kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

জেল-জরিমানায়ও সচেতন হচ্ছেন না বাড়ির মালিকরা

শাখাওয়াত হোসাইন   

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জেল-জরিমানায়ও সচেতন হচ্ছেন না বাড়ির মালিকরা

এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে বাড়ি বাড়ি অভিযান পরিচালনা করছে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন। বাড়িতে গিয়ে এডিসের লার্ভা ও লার্ভা জন্মানোর উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়ায় অন্তত ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করেছে দুই সিটি করপোরেশন। সাতজনকে দেওয়া হয়েছে কারাদণ্ড। এ ছাড়া প্রায় দুই হাজার বাড়ির মালিককে সতর্ক করা হয়েছে। জেল, জরিমানা ও সতর্ক করার পরও এখনো প্রতিদিনই বাড়িতে বাড়িতে পাওয়া যাচ্ছে এডিসের লার্ভা।

ঢাকায় সুনির্দিষ্ট বসতি সংস্কৃতি না থাকা এবং অনেক নগরবাসী এখনো সচেতন না হওয়ার কারণে এডিসের লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে করেন সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা ও নগর পরিকল্পনাবিদরা। তবে বছরব্যাপী মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে নগরবাসীর মধ্যে আচরণগত পরিবর্তন আনতে চান সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) তথ্য মতে, এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করতে গত ২৫ আগস্ট ‘চিরুনি অভিযান’ শুরু করে নগর সংস্থাটি। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত এক লাখ ছয় হাজার ৯৮২টি বাড়ি পরিদর্শন করেছে ডিএনসিসি। এসব বাড়ির মধ্যে এক হাজার ৮৯৩টি বাড়িতে এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ৫৮ হাজার ১৫টি বাড়িতে এডিস মশা জন্মানোর উপযোগী পরিবেশ পেয়েছে সংস্থাটি। এসব স্থান ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। ডিএনসিসির পুরনো ৩৬টি ওয়ার্ডে একযোগে পরিচালিত অভিযানে প্রায় চার হাজার কর্মী অংশ নেন। অভিযানে প্রথম দিকে বাড়িতে প্রবেশের ক্ষেত্রে অসহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে সে সংকট এখন অনেকটা কেটে গেছে।

বাড়ি বাড়ি অভিযান চালিয়ে সতর্ক করার পরও প্রতিদিনই পাওয়া যাচ্ছে এডিসের লার্ভা। সর্বশেষ গতকালও ৯০টি বাড়িতে মিলেছে এডিসের লার্ভা। ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেলেও শতকরা হারে তা আশঙ্কাজনক নয়। প্রথমবারের অভিযানে এডিসের লার্ভা পাওয়া গেলেও দ্বিতীয়বারের পরিদর্শনে সেই হার কমতে শুরু করেছে। গত সোমবার সতর্ক করা ২২টি বাড়ি পরিদর্শন করেছেন ডিএনসিসির কর্মকর্তারা। সেখানে একটি বাড়িতেও লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মমিনুর রহমান মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিদিন লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে তা ঠিক। তবে তা আশঙ্কাজনক নয়। কিছু মানুষ কখনো সচেতন হবে না। তবে মশক নিয়ন্ত্রণে বছরব্যাপী পরিকল্পনার মাধ্যমে এডিস নিয়ন্ত্রণ করতে চাই আমরা।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) জানিয়েছে, ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হওয়ার পর গত ২২ জুলাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিযান শুরু করা হয়। গতকাল পর্যন্ত এক লাখ দুই হাজার ৫৩৩টি বাড়ি পরিদর্শন করেছে সংস্থাটি। এসব বাড়ির মধ্যে এক হাজার ৩৬৫টিতে এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে। এডিসের লার্ভা ও লার্ভা জন্মানোর উপযোগী পরিবেশ পাওয়ায় এ পর্যন্ত সাতজনকে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ছাড়া ৩৪ লাখ ৯৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। গতকালও ১০০টি বাড়ি পরিদর্শন করে দুটিতে এডিসের লার্ভা পাওয়ার অভিযোগে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

জানা গেছে, ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হওয়ার পর থেকে ১০ লাখের বেশি লিফলেট বিতরণ করেছে দুই সিটি করপোরেশন। রাজধানীর স্কুল-কলেজগুলোতে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয়েছে শতাধিক। স্কাউট ও বিএনসিসির সদস্যরা সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজধানীবাসীকে সচেতন করেছে। এ ছাড়া গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন, টেলিভিশন ডকুমেন্টারি, পথসভা ও মাইকিং করেছে দুই নগর সংস্থা।

ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. শরীফ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তথ্য প্রদান, প্রেষণা ও উদ্বুদ্ধকরণ—এই তিনটি লক্ষ্য নিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছি আমরা। তবে জনগণকে আরো সচেতন করতে হবে। সচেতন না হলে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সম্ভব নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘শুরুর দিকে ৫ শতাংশ বাড়িতে এডিসের লার্ভা পাওয়া যেত। এখন তা ১ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে এডিস নিয়ন্ত্রণে আনা হবে।’

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, রাজধানী হিসেবে ঢাকা ৪০০ বছরের বেশি সময় পার করলেও স্বাস্থ্যসম্মত বসতি সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি এখনো। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি এখনো উপেক্ষিত। ডেঙ্গু শতাধিক প্রাণ কেড়ে নেওয়ার পরও নাগরিকরা নিজেরা সচেতন হচ্ছে না। নিজেদের থাকার জায়গা পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর রাখার ব্যাপারে এখনো উদাসীনতা রয়েছে তাদের।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নগরবাসীর মধ্যে সাধারণ কোনো সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাইলে সমাজকেন্দ্রিক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। ঢাকা শহরে এটার তীব্র অভাব। যে যেভাবে পারে সেভাবে নিজেকে পরিচালনা করে। নাগরিকদের আচরণগত পরিবর্তন করতে হলে সমাজকেন্দ্রিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে। তবেই মশক নিয়ন্ত্রণসহ যেকোনো উদ্যোগ সহজে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা