kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

অপকর্ম সংঘর্ষের বিচার কমিটি গঠন পর্যন্তই

শুভ আনোয়ার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সময় তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে সংঘর্ষ কিংবা বিভিন্ন ধরনের অপকর্মে জড়িয়ে পড়লেও কোনো ঘটনারই বিচারই করতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। খতিয়ে দেখা হয় না তাদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন ধরনের অভিযোগও। অধিকাংশ ঘটনা শুধু লিখিত অভিযোগ আর তদন্ত কমিটি গঠনের মধ্য দিয়েই শেষ হয়। তদন্তের মেয়াদ পার হলেও আসে না কোনো প্রতিবেদন। প্রশাসনের দাবি, শিক্ষকরা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকায় এবং তদন্ত কমিটিতে থাকতে আগ্রহী না থাকায় এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগও তদন্ত কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে দায় সারে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। কদাচিৎ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দু-চারজন জুনিয়র কর্মীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। তবে বহিষ্কার করলেও তারা সক্রিয় থাকে একাডেমিক কাজে। আবার অনেক অপরাধের ঘটনা তদন্ত কমিটি করার অবস্থায় পর্যন্ত পৌঁছে না, প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করেই সমাধান করা হয়। সময়ের স্রোতে একসময় তা চাপা পড়ে যায়। নতুন কোনো ঘটনা এসে হাজির হয়। শিক্ষার্থীদের দাবি, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজ প্রশাসনকে টিকিয়ে রাখতেই ছাত্রলীগের বিচার করে না এবং বিচার করতে ভয় পায়।’

গত এগারো মাসের কয়েকটি বড় ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার ঘটনায় রাত ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হল এবং আলবেরুনী হলের ছাত্রলীগ কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে দুই হলের অন্তত ৪০ জন ছাত্রলীগকর্মী আহত হয়। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও এখনো চলছে তদন্ত। ছাত্রলীগের উপছাত্রবৃত্তি-বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ আলীসহ মীর মশাররফ হোসেন হলের ১১ ছাত্রলীগকর্মীর বিরুদ্ধে প্রক্টরের কাছে মারধরের লিখিত অভিযোগ করেন গণিত বিভাগের (৪২তম ব্যাচ) শিক্ষার্থী নাজমুল হুদা। তৎকালীন প্রক্টর সিকদার মো. জুলকারনাইন লিখিত অভিযোগ নিয়েই দায় সেরেছেন।

চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি ছাত্রলীগের সহসম্পাদক হাবিবুর রহমান লিটন এবং কর্মী সৈয়দ লায়েব আলীর বিরুদ্ধে প্রক্টর এবং দর্শন বিভাগের সভাপতির কাছে একটি ট্রাভেল এজেন্সির মালিক মিজানুর রহমান ৯৫ হাজার ৫০০ টাকা ছিনতাইয়ের মৌখিক অভিযোগ করেন। তখন সদ্য ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ফিরোজ উল হাসান বলেছিলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব। এ ঘটনার কোনো সুরাহা হয়নি।

১৩ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ বাণিজ্যের টাকার ভাগ নিয়ে চলে আসা বিরোধের জের ধরে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমান সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে চড়-থাপ্পড়ের ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে দুই হলে তাঁদের অনুসারীদের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষে ছয় রাউন্ড গুলিবিনিময় হয়, প্রক্টরসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়। এ ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির কাজ আজ অবধি চলছেই।

গত ২৬ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক শিক্ষার্থীর মালিকানাধীন ‘দি ইউনাইটেড কনস্ট্রাকশন কম্পানি লিমিটেড’ উপাচার্যের কাছে অভিযোগ করে, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের ছয়টি হল নির্মাণের দরপত্রের শিডিউল ছিনিয়ে নিয়েছে। এই অভিযোগও খতিয়ে দেখা হয়নি। সর্বশেষ ৩ জুলাই ধাক্কা লাগার মতো তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ও মওলানা ভাসানী হলের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে দুই ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে প্রক্টরিয়াল বডির সদস্য, পুলিশসহ কমপক্ষে ৮০ জন আহত হয়। ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে ৬ জুলাই তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তাদের পক্ষ থেকেও আসেনি কোনো প্রতিবেদন।বড় ঘটনাগুলোর পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ছোট ঘটনা রয়েছে, যেগুলো কখনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা কারোরই দৃষ্টিগোচর হয়নি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৯ মার্চ ফেসবুকের স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও দৈনিক বণিক বার্তার ক্রীড়া প্রতিবেদক আহমেদ রিয়াদকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগের সহসভাপতি নাহিদ হোসেনের বিরুদ্ধে। ২০ মে রাতে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ‘অপ্রীতিকর’ মন্তব্য করার অভিযোগে শহীদ সালাম বরকত হলের এক শিক্ষার্থীকে মারধর করে হল থেকে বের করে দেয় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলে চুরির দায়ে ছাত্রলীগকর্মীকেই হল থেকে বের করে দিয়েছিল ছাত্রলীগের কর্মীরা। ১৫ জুলাই রাতে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষার্থীকে মারধর করেন ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা। সব মিলিয়ে গত এগারো মাসে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের তিনটি বড় ধরনের সংঘর্ষসহ অপকর্মের ঘটনা ঘটেছে প্রায় ১৪টি, যার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছোট দুটি ঘটনার বিচার করতে পেরেছে। এ প্রসঙ্গে ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম অনিক বলেন, “কেন্দ্রীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি এবং ছাত্রলীগের সাথে সুসম্পর্ক বজায় না রাখলে এখানকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসকরা টিকতে পারেন না, কিংবা পরবর্তীতে আরো ‘বড় পদের প্রশাসক’ হওয়ার দৌড় থেকে ছিটকে পড়েন। সে কারণে উনারা বিচার করতে ভয় পান।”

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট জাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ দিদার বলেন, ‘মূলত প্রশাসন সব সময়ই একটি সন্ত্রাসী বাহিনী তৈরি রাখতে চায়, যারা বিরুদ্ধ মতামতকে দমন করবে। নিজেরা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ক্ষমতাসীনদের পদলেহন করে।’

কয়েকটি ঘটনার তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক রাশেদা ড. আখতার বলেন, ‘একটি ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জমা দিয়েছি। আর এখনো একটি ঘটনার তদন্ত চলছে এবং একটি (৩ জুলাইয়ের ঘটনা) মোটামুটি প্রস্তুত, ফাইনাল করে প্রতিবেদন জমা দেব।’

জাবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানা এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাংগঠনিকভাবে আমরা তো কাউকে বহিষ্কার করতে পারি না। আমরা বহিষ্কারের জন্য, শাস্তির জন্য কেন্দ্রকে সুপারিশ করতে পারি।’

প্রক্টর আ স ম ফিরোজ উল হাসান বলেন, ‘ছাত্রলীগ মানেই যে তদন্ত হচ্ছে না, বিচার হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। হচ্ছে, তবে প্রক্রিয়াটা দীর্ঘমেয়াদি। শিক্ষকরা আসলে তদন্ত কমিটিতে কাজ করতে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। ব্যস্ত থাকার কারণে তদন্তের সাথে জড়িত থাকতে চান না অনেকে। যেহেতু ছোট-বড় মিলিয়ে অনেক ঘটনা ঘটে বিশ্ববিদ্যালয়ে, তাই কারো কারো ওপর চার-পাঁচটি করে তদন্তের ভার থাকে। তো এভাবে একটার পর একটা শেষ করতেই দেরি হয়ে যায়।’

ছাত্রলীগের বিচারে কোনো চাপ থাকে কি না—প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘সব সময় চাপ থাকে না। ছোট-বড় অনেক ঘটনায় চাপ ঠিক বলা যাবে না, ওরা দাবি করে বসে যে তাদের সংশ্লিষ্টতা ছিল না।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা