kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

রোহিঙ্গা ইস্যুতে ফোরটিফাই রাইটসের প্রতিবেদন

রাষ্ট্রহীন করাও জেনোসাইড

‘গত শতকের আশির দশকেই রোহিঙ্গা গোষ্ঠীকে জেনোসাইডের মাধ্যমে নির্মূল করার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছিল’

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা বা লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে দেশ ছাড়া করে নয়, বরং তাদের রাষ্ট্রহীন করার মাধ্যমে রোহিঙ্গা জেনোসাইড শুরু করেছিল মিয়ানমার। সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ফোরটিফাই রাইটস এক প্রতিবেদনে এমনটি দাবি করেছে। গতকাল মঙ্গলবার ব্যাংককে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধর্মীয়, নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের কারণে মিয়ানমার গত শতকের আশির দশকেই রোহিঙ্গা গোষ্ঠীকে ‘জেনোসাইডের’ মাধ্যমে নির্মূল করার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। হাজার বছর ধরে রাখাইন রাজ্যের ওই বাসিন্দাদের ‘রাষ্ট্রহীন’ করা হয়েছিল মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনে। এরপর তাদের বন্দুকের নলের মুখে ও নির্যাতন করে ন্যাশনাল ভেরিভিকেশন কার্ড (এনভিসি) বা জাতীয়তা যাচাইকরণ কার্ড নিতে বাধ্য করে। প্রথমে নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে এনভিসির জটিল প্রক্রিয়াটি এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে না পারে।

‘জেনোসাইডের উপকরণ : মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের নাগরিকত্ব অস্বীকার ও জাতীয়তা যাচাইকরণ কার্ড’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে ফোরটিফাই রাইটসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ম্যাথু স্মিথ বলেন, ‘মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের ধ্বংস করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই প্রক্রিয়া এবং এর প্রভাবের মধ্যেই রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণগুলো নিহিত আছে। এর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গা সংকট চলতেই থাকবে।’

প্রতিবেদনে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার এবং পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে গতকাল ফোরটিফাই রাইটসের প্রতিবেদন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিরাও। অনুষ্ঠানে নাইম নামে এক রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী বলেন, ‘১৯৫০-এর দশকের মাঝামাছি আমাদের নাগরিকত্ব অধিকার ছিল। এরপর কিভাবে হঠাৎ আমরা নাগরিকত্বের যোগ্যতা হারালাম?’ তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গারা এনভিসি গ্রহণ করছে না। কারণ এনভিসি কোনো সমাধান নয়। রোহিঙ্গারা তাদের নাগরিকত্ব ফিরে পেতে চায়।’

মিয়ানমার, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় আশ্রিত ৩০৪ জন রোহিঙ্গা নারীসহ ছয় শতাধিক ব্যক্তির সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ফোরটিফাই রাইটস ১০২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের ‘বিদেশি’ তকমা দিয়ে কিভাবে তাদের নাগরিকত্বসহ সব অধিকার কেড়ে নিয়েছে তার বর্ণনা রয়েছে প্রতিবেদনে। ব্যাংককে ওই অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ৯৯.৬ শতাংশই বলেছে যে এনভিসি না নিলে মিয়ানমারে তাদের কাজ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনভিসি নেওয়ার জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। এনভিসি নিতে অস্বীকৃতি জানানো রোহিঙ্গাদের জীবন-জীবিকা ও চলাফেরার সুযোগ সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। মিয়ানমার সরকারের সৃষ্টি করা অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের কারণে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোও সরকারের এনভিসি নীতি ও রোহিঙ্গাদের পরিচয় মুছে ফেলতে সহায়তা করেছে। নাগরিকত্ব অস্বীকার ও এনভিসি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের যেসব অধিকার লঙ্ঘন করেছে তা আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে।

প্রতিবেদনে জেনোসাইড প্রতিরোধবিষয়ক জাতিসংঘ দপ্তরের সতর্ক বার্তা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ওই দপ্তর মিয়ানমারে গণহত্যা, জেনোসাইড চালানোর মাধ্যমে একটি জাতিগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার মতো অনুকূল পরিবেশ আছে বলে সতর্ক করেছিল। রোহিঙ্গারাও তাদের সাক্ষাৎকারে বলেছে, তাদের ওপর জেনোসাইড সংঘটনে এনভিসিকে ব্যবহার করা হয়েছে। মিয়ানমার সরকার ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইন করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়েছে এবং দেশের নৃগোষ্ঠীর তালিকা থেকে ‘রোহিঙ্গা’ বাদ দিয়েছে।

‘রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনে দক্ষিণ কোরিয়ারও ভূমিকা আছে’ : দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইনের সঙ্গে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির বৈঠকের প্রাক্কালে মিয়ানমারে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার ইয়াংহি লি বলেছেন, দক্ষিণ কোরিয়া মিয়ানমারে ষষ্ঠ বৃহৎ বিনিয়োগকারী। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনে ‘অসাবধানতাবশত’ দক্ষিণ কোরিয়ারও ভূমিকা আছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা