kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস আজ

স্কুলবিমুখ চরের ছেলে-মেয়েরা

বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের উপস্থিতিও কম

পটুয়াখালী প্রতিনিধি   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



স্কুলবিমুখ চরের ছেলে-মেয়েরা

রাস্তার অভাবে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজের গাজীপাড়া এলাকার শিশু শিক্ষার্থীদের বর্ষা মৌসুমে কোমরপানি মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। এভাবে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করায় বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে তারা। ছবি : ফাইল ছবি

দুই প্রতবেশী কন্যা রূপা ও নাসরিন। তারা খেলার সাথীও। সারাটা সময় তারা একসঙ্গে কাটায়। তাদের বাড়ি পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার পূর্বদিক দিয়ে বঙ্গোপসাগরে বহমান তেঁতুলিয়া নদীর বুকে জেগে ওঠা চর চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের মিয়াজান গ্রামে। তারা তাদের বাড়ির পাশের চর রায়সাহেব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু ওখানে গিয়ে লেখাপড়া করা সম্ভব নয়। তাই মাছ ধরে কিংবা সংসারের কাজে মাকে সাহায্য করে বেশির ভাগ সময় কাটিয়ে দেয় তারা।

স্কুলে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে দীর্ঘ সময় কথা হয় তাদের সঙ্গে। তাদের বক্তব্য, অভাবের সংসার। তাদের খাতা-কলম কিনে দেওয়ার মতো অবস্থা মা-বাবার নেই। এ কারণে স্কুলের পরিবর্তে সংসারের নানা কাজে মা-বাবাকে সাহায্য করে। তা ছাড়া এ এলাকার ছেলে-মেয়েরা ধানের ছড়া, আলু ও ডাল কুড়িয়ে, মাঠে গরু চড়িয়ে, বনাঞ্চলে কাঠ কেটে, নদী কিংবা সাগরে মাছ শিকারে গিয়ে টাকা আয় করে।

সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চন্দ্রদ্বীপ চরের কাদাপানির রাস্তায় হেঁটে দেখা গেছে, বেশির ভাগ শিশু সংসারের আয় বাড়ানো নিয়ে ব্যস্ত। কেউ বড়শি দিয়ে, কেউবা জাল দিয়ে মাছ ধরছে। কেউ আবার বড় ভাই কিংবা বাবার সঙ্গে নদীতে ইলিশ শিকারে ব্যস্ত। লেখাপড়ার তাগিদ থাকলেও ওরা অভাবের কাছে অসহায়।

দক্ষিণ চর ওয়াডেলের নাঈম (৮) নামের এক শিশু বলে, ‘আমাগো তো স্কুলে যাইতে মোন চায়। কিন্তু কেমনে জামু। ঘরে চাউল না থাকলে স্কুল আর লেহাপড়া দিয়া কি অইবে? এই লইগ্যা স্কুলে ভর্তি অওনের (হওয়ার) পরও আমার পড়ালেহা অয় নাই। আমি এ্যাহন আর স্কুলে যাই না।’

একই এলাকার অভিভাবক খলিল ব্যাপারী বলেন, ‘আমাগো গুরাগ্যারারে (ছেলে-মেয়ে) চাইলেও আমরা লেহাপড়া করাইতে পারি না। সরকার যদি তরের (মূল ভূখণ্ড) স্কুলের ছাত্রছাত্রীকে মাসে ৫০০ টাহা উপবৃত্তি দেয় আমাগো চরের স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীগোরে এক হাজার টাহা দেতে অইবে। চরের স্কুলের শিক্ষকের সংখ্যা তরের স্কুলের শিক্ষকের সংখ্যার চেয়ে বেশি থাকতে অইব। রাস্তাঘাট ভালো করতে অইবে। স্কুলে স্যারেগো ডেইলি আজিরা নিশ্চিত করতে অইবে। চরের যে ছেলে-মেয়ে আইএ (এইচএসসি), বিএ পাস করছে হেইসব পোলাপানরে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে অইবে। এইসব বাস্তবায়ন না অইলে চরের পোলাপানরে স্কুলে পাডান বা শিক্ষিত করা অসম্ভব।’

চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের পাঁচটি বিদ্যালয়ে ২৬ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও শিক্ষক রয়েছে মাত্র ১৫ জন। বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এসব শিক্ষকের উপস্থিতিও বিদ্যালয়ে কম। চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নে চারটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। অনেক শিশু স্কুলে ভর্তি হলেও অভাবের কারণে স্কুলে যায় না।

বাউফল উপজেলার চন্দ্রদ্বীপের পাশাপাশি দশমিনা উপজেলার চর হাদি, চর শাহজালাল, পাতারচর, চর বোরহান, গলাচিপা উপজেলার চর কারফারমা, বলইবুনিয়া, চর বিশ্বাস ও চরকাজল এবং রাঙ্গাবালী উপজেলার চর বেষ্টিন, চর রুস্তুম, মধ্যচর মোন্তাজ, বাইলাবুনিয়া, চরলক্ষ্মী, চর গঙ্গা, মধুখালী, পশ্চিম মৌডুবি, গরুভাঙা এলাকারও একই চিত্র।

রাঙ্গাবালী উপজেলার চরলক্ষ্মী এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ওই এলাকার বেশির ভাগ শিক্ষার্থী বর্ষা মৌসুমে স্কুলে যায় না। চরমোন্তাজ ইউনিয়নের গাজীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তার অভাবে স্কুলে যাওয়া থেকে বিরত থাকে। স্কুলে যাওয়া-আসার রাস্তা না থাকা ও অভাবের কারণে বছরের বেশির ভাগ সময় তারা স্কুলবিমুখ থাকে।

সাবেক এনজিওকর্মী হেমায়েত উদ্দিন বলেন, ‘পটুয়াখালীর চরাঞ্চলসহ উপকূলের বেশির ভাগ মানুষ সুবিধাবঞ্চিত। এসব মানুষকে মূল স্রোতের সঙ্গে নিয়ে আসতে হলে আলাদা চর নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে, যা সরকারের কাছে আমাদের প্রস্তাব দেওয়া রয়েছে। তা না হলে চরের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ কোনো অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’

এ ব্যাপারে পটুয়াখালী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ছাইয়াদুজ্জামান বলেন, ‘চরাঞ্চলের শিশুরা শতভাগ স্কুলে ভর্তি রয়েছে। তবে এটা ঠিক যে তাদের শতভাগ উপস্থিতি আমরা এখনো করতে পারিনি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা