kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

দিনে আত্মসমর্পণ রাতে নিহত

সংশোধনের পথ রুদ্ধ ‘বন্দুকযুদ্ধে’

মানবাধিকার নেতাদের ক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সংশোধনের পথ রুদ্ধ ‘বন্দুকযুদ্ধে’

চট্টগ্রামের খুলশী থানার ১৩ মামলার আসামি মোহাম্মদ বেলাল (৪৩) আইনের প্রতি সম্মান দেখিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু গত বুধবার দুপুরে আত্মসমর্পণের ১৩-১৪ ঘণ্টা পর ওই দিন মধ্যরাতে পুলিশ তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে। রাতে পুলিশের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের গোলাগুলির সময় পালানোর চেষ্টাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে বেলালের মৃত্যু হয়েছে বলে জানান খুলশী থানার ওসি প্রণব চৌধুরী।

নিহত বেলাল কুমিল্লা জেলার চান্দিনা উপজেলার মইনপুর কঙ্গাই গ্রামের আবদুল কাদেরের ছেলে। তিনি নগরের খুলশী থানার আমবাগান এলাকায় নাজমুলের কলোনিতে বাস করতেন। গতকাল বৃহস্পতিবার তাঁর মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

বেলালের মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে অভিযানে যাওয়া খুলশী থানার উপপরিদর্শক মাহবুব রব্বানী অপু বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে এবং অজ্ঞাতপরিচয় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের করেন। মামলার ভাষ্য অনুযায়ী, বেলাল তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তাঁর বিরুদ্ধে খুলশী থানায় ১৩টি মামলা রয়েছে। বুধবার দুপুরে তিনি থানায় এসে আত্মসমর্পণ করেন। রাতে জিজ্ঞাসাবাদের সময় বেলাল তাঁর কাছে অস্ত্র থাকার কথা স্বীকার করেন। পরে তাঁকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করতে জালালাবাদ পাহাড়ি এলাকায় যায় পুলিশ। সেখানে আগে থেকে ওত পেতে থাকা বেলালের চার-পাঁচজন অনুসারী বেলালকে ছিনিয়ে নিতে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। পুলিশও আত্মরক্ষায় গুলি ছোড়ে। এ সময় বেলাল পুলিশ হেফাজত থেকে পালানোর সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হন। পরে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

পুলিশের দায়ের করা মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে সাহাবুদ্দিন নামের একজনকে। তিনি সুমনের ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকার। কালের কণ্ঠ’র প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাতে স্যারেরা (পুলিশ) আমাকে ডেকে বলেন, আপনি গুলির শব্দ শুনেছেন? আমি বলেছি, ‘শুনেছি।’ এরপর আমাকে সাক্ষী করা হয়েছে। ‘আপনি চার-পাঁচজন অজ্ঞাতপরিচয় সন্ত্রাসীর পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে দেখেছেন কি না?’ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি অন্য কাউকে দেখিনি, গুলির শব্দ শুনেছি এবং একজনকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেছি।’

আত্মসমর্পণের পরও একজন সন্ত্রাসীর জীবন রক্ষা না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার নেতারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগর পুলিশের একজন উপকমিশনার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আত্মসমর্পণকারীকে রাতের অন্ধকারে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ হত্যা করা উচিত হয়নি। আমরা সন্ত্রাসীদের আত্মসমর্পণ করে সুপথে ফেরার আহ্বান জানাই। কোনো সন্ত্রাসী যদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে আত্মসমর্পণ করে, তাহলে তাকে জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া পুলিশের আইনি দায়িত্ব। কিন্তু পুলিশ প্রমাণ করল, আত্মসমর্পণ করলেও রক্ষা নেই। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

চট্টগ্রাম মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ও সার্ক মানবাধিকার কমিশনের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যদি কোনো নাগরিক অপরাধী হিসেবে থানায় আত্মসমর্পণ করে, তাহলে আইনগত যাবতীয় সুবিধা পাওয়া ওই আত্মসমর্পণকারীর নাগরিক অধিকার। এ ক্ষেত্রে আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে। সব নাগরিককে আইনি নিরাপত্তা দেওয়া পুলিশের দায়িত্ব।’

বেলাল ছিলেন পাহাড়তলী ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন হিরণের অনুসারী। পরে তাঁর সঙ্গে বিরোধ দেখা দিলে তিনি থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন বলে স্থানীয় লোকজন জানায়।

ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন হিরণ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুরো ওয়ার্ডে আমার হাজারো অনুসারী আছে। এদের একজন বেলাল হতে পারে। মানুষের মধ্যে ভালো-মন্দ আছে। তাই ভালো অনুসারী ও মন্দ অনুসারীও আছে। বেলালের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে আমার প্রতিপক্ষ ও মন্দ লোকের অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমি নোংরা রাজনীতি করি না।’

খুলশী থানার ওসি প্রণব চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আত্মসমর্পণের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বেলাল অস্ত্রের তথ্য দেয়। সেই অস্ত্র উদ্ধার করতে গেলে বেলালের অনুসারীদের গুলির মুখে পড়ে পুলিশ। তাই বাধ্য হয়ে জীবন রক্ষার্থে পুলিশও গুলি চালিয়েছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা