kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

’৭৩-এ গোপালগঞ্জে চার মুক্তিযোদ্ধা হত্যা

১৯ বছরে একজনেরও সাক্ষ্য নেওয়া যায়নি

২৪ আসামির মধ্যে মারা গেছে ১৫ জন ♦ ১৯ সাক্ষীর মধ্যে বেঁচে আছে মাত্র চারজন

এম বদি-উজ-জামান   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জীবন বাজি রেখে যাঁরা দেশের জন্য যুদ্ধ করলেন, হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনলেন, সেই চার মুক্তিযোদ্ধাকে প্রতিপক্ষের হামলায় জীবন দিতে হলো দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই। আর একজন মরতে মরতে বেঁচে গেলেন। ১৯৭৩ সালের মার্চে গোপালগঞ্জে বহুল আলোচিত চার মুক্তিযোদ্ধা হত্যার বিচার আজও শুরু হয়নি। হত্যাকাণ্ডের ৪৬ বছর পার হয়েছে। ১৯ বছর আগে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা গেলেও এখনো একজনেরও সাক্ষ্য নেওয়া যায়নি।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই মামলার ২৪ জন আসামির মধ্যে প্রধান আসামি হেমায়েত উদ্দিনসহ ১৫ জন এরই মধ্যে মারা গেছেন। বেঁচে আছেন মাত্র ৯ জন। আর এই মামলার ১৯ জন সাক্ষীর মধ্যে বাদীসহ মাত্র চারজন জীবিত আছেন। একে একে আসামি ও সাক্ষীদের মৃত্যু হওয়া এবং মামলার বিচার শুরু করতে না পারায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষ ও বাদীপক্ষের আইনজীবী এবং নিহত এক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান।

মামলার প্রধান আসামির রাজনৈতিক প্রভাব, সেনা শাসন, দফায় দফায় তদন্ত এবং সর্বোপরি উচ্চ আদালত থেকে বারবার মামলার কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়ায় এত দিনেও মামলার বিচার শুরু করা যায়নি বলে জানান আইনজীবীরা।

এ বিষয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. মো. বশির উল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসামিপক্ষ থেকে বারবার হাইকোর্টে আবেদন করে স্থগিতাদেশ নেওয়া হয়েছে। এ কারণে নিম্ন আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ করা যায়নি। এ অবস্থায় আসামিপক্ষের আবেদন হাইকোর্টে নিষ্পত্তির জন্য রাষ্ট্রপক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়। হাইকোর্ট গত জুলাইয়ে এক আদেশে নিম্ন আদালতকে মামলাটির বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। আশা করি, এই আদেশের পর সেখানে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে।’

এ বিষয়ে গোপালগঞ্জ জেলা আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল হালিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধান আসামির প্রভাব ও একটি দুষ্ট চক্রের কারণে এত দিন সাক্ষ্য গ্রহণ করা যায়নি।’ তিনি বলেন, ‘প্রায় অর্ধেক আসামি মারা গেছে। সাক্ষীদের মধ্যেও মরতে মরতে প্রায় সব শেষ। এখনো সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করা যায়নি। আগামী ৪ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য রয়েছে। এদিন সাক্ষী উপস্থিত করে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আমাদের (রাষ্ট্র) পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা রয়েছে।’

নিহত মুক্তিযোদ্ধা কমলেশ বেদজ্ঞর মেয়ে সুতপা বেদজ্ঞ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার পিতাকে যখন হত্যা করা হয় তখন আমার বয়স আড়াই বছর। সে সময় ছয় মাস বয়সের আমার একটি বোনও ছিল। আমরা চার ভাই-বোন। পিতাকে হত্যার পর অসহায় হয়ে পড়ি। এরপর প্রধান আসামি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় আমাদের হুমকি-ধমকি দিতে থাকে। অনন্যোপায় হয়ে আমার মা ও অপর তিন ভাই-বোন ১৯৮০ সালে ভারতে চলে যায়। তারা আর দেশে আসেনি। মা মারা গেছে ২০১২ সালে। কিন্তু আমি জেদ করে একাই দেশে রয়ে যাই পিতা হত্যার বিচার দেখার জন্য। কিন্তু আজও সেই বিচার পাইনি। বিচার পাব কি না, জানি না। আসামি ও সাক্ষীদের অনেকেই মারা গেছে। তার পরও আমি যত দিন বেঁচে আছি তত দিন লড়ে যাব বিচারের আশায়।’

জানা যায়, ১৯৭৩ সালের ১০ মার্চ জনপ্রিয় পাঁচ মুক্তিযোদ্ধা ওয়ালিউর রহমান লেবু, কমলেশ বেদজ্ঞ, বিষ্ণুপদ, মানিক ও শেখ লুত্ফুর রহমানকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল হেমায়েতের লোকজন। এরপর পিটিয়ে, কুপিয়ে হত্যা করেছিল লেবু, কমলেশ, বিষ্ণুপদ ও মানিককে। এ ছাড়া শেখ লুত্ফুর রহমানকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে গিয়েছিল। কিন্তু আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে যান তিনি। হাসপাতালেই পুলিশ লুত্ফুর রহমানের জবানবন্দি নিয়েছিল, যা মৃত্যুকালীন জবানবন্দি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই জবানবন্দিকেই পরদিন ১১ মার্চ মামলার এজাহার হিসেবে গ্রহণ করে গোপালগঞ্জ থানার পুলিশ। এ কারণে তাঁকে মামলার বাদী হিসেবে ধরা হয়। পুলিশ তদন্ত শেষে একই বছরের ২৫ মে অভিযোগপত্র দাখিল করে ২৪ আসামির বিরুদ্ধে। আসামিপক্ষ থেকে পুনরায় তদন্তের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়। ১৯৭৯ সালের ২৪ এপ্রিল তৎকালীন ফরিদপুর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ওই আবেদন খারিজ করে দেন। এরপর মামলাটি বিচারের জন্য সামরিক আদালতে যায়। এ পরিস্থিতিতে প্রধান আসামি হেমায়েত উদ্দিন বিএনপিতে যোগ দেন বলে জানা যায়। তাঁর প্রভাবে মামলাটি আবার তদন্তের জন্য পাঠানো হয়। এতে তদন্ত ঝুলে যায়। ১৯৮৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি আবার অভিযোগপত্র দেয় তদন্ত সংস্থা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা