kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস আজ

টিউশনির টাকায় সোনিয়ার স্কুল

শাহ ফখরুজ্জামান, হবিগঞ্জ   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



টিউশনির টাকায় সোনিয়ার স্কুল

স্নেহ-ভালোবাসায় শিক্ষার্থীদের সামনে এভাবেই হাজির হন সোনিয়া। ছবি : কালের কণ্ঠ

হবিগঞ্জ শহরের মাছুলিয়া এলাকার সেলিনা বেগমের একচালা টিনের ঘরে অসংখ্য ছিদ্র। পলিথিন দিয়ে ছিদ্রগুলো ঢেকে দিয়েছেন। কিন্তু বৃষ্টি এলে পলিথিনের ছাউনি ভেদ করে ঘরের ভেতর পানি পড়ে। সেলিনার শিশুসন্তান শাবানা প্রতিদিন দরজায় দাঁড়িয়ে দেখে, তার বয়সী শিশুরা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। তারও মন চায় বিদ্যালয়ে যেতে। কিন্তু সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থায় মা তাকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারেন না।

শাবানার মতো শত শত ছিন্নমূল শিশুর বসবাস মাছুলিয়া ও পাশের মাহমুদাবাদ এলাকায়। ইচ্ছা থাকলেও তারা বিদ্যালয়ে যেতে পারে না বা তাদের পাঠানো হয় না দারিদ্র্যের কারণে। অলস সময় কাটে তাদের। বিষয়টি নজরে আসে মাহমুদাবাদের কলেজছাত্রী শিরিন আক্তার সোনিয়ার। তিনি  তাগিদ অনুভব করেন এই শিশু তথা সমাজের জন্য কিছু করার; শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার। কিন্তু কিভাবে? শেষে একদিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, এই শিশুদের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করবেন! কিন্তু আর্থিক সংগতি যে তাঁর নেই। সোনিয়ার ভেতরে তোলপাড় হয়—কিভাবে তাঁর ইচ্ছার বাস্তবায়ন করা যায়! নানা ভাবনার পর ইচ্ছা বাস্তবায়নে তিনি শুরু করেন টিউশনি। আর এই টিউশনির টাকা দিয়ে মাহমুদাবাদে ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মায়ের মমতা বিদ্যালয়’ নামের একটি অবৈতনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। এখন শাবানাসহ ১২০ শিশু বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী। তারা স্বপ্ন দেখছে লেখাপড়া করে অনেক বড় হওয়ার। এই বিদ্যালয়ে মায়ের নামে ‘জহুরা খাতুন পাঠাগার’ও প্রতিষ্ঠা করেছেন সোনিয়া। মানুষের আগ্রহে শহরের আনোয়ারপুরে বিদ্যালয়টির একটি শাখা খুলেছেন সোনিয়া। সেখানে পড়ছে ৫০ জন শিক্ষার্থী।

মাহমুদাবাদ এলাকার বাসিন্দা নুরুল হক ও জহুরা খাতুনের মেয়ে শিরিন আক্তার সোনিয়া বর্তমানে সিলেট এমসি কলেজে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। তিনি জানান, তাঁর বিদ্যালয়ে দরিদ্র পরিবারের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার পাশাপাশি বয়স্কদের স্বাক্ষরজ্ঞান দেওয়া হয়। নৈতিক শিক্ষা, গান-বাজনাও শেখানো হয়। আর বিভিন্ন ধরনের বই পাঠাগারে পড়তে আসে বিভিন্ন বয়সের মানুষ।

সোনিয়া আরো জানান, ৩০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে শিক্ষার্থী ১২০ জন। আগামীতে আরো বাড়বে। কারণ এখন থেকেই অনেক অভিভাবক যোগাযোগ করছে সেখানে তার সন্তানকে ভর্তি করানোর জন্য।

সোনিয়া বলেন, তাঁর বোনের এক শতাংশ জমিতে টিনের ছাউনি আর ইট-টিনের বেড়া দিয়ে নির্মিত একটি ঘরে গড়ে তুলেছেন এ বিদ্যালয়। প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে শিক্ষার বাতি জ্বালাচ্ছেন ঘরে ঘরে। কষ্ট হলেও নিজের টিউশনির টাকা দিয়ে বিদ্যালয়ের খরচ জোগান। বিদ্যালয়ে তিনিসহ (প্রধান শিক্ষক) তিনজন শিক্ষক রয়েছেন। একজনকে সামান্য সম্মানী দেওয়া হয়। অন্যজন বিনা পারিশ্রমিকেই পড়ান। আজীবন বিদ্যালয়ে শিক্ষার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন এই আলোর দিশারী।

সোনিয়া তাঁর এ মহতী উদ্যোগের জন্য প্রশংসিত হচ্ছেন। কিন্তু অর্থাভাবে বিদ্যালয়ের পরিসর ও সৌন্দর্য বাড়ানো এবং মানসম্মত শিক্ষা ও শিক্ষকদের সম্মানী দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যালয়টিকে আরো এগিয়ে নিতে সরকার ও সমাজের বিত্তশালীদের সহযোগিতা চান সোনিয়া, এলাকার মুরব্বি সুরুজ আলীসহ অভিভাবকরা।

মাহমুদাবাদের সুফিয়া আক্তার বলেন, ‘আগে এ এলাকার দরিদ্র পরিবারের ছোট বাচ্চারা আদব-কায়দা জানত না। সোনিয়া তাদের আদব-কায়দাও শেখাচ্ছেন।’ স্কুলছাত্রী সাফিয়া আক্তার শাবানা জানায়, তার বাবা চা বিক্রেতা। চা বিক্রির আয় দিয়ে কোনো রকমে তাদের সংসার চলে। এ অবস্থায় তার বিদ্যালয়ে যাওয়া অনেকটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এ খবর শুনে সোনিয়া তাকে বাসা থেকে নিয়ে তাঁর বিদ্যালয়ে ভর্তি করান। তাকে কাপড়-বই-খাতাও কিনে দিয়েছেন।

এলাকার কলেজছাত্রী শাবনুর আক্তার বলেন, ‘সোনিয়া আপার এ মহতী উদ্যোগ দেখে আমিও স্কুলটিতে শিক্ষকতা শুরু করি। স্কুলটি অনেকটা কিন্ডারগার্টেনের মতো। আমার মতো অনেকেই এখানে পাঠদানে আগ্রহী।’

সোনিয়ার মা জহুরা খাতুন বলেন, ‘সোনিয়া ছোটবেলা থেকেই দরিদ্র পরিবারের ছেলে-মেয়েদের বিনা মূল্যে লেখাপড়া করানোর স্বপ্ন দেখত। সে যখন ডিগ্রিতে ভর্তি হয়, তখন আমাকে ওই স্কুল করার পরিকল্পনার কথা জানায়। আমি তাকে বলেছিলাম এ জন্য অনেক টাকা লাগবে। সোনিয়া বলেছিল, সেই টাকা সে প্রাইভেট পড়িয়ে উপার্জন করবে। এরপর আমি তাকে স্কুল করতে উৎসাহিত ও সহযোগিতা করি। সরকারি বা কোনো দাতা সংস্থার সহযোগিতা পেলে স্কুলটি উন্নত করা যেত।’

সরেজমিন দেখা যায়, ছোট্ট পরিসরে স্কুলটি পরিচালিত হলেও এখানে অনেক উপকরণ ব্যবহার করা হয়। আনন্দ ও গুরুত্বের সঙ্গে পড়ানো হয় শিশুদের। পরীক্ষার আগে তাদের বিশেষ ক্লাস করানো হয়। শিশুদের শৃঙ্খলাও চমৎকার। তারা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে।

জেলা প্রশাসক মাহমুদুল কবীর মুরাদসহ জনপ্রতিনিধি ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা পরিদর্শন করেছেন মাহমুদাবাদের বিদ্যালয়টি। জেলা প্রশাসক বলেন, ‘সোনিয়ার এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। আমরা তাঁর পাশে দাঁড়াব।’ সমাজের বিত্তবানদেরও সোনিয়ার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা