kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বাসনা রানীর চোখে-মুখে আক্ষেপ আর হতাশা

একতরফা শুনানির মামলার সাক্ষ্য শেষ করতে পাঁচ বছর পার

আশরাফ-উল-আলম   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাসনা রানীর চোখে-মুখে আক্ষেপ আর হতাশা

‘বাবারে, পাঁচ বছর ধরে প্রতি তারিখে আদালতে আসি। কিন্তু সাক্ষী দিতে পারি না। জজ সাহেব ফেরত দেন। এই তারিখ না ওই তারিখ, ওই তারিখ না এই তারিখে সাক্ষী নেবেন বলে ফেরত দেন। আবার আসি, আবার যাই। কিন্তু সাক্ষী হয় না। খালি তারিখ পড়ে।’ চরম আক্ষেপ আর হতাশা নিয়ে কথাগুলো গত ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা জেলা জজ আদালতের বারান্দায় বসে বলছিলেন বাসনা রানী সাহা।

বাসনা রানী সাহা রাজধানীর মিরপুরের বড় বাজারের বাসিন্দা। তাঁর দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, ঢাকার সিনিয়র সহকারী জজ প্রথম আদালতে তাঁর মামলা বিচারাধীন (দেওয়ানি মোকদ্দমা নম্বর ২৪৪/২০১৪)। ২০১৪ সালের ২০ মে মামলাটি দায়ের করেন বাসনা রানী সাহা। বিবাদীরা মামলায় হাজির না হওয়ায় একতরফা শুনানি চলছে। পাঁচ বছরেও মামলা নিষ্পত্তি হয়নি। অথচ আইনজীবীরা জানান, একতরফার মামলা দু-একটি ধার্য তারিখে শুনানির পরই নিষ্পত্তি করা যায়।

ওই দেওয়ানি মামলার নথি থেকে দেখা যায়, ঢাকা জেলার মিরপুর থানার মিরপুর মৌজার বড় বাজারে ৩.৬০ শতাংশ জমি জনৈক হারুন অর রশীদের কাছ থেকে ২০০২ সালের ১৪ এপ্রিল সাফ কবলা দলিলমূলে ক্রয় করেন বাসনা রানী সাহা। এই জমির ২.৪৪ শতাংশ ভূমি জরিপে সরকারের নামে রেকর্ড হয়। ওই রেকর্ড সংশোধনী করে বাসনা রানীর নামে করার জন্য ঘোষণামূলক ডিক্রি জারির জন্য মামলাটি করা হয়েছে।

মামলার বিবাদী করা হয়েছে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), মিরপুরের সহকারী ভূমি কমিশনার, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সেটলমেন্ট কর্মকর্তা ও বাদী যাঁর কাছ থেকে জমি ক্রয় করেছিলেন সেই হারুন অর রশীদকে। প্রত্যেকে সমন পেয়েছেন আদালতের। কিন্তু কেউই হাজির না হওয়ায় মামলাটি ২০১৫ সালে একতরফা শুনানিতে যায়।

বাসনা রানী সাহা কালের কণ্ঠকে জানান, তিনি জমিটি কিনেছেন বৈধ মালিকের কাছ থেকে। জমির আগের মালিক খাজনা নিয়মিত পরিশোধ করে আসছিলেন। কিন্তু জমিজমা সংক্রান্ত আইন-কানুন তিনি বোঝেন না। তাঁর বড় ছেলেও বিদেশে ছিলেন। এ কারণে যথাসময়ে জমির নামজারি (মিউটেশন) করেননি। বাসনা রানী ২০১৪ সালে মিরপুর তহশিল অফিসে খাজনা পরিশোধ করতে গেলে সেখান থেকে তাঁকে জানানো হয় হারুন অর রশীদের নামে ১.৩৬ শতাংশ সর্বশেষ সিটি জরিপে রেকর্ড হয়েছে। বাকি ২.৪৪ শতাংশ সরকারের নামে রেকর্ড হয়েছে। কাজেই খাজনা নেওয়া যাবে না। এরপর ২.৪৪ শতাংশ জমির রেকর্ড সংশোধনের জন্য মামলা করেন তিনি।

বাসনা রানী আরো বলেন, তাঁর সহায়-সম্বল যা ছিল তা দিয়ে জমিটি ক্রয় করেছিলেন। সেখানে বাড়ি করে তিনি বসবাস করছেন। তাঁর দখলে রয়েছে জমিটি। কিন্তু সরকারের নামে রেকর্ড হওয়ায় এই সুযোগ নিয়ে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী জমিটি দখলের পাঁয়তারা করছে। মামলা নিষ্পত্তি না হলে জমিটি হারাতে পারেন—এই শঙ্কায় রয়েছেন তিনি। আর আদালতে ঘুরতে ঘুরতে ভোগান্তির শেষ নেই—এমন মন্তব্য করে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমি গরিব। এ কারণে হয়তো মামলা করে হয়রানির শিকার হচ্ছি। অসুস্থ অবস্থায় প্রতি তারিখে আদালতে হাজিরা দেওয়া আমার জন্য কষ্টসাধ্য।’

বাসনা রানী সাহার আইনজীবী সঞ্জীব চন্দ্র দাস কালের কণ্ঠকে জানান, এই মামলায় বাদী বাসনা রানী প্রতি তারিখেই হাজির হন সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য। কয়েকজন বিচারক বদলিও হয়ে গেছেন এর মধ্যে। মাঝখানে বিচারক ছিলেন না বলে ভারপ্রাপ্ত বিচারক সাক্ষ্য নেননি। বর্তমানে বিচারক রয়েছেন। কয়েক তারিখে আংশিক সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। আবার তারিখ পড়েছে। আইনজীবী জানান, একজন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বাদীর সাক্ষ্য নেওয়ার পর মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি হবে। তারপর রায় হবে।

ঢাকা আদালতের আইনজীবী মো. জাফর আল নিমেরী বলেন, একতরফা শুনানি চলছে এমন মোকদ্দমা শেষ হতে দু-একটি ধার্য তারিখই যথেষ্ট। এসব মামলা নিষ্পত্তি করতে যদি পাঁচ বছর লাগে, তাহলে মামলাজট তো বেড়েই চলবে। আর মামলাজট বাড়ার সঙ্গে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি নিঃসন্দেহে জড়িত।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা