুইজ্যাও একটা মাছ পাইতেন না’। একটু থেমে অবিরাম উঠতে থাকা বুদবুদ দেখিয়ে আবার বলেন, ‘এই যে বোটকা ওটতাছে দেখতাছেন, এইগুলা অইছে কেমিক্যালের গ্যাস। পানিগুলোর নিচে কোনো মাটি নাইক্কা, গাদ অইয়া গ্যাছে। হেরতন গ্যাস উঠতাছে’।

স্কুলে পড়ালেখা না করলেও এর-ওর কাছ থেকে জেনেশুনে ও আশাপাশের কলকারখানা থেকে নির্গত তরল বর্জ্য দেখে এমন দক্ষ পর্যবেক্ষক হয়ে উঠেছেন আফজাল। বুড়িগঙ্গা-তুরাগের সব মাঝিরই এমন অভিজ্ঞতা।

পানিদূষণ নিয়ে কাজ করা বুয়েটের অধ্যাপক ড. আশ্রাফ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, বুড়িগঙ্গা আর তুরাগের পানির দূষণমাত্রা একই ধরনের। নদীকে বাঁচাতে হলে সবার আগে দূষণ রোধে ব্যবস্থা নিতে হবে। নদীতে তরল বা শক্ত সব ধরনের বর্জ্য ফেলা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রধানত কলকারখানার নানা ভারী ধাতুর তরল বর্জ্যেই নদ-নদীর প্রাণশক্তি হারিয়ে যাচ্ছে। এতে দৃশ্যত পানি থাকলেও বাস্তবে তা আর প্রকৃত পানি নয়। বরং বলতে হবে বিষাক্ত তরলের ভাগাড়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, নদ-নদী বাঁচাতে হলে অবৈধ দখল উচ্ছেদ, সীমানা নির্ধারণের পাশাপাশি দূষণ রোধেও জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে তেমন কোনো সুফল আসবে না। বিশেষ করে নদ-নদীর সীমানা থাকলেও পানিতে যদি প্রাণ না থাকে তবে একসময় ওই নদী আর টিকবে না। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই দেশে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব নদী দিবস।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ২০০৫ অনুসারে (সংশোধিত-২০১০) সরকার ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদ-নদীকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা  করেছে। যার মাধ্যমে এই সব নদ-নদীর পানি জীববৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) রুবিনা ফেরদৌসী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা যেসব শিল্প-কারখানা থেকে তরল বর্জ্য নদীতে যায় সেগুলোর তালিকা করেছি। এই তালিকা ধরে আমরা অভিযানে গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। যেমনটা চলতি মাসে দুই দফা আমরা বুড়িগঙ্গা ও বালু নদীর সংযোগে থাকা বেশ কিছু শিল্প-কারখানার তরল বর্জ্যের সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছি। এর মধ্যে শ্যামপুর এলাকায় ১৬টি প্রতিষ্ঠানের সংযোগ বন্ধ করা হয়েছে। যেগুলোর একটিরও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইউনিট নেই। তবে এর মধ্যে একাধিক প্রতিষ্ঠান আদালতে গিয়ে আমাদের আদেশের বিরুদ্ধে স্থিতাবস্থার আদেশ নিয়ে এসেছে। অবশ্য আদালত ওই প্রতিষ্ঠানগুলোকে তিন মাসের মধ্যে ইটিপি স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে।

বুয়েটের পানিবিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক মো. রাশেদুল ইসলাম হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে নেওয়ার পর বুড়িগঙ্গায় পানির দূষণমাত্রার পরিস্থিতি দেখার জন্য একটি গবেষণা পরিচালনা করেছেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে দুই দফা বুড়িগঙ্গার ৯টি পয়েন্টের পানির স্যাম্পল সংগ্রহ করে ১১টি প্যারামিটারে পরীক্ষা করা হয়। উভয় বছরের শুকনো মৌসুমে (জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ) একই জায়গার পানির দূষণমাত্রা বিওডি পরীক্ষা করে তেমন কোনো পরিবর্তন পাওয়া যায়নি। প্রথম বছর পাওয়া যায় দশমিক ২, আর পরের বছর তা পাওয়া যায় দশমিক ৩। কিন্তু যেকোনো পানিতে জীববৈচিত্র্যের জন্য কমপক্ষে বিওডি ৫ থাকা অপরিহার্য।

তবে ওই গবেষক একই সময়ের পানিতে কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ডে অনেকটা ভিন্নতা পেয়েছেন। তিনি জানান, ২০১৭ সালে ট্যানারি হাজারীবাগ থেকে সরানোর কাজ শুরু হয়। তখন পানিতে সিওডি ছিল ৬৫-১৫৫, যা ২০১৮ সালে নেমে আসে ৫৫-৮৫তে।

গবেষক রাশেদুল আরো বলেন, ‘আমার পর্যবেক্ষণ হচ্ছে শুধু ট্যানারিই নয়, আশপাশের অন্যান্য কলকারখানার বর্জ্য বুড়িগঙ্গা দূষণের জন্য দায়ী। সেই সঙ্গে বুড়িগঙ্গার তলদেশের বর্জ্য অপসারণে আরো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা