kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সাহেবগঞ্জ ইক্ষুখামারে সহিংসতা

‘প্রভাবিত’ চার্জশিটে নারাজি প্রতিবাদে সমাবেশ

গাইবান্ধা প্রতিনিধি   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রংপুর চিনিকলের আওতাধীন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্ম ইক্ষুখামারে সাঁওতালপল্লীতে হামলা চালিয়ে তিনজন নিহত এবং বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের মামলায় পিবিআইয়ের দেওয়া অভিযোগপত্রে (চার্জশিট) নারাজি দিয়েছে সাঁওতালরা। অভিযোগপত্র থেকে তৎকালীন এমপি, চিনিকলের এমডি, জিএম, ইউএনও ও ওসিসহ গুরুত্বপূর্ণ ১১ জনকে বাদ দেওয়ায় এ নারাজি দেওয়া হয়। গতকাল বুধবার গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পার্থ ভদ্রের আদালতে নারাজি দাখিল করেন মামলার বাদী থোমাস হেমব্রোম।

অন্যদিকে ‘প্রভাবিত চার্জশিট’ দেওয়ার প্রতিবাদে গতকাল সমাবেশ করেছে ভুক্তভোগী সাঁওতাল ও বাঙালিরা। ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর ইক্ষুখামারের বিরোধপূর্ণ জমি থেকে সাঁওতাল বসতি উচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছিল, যাতে উচ্চ আদালতের নির্দেশে তদন্তে দায়িত্ব পায় পিবিআই।

গতকাল নারাজি দাখিল করা হলে আদালত শুনানি শেষে আগামী ৪ নভেম্বর অধিকতর শুনানির দিন ধার্য করেন। বাদীপক্ষে হাইকোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না, রফিকুল ইসলাম সিরাজী, গাইবান্ধা জজকোর্টের অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বাবু ও মুরাদুজ্জামান রব্বানী নারাজি আবেদনের শুনানি করেন।

সাঁওতালদের অভিযোগে জানা গেছে, সেদিনের নৃশংস হামলার দশ দিন পর চিনিকল কর্তৃপক্ষ পরিকল্পিতভাবে ঘটনা আড়াল করতে সাপমারা ইউনিয়নের রামপুর মাহালীপাড়া গ্রামের মৃত সমেশ্বর মুর্মুর ছেলে স্বপন মুর্মুকে দিয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে আসামি করে থানায় একটি এজাহার দাখিল করে। কিন্তু হামলায় সাঁওতাল হত্যার ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হলে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মহলে নিন্দার ঝড় ওঠে। পরে সাঁওতালদের পক্ষ থেকে হরিণমারী নতুন পল্লীর (ইক্ষুখামারের ভেতরে গড়ে তোলা পল্লী) বাসিন্দা থোমাস হেমব্রম বাদী হয়ে ৩৩ জনের  নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরো ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে আসামি করে গোবিন্দগঞ্জ থানায় এজাহার দেন। কিন্তু ওই এজাহারটি পুলিশ জিডি হিসেবে এন্ট্রি করে।

পরে ওই জিডির বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট পিটিশন (১৪৪০২/১৬ নম্বর) দাখিল করা হলে হাইকোর্ট থোমাস হেমব্রমের জিডিকে মামলা হিসেবে গ্রহণ করে পিবিআইকে ওই ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দেন। সাঁওতাল ও স্থানীয় বাঙালিদের অভিযোগ, পিবিআই প্রভাবিত হয়ে ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী কতিপয় আসামির নাম বাদ দিয়ে ৯০ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে।

গত ২৩ জুলাই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গাইবান্ধা পিবিআইয়ের (এএসপি) মোহাম্মদ আব্দুল হাই সরকার এই অভিযোগপত্র দাখিল করেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আসামি হিসেবে ১১ জন আসামির নাম বাদ দেওয়া হয়। এই ১১ আসামি হলেন সাবেক এমপি অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ, চিনিকলের তৎকালীন এমডি আব্দুল আউয়াল, জিএম আব্দুল মজিদ, কাটাবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম রফিক, তৎকালীন ইউএনও আব্দুল হান্নান, তৎকালীন ওসি সুব্রত কুমার সরকার, তৎকালীন ডিবি পুলিশের এসআই মাহবুবুর রহমান মাহবুব, পুলিশ কনস্টেবল সাজ্জাদ হোসেন, মিনহাজুল ইসলাম, আব্দুল মতিন ও বাবলু মিয়া। তাঁদের বাদ দেওয়া সাঁওতালদের পক্ষে এজাহারকারী থোমাস হেমব্রম গতকাল আদালতে নারাজি জানান।

ঢাকা থেকে আসা বাদীপক্ষের আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, পিবিআইয়ের দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদন মনগড়া, পক্ষপাতমূলক এবং সর্বোপরি ঘটনা আড়াল করা হয়েছে। এ ছাড়া চার্জশিটে বাদীপক্ষের লোকজনের নাম এবং জড়িত নয় এমন কয়েকজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাই পিটিশনে আসামিদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ ও যুক্তি উপস্থাপন করে বিচার বিভাগীয় পুনঃ তদন্ত চাওয়া হয়েছে।

এদিকে পিবিআইয়ের দাখিলকৃত অভিযোগপত্র প্রত্যাখ্যান করে গতকাল দুপুর ২টা থেকে গোবিন্দগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্ম ভূমি পুনরুদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ডা. ফিলিমন বাস্কের সভাপতিত্বে এক প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য, হাইকোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না, সিপিবি গাইবান্ধা জেলা কমিটির সভাপতি ও প্রেসিডিয়াম সদস্য মিহির ঘোষ, আদিবাসী বাঙালি সংহতি পরিষদের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বাবু ও সিপিবি নেতা অ্যাডভোকেট মুরাদুজ্জামান রব্বানী।

বক্তারা বলেন, প্রভাবিত চার্জশিট আদিবাসী-বাঙালিরা মেনে নেবে না। ওই হামলা ও হত্যাকাণ্ডের মূল হোতাদের অবশ্যই আইনের আওতায় অনতে হবে। ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, মহান  মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই বাংলাদেশে সবার মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তিনি ঘটনায় জড়িত সাবেক এমপি কালামসহ ইন্ধনদাতাদের বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা