kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

শিল্পী-আয়োজকও রাজস্ব ফাঁকিতে

বিদেশি শিল্পীদের সম্মানীর বিপরীতে ৩০ শতাংশ উৎসকর প্রদানের বিধান রয়েছে

ফারজানা লাবনী   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শীত মৌসুমকে সামনে রেখে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে চলে অনুষ্ঠান আয়োজনের নানা প্রস্তুতি। এসব অনুষ্ঠানের জন্য দেশীয় শিল্পী-কলাকুশলীদের পাশাপাশি ভারত থেকেও আসেন নায়ক-নায়িকা, মডেল, কণ্ঠশিল্পী। তালিকায় থাকে কলকাতার পাশাপাশি বলিউডের নামি-দামি থেকে উঠতি তারকাদের নাম। কিন্তু এসব অনুষ্ঠান আয়োজনের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘটছে রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা। বিদেশি শিল্পীদের প্রাপ্ত সম্মানী থেকেও উৎসকর কেটে সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়া হয় না। পর্যটন ভিসায় শিল্পীদের এনেও কর ফাঁকি দেওয়া হয়।

তাই এবার চলতি শীত মৌসুমের (সেপ্টেম্বর-ফেব্রুয়ারি) এসব আয়োজনের রাজস্ব পরিশোধ সংক্রান্ত তথ্য নজরদারির জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তাদের নিয়ে সাত সদস্যের টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করা হয়েছে। টাস্কফোর্সের তদন্তে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি নিশ্চিত হলে তাকে রাজস্ব আইনে শাস্তির আওতায় আনা হবে। বিশেষভাবে বিদেশি শিল্পীরা হিসাবমতো রাজস্ব পরিশোধ না করে প্রাপ্ত পারিশ্রমিক দেশের বাইরে নিয়ে যেতে সক্ষম হলে সংশ্লিষ্ট আয়োজকদের বিরুদ্ধে অর্থপাচার আইনে মামলা করা হবে। ওই শিল্পী রাজস্ব পরিশোধ না করলে প্রয়োজনে তার দেশ ত্যাগে আপত্তি জানাবে এনবিআর।      

সূত্র জানায়, বিদেশি শিল্পী বা কলাকুশলীদের যে প্রতিষ্ঠান আনে, তাদের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হয়। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় উৎসকর বিষয়ে এনবিআরকে ও নিরাপত্তা বিষয়ে গোয়েন্দা বিভাগকে চিঠি দেয়। এ দুই বিভাগ অনাপত্তিপত্র দিলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় তা চূড়ান্ত করে। বিদেশি শিল্পী বা কলাকুশলীদের পারিশ্রমিকের ওপর ৩০ শতাংশ কর কর্তনের বিধান আছে। কিন্তু বিগত দিনে এনবিআরের তদন্তে দেখা গেছে, অনেক সময় আয়োজকরা শিল্পীদের সম্মানী হিসেবে কী পরিমাণ অর্থ দিয়ে থাকেন বা এসব অনুষ্ঠান থেকে কত আয় হয় তার প্রকৃত তথ্য গোপন করে রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। অনেকে আবার দুস্থ, অসহায় বা প্রতিবন্ধীদের জন্য অনুষ্ঠান থেকে আয় করা অর্থ ব্যয় করা হবে জানিয়ে ন্যূনতম রাজস্বও জমা দেয় না।

শীতের মৌসুমে অনুষ্ঠানগুলোতে দেশি শিল্পীদের পাশাপাশি বিদেশি শিল্পীদের মধ্যে ভারতীয়রা বেশি অংশগ্রহণ করে। নাচ-গানের অনুষ্ঠান, ফ্যাশন শোতে ভারতীয় শিল্পীদের অংশ নিতে দেখা যায়। সম্মানীর বিনিময়ে তারা বিজ্ঞাপন, নাটক-সিনেমা-মঞ্চেও অভিনয় করে। অনেকে আবার প্রতিষ্ঠানের শুভেচ্ছাদূত হয়েও আসেন। অনেকে পর্যটন ভিসায় আসেন। এতে সরকারের অনেক সংস্থার অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হয় না।

সাধারণত এঁদের আয়োজক হিসেবে থাকে বড় বড় হোটেল-রেস্তোরাঁ, বিভিন্ন করপোরেট হাউস, ফ্যাশন হাউস, মিডিয়া হাউস, বিভিন্ন প্রযোজক সংস্থা। অনেক সময় ব্যক্তি উদ্যোগেও আসেন। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগের সঙ্গে সমাজে প্রভাবশালীদের অনেকের সুসম্পর্ক থাকায় তারা অনুষ্ঠান করেও কৌশলে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে পার পেয়ে যায়। এনবিআর পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণের অভাবে এদের আটকাতে পারেনি। এবারে এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই এনবিআর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।

জানা যায়, নামি-দামি শিল্পীরা সম্মানী হিসেবে ৫০ হাজার টাকা থেকে ১৫ লাখ পর্যন্ত নিয়ে থাকেন। রাজস্ব আইন অনুসারে বিদেশি শিল্পীদের সম্মানীর বিপরীতে ৩০ শতাংশ উৎসকর প্রদানের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ যেসব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি বিদেশি শিল্পী আনবে, তারা সম্মানী দেওয়ার সময় উৎসকর কেটে এনবিআরের তহবিলে জমা দেবে। এখানেই মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকে অনেকে। অভিযোগ আছে, পরিশোধিত অর্থের একাংশ ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করলেও বড় অংশ হুন্ডিতে পরিশোধ করা হয়। আর এভাবে বড় অঙ্কের অর্থপাচার হয়ে যায়।

জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শীতের মৌসুমে দেশের বিভিন্ন স্থানে দেশি-বিদেশি শিল্পীদের অংশ গ্রহণে অনুষ্ঠানের আয়োজন বেশি হয়। এসব অনুষ্ঠান আয়োজনকে এনবিআর স্বাগত জানায়। আশা করি এসব অনুষ্ঠানের আয়োজকরা এবং অংশগ্রহণকারীরা নিজ উদ্যোগেই হিসাব মতো রাজস্ব পরিশোধ করবে। তবে কেউ রাজস্ব ফাঁকি দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটা এনবিআরের দায়িত্ব।’

এর আগে ভারতীয় অভিনেতা শাহরুখ খান, অভিনেত্রী রানি মুখার্জি, অভিনেত্রী পাওলি দাম এবং ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত বাংলাদেশে অনুষ্ঠান করে যাওয়ার পর থেকেই মূলত এনবিআর শিল্পীদের ওপর নজরদারি শুরু করে। সে সময় পাওলি দাম ও ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত পর্যটন ভিসায় বাংলাদেশে এসে উচ্চ সম্মানী নিয়ে অনুষ্ঠান করে চলে যান।

জানা যায়, একটি প্রতিষ্ঠানের পণ্যের প্রচারে শুভেচ্ছা দূত হিসেবে রাজধানীর একটি হোটেলে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান করায় ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তকে সে সময়ে সম্মানী দেওয়া হয় পাঁচ লাখ টাকা, একটি জুয়েলারি পণ্যের শুভেচ্ছা দূত হয়ে অনুষ্ঠান করায় পাওলি দাম সম্মানী নেন তিন লাখ টাকা। পর্যটন ভিসায় আসায় তাঁকে আনায় আয়োজকদের এনবিআরের অনুমতি নিতে হয়নি। এসব শিল্পীর উচ্চ সম্মানী দিলেও তা থেকে একটি টাকাও রাজস্ব বাবদ পরিশোধে আইনি বাধ্যবাধ্যকতা ছিল না।

জানা যায়, শান, কে কে, বেন্নি দয়াল, নেহা, সোনু নিগাম, ভিশাল, শেখর, সুনীতি চৌহান, আরজিৎ সিং, মিকা সিং, শ্রেয়া ঘোষালের অনুষ্ঠানের সম্মানী ১০ লাখ টাকার বেশি। অঞ্জন দত্ত, নচিকেতা, লোপামুদ্রা মিত্র, রূপম, মোনালি ঠাকুর, পাওলি দাম, হৈমন্তি শুক্লা, অঙ্কুশ, শুভশ্রীর সম্মানীও প্রায় একই। দেশের মধ্যে চিরকুট, এলআরবি, নগরবাউল, মাইলসসহ বিভিন্ন ব্যান্ডদলের সম্মানী ২০ হাজার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। অন্যদিকে ইমরান, মিনার, কণাসহ বিভিন্ন সংগীতশিল্পীও একই পরিমাণ সম্মানী নিয়ে থাকেন। তবে ক্ষেত্রবিশেষে সম্মানীর পরিমাণ কমবেশি হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা