kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বগুড়া আওয়ামী লীগ

দলীয় কার্যালয় ছেড়ে নেতারা বসেন ব্যক্তিগত অফিসে

লিমন বাসার, বগুড়া   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। কিন্তু দলটির বগুড়া জেলা শাখার কার্যালয়ের চেহারা পাল্টায়নি। প্রায় ২৫ বছর ধরে সংস্কার করা হয় না কার্যালয়ের। কর্মসূচি না থাকলে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও আসেন না। আসেন না দলের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও। তাঁরা ব্যস্ত তাঁদের ব্যক্তিগত কার্যালয় নিয়ে। সেখানেই সংগঠনের কাজ ছাড়া ব্যক্তিগত দেনদরবার ও ব্যাবসায়িক কাজ করে থাকেন তাঁরা।

বিগত ১৯৯৪ সালে বিরোধীদলীয় নেতা থাকাকালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বগুড়া শহরের টেম্পল রোডে জেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ের ফলক উন্মোচন করেন।

বগুড়া জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখার তথ্য অনুসারে, ১০ শতাংশ পরিমাণের এই জায়গাটি অর্পিত সম্পত্তি। সামনের দিকে ব্রিটিশ আমলের দ্বিতল ভবন রয়েছে। একটি সরু গলিপথ পেরিয়ে পাশাপাশি দুটি ঘর। এর একটি জেলা আওয়ামী লীগ এবং অন্যটি জেলা ছাত্রলীগ ব্যবহার করে। জায়গাটি জেলা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নামে ইজারা নেওয়া। সামনের ছাউনি দেওয়া খোলা হল রুমের মতো অংশে দলের অন্য সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ, শহর আওয়ামী লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ ব্যবহার করে থাকে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শতবর্ষী এই ভবনসহ জায়গাটি দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগ ব্যবহার করলেও কোনো সংস্কার করেনি। দ্বিতল ভবনটির ওপরতলা বামপন্থী কয়েকটি দল তাদের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করে। আর ভেতরের খোলা অংশের টিন, বাঁশ, চাটাই ভেঙে গিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে বহু আগেই; যার কারণে একটু বৃষ্টি হলেই ভেতরে এক হাঁটু পানি জমে যেত। বাথরুমগুলো প্রায় তিন বছর হলো নষ্ট হয়ে গিয়ে অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সম্প্রতি এ অংশটির সংস্কারকাজ শুরু করেছে ছাত্রলীগ। 

জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত মমতাজ উদ্দিন তাঁর ব্যক্তিগত কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করতেন বগুড়া চেম্বার অব কমার্স ভবনের একটি অংশকে। দলীয় অনুষ্ঠান ছাড়া তিনি কখনোই জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে আসতেন না। এ কারণে অন্যরাও এ ব্যাপারে আগ্রহী হয়নি। মমতাজ উদ্দিন মারা গেছেন দেড় বছর হলো। এখন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে রয়েছেন বগুড়া জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ডা. মকবুল হোসেন। তিনিও দলীয় অনুষ্ঠান না থাকলে কার্যালয়ে আসেন না। জেলা পরিষদ ভবনে তাঁর কার্যালয়েই সময় কাটান।

জানা গেছে, বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ, এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতারা কেন্দ্রীয় কর্মসূচি না থাকলে দলের জেলা শাখার কার্যালয়ে আসেন না। নিজেদের ব্যক্তিগত বা কর্মস্থলের কার্যালয়ে বেশি সময় কাটান। সেসব কার্যালয় ঘিরেই অন্য নেতাকর্মী ও সমর্থকদের আনাগোনা থাকে বেশি। বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মজিবর রহমান মজনু শেরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। তিনি শেরপুরে উপজেলা পরিষদ এবং শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় তাঁর ব্যক্তিগত কার্যালয়ে বসেন। দলের যুগ্ম সম্পাদক তিনজনের মধ্যে প্রথম রাগিবুল আহসান রিপু শহরের শেরপুর রোডে একটি ভবনে বসেন। দ্বিতীয় টি জামান নিকেতা শহরের টাউন ক্লাব ছাড়া সূত্রাপুরে তাঁর বাড়িতে নেতাকর্মীদের সময় দেন। তৃতীয় যুগ্ম সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম মোহন শহরের দত্তবাড়ি এলাকায় অবস্থিত তাঁর ব্যক্তিগত কার্যালয়ে দলীয় ও ব্যাবসায়িক কাজ করেন। দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুর রহমান দুলু জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান। তিনি সেখানে তাঁর ব্যক্তিগত কার্যালয়কে দলীয় কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করেন। এ ছাড়া রহমাননগর এলাকার নিজ বাড়িতেও সময় দেন।

জেলা যুবলীগের সভাপতি শুভাশীষ পোদ্দার লিটন শহরের করতোয়া নদীর পাশে জহুরুল ইসলাম ঘাট এলাকায় দলীয় কার্যালয় বানিয়েছেন। তিনি সেখান থেকেই সব কার্যক্রম চালান। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম ডাবলু সমবায় ব্যাংকের পরিচালক। শহরের সাতমাথায় অবস্থিত সেই ব্যাংকের একটি কক্ষই তিনি ব্যক্তিগত কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করেন।

জেলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক সামসুদ্দিন শেখ হেলাল বগুড়া পৌরসভার প্যানেল মেয়র। এ ছাড়া জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক তিনি। এ কারণে তিনি পৌরসভা, মোটর শ্রমিক ও ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়ে দলীয় কার্যক্রম চালান। জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি সাজেদুর রহমান শাহীন শাজাহানপুর উপজেলার খরনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। তিনি সেখানে এবং শহরের সেউজগাড়ি এলাকার বাড়িতে ব্যক্তিগত কার্যালয়ে সময় দেন।

শহর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক রফি নেওয়াজ খান রবিন গাবতলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও বগুড়া জেলা ওষুধ ব্যবসায়ী দোকান মালিক সমিতির সভাপতি। শহরের খান মার্কেটে তাঁর সমিতির কার্যালয়। সেখানে এবং উপজেলা পরিষদে এই নেতা সময় দেন বেশি।

জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সুলতান মাহমুদ খান রনি জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান। জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সঙ্গে অর্পিত সম্পত্তির একটি অংশ ইজারা নিয়ে সম্প্রতি তিনি খান এন্টারপ্রাইজ নামের সুসজ্জিত ব্যক্তিগত কার্যালয় করেছেন। এখান থেকে দলীয় ও ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজ করেন।

মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী খাদিজা খাতুন শেফালীর বাড়ি শহরের রহমাননগর এলাকায়। সেখানে নিজ বাড়িতে বসেই তিনি সাংগঠনিক কাজ চালান। এ ছাড়া সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু সুফিয়ান শফিক সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। সেখানে সরকারি কার্যালয়ে বসেই তিনি দলীয় কার্যাক্রম চালান বেশি।

আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের ভগ্নদশা দেখে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নাইমুর রাজ্জাক তিতাস ব্যক্তিগত উদ্যোগে একাংশ সংস্কারের উদ্যোগ নেন। তিনি কার্যালয়ের পেছনে খোলা অংশের ভেঙে যাওয়া টিন, বাঁশ, চাটাই পরিবর্তনের কাজ শুরু করেছেন গত বুধবার।

এ প্রসঙ্গে নাইমুর রাজ্জাক তিতাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দলীয় কার্যালয় হলো প্রাণের জায়গা। অস্তিত্বের জায়গা। এই স্থানটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে ওঠার কারণে আমি নিজে উদ্যোগ গ্রহণ করি। নতুন টিন দিয়ে চালা, সিলিং ও টয়লেটগুলো মেরামত করতে দেড় লক্ষাধিক টাকা খরচ হবে।’

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মজিবর রহমান মজনু বলেন, ‘সবাই বিভিন্ন দায়িত্বে থাকায় সেখানে সময় দিতে হয়। আর দলীয় কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠান ও দলীয় মিটিং ছাড়া যাওয়া হয় কম। তবে এটি দীর্ঘদিন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, এটি সত্য কথা।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা