kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

রোহিঙ্গা সংকট

সংলাপ ডাকা ছাড়া সবই করছে সরকার

পররাষ্ট্রমন্ত্রী কালের কণ্ঠকে বললেন, রোহিঙ্গা সমস্যা এখনো জাতীয় সংকট নয়

মেহেদী হাসান   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিএনপি সম্প্রতি যে ১০টি সুপারিশ করেছে তার সব কটির ব্যাপারে শুরু থেকেই কাজ করছে সরকার। শুধু প্রথম সুপারিশ অর্থাৎ রোহিঙ্গা সংকটকে জাতীয় সংকট হিসেবে বিবেচনা করে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির জন্য জাতীয় সংলাপের ডাক দেওয়ার উদ্যোগ নেয়নি সরকার। আর এই সুপারিশটি যৌক্তিক বলেও মনে করেন না সরকারের নীতিনির্ধারকরা।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রোহিঙ্গারা একটি সংকট। কিন্তু এটি এখনো জাতীয় দুর্যোগ বলে আমরা মনে করি না।’ তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে তারা (বিএনপি) বহুদিন পরে সজাগ হয়েছে। এ কারণে আমরা আনন্দিত। তবে আমরা এটিকে এখনো জাতীয় সংকট বলে মনে করছি না।’

গত ২৮ আগস্ট ঢাকার একটি হোটেলে বিএনপির উদ্যোগে ‘রোহিঙ্গা সংকট ও বাংলাদেশের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা থেকে দলটি সরকারের জন্য ১০ দফা সুপারিশ করে। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, কানাডা, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ভারত, পাকিস্তান, নরওয়ে, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, আফগানিস্তান, তুরস্ক, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মিশনের কূটনীতিকরা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এমন এক বিদেশি কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, আমন্ত্রিত হয়ে তিনি ওই আলোচনা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানে আলোচকদের বক্তব্য শুনেছেন এবং দূতাবাসকে পরে তা জানিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, একজন বিদেশি কূটনীতিক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব হলো এ দেশে ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করা এবং তিনি তাই করেছেন। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় সরকারের তৎপরতা তাঁরা পর্যবেক্ষণ করছেন এবং এ বিষয়ে বিএনপির বক্তব্যও শুনেছেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকার যেভাবে সাড়া দিয়েছে তা কূটনৈতিক মহলসহ বহির্বিশ্বে প্রশংসা কুড়িয়েছে। অবশ্যই এ প্রশংসার দাবিদার বাংলাদেশের জনগণ, বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দাতা কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠী।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা ঢল শুরু হওয়ার পর তাদের আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে তেমন কারোরই ভিন্নমত ছিল না। আশ্রয় দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি সরকারই নিয়েছে। আর ওই সিদ্ধান্তের ফলে ৯ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা প্রাণে বেঁচেছে। সরকারের ওই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত।

জানা গেছে, জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করে জাতীয় সংলাপ আয়োজনের ব্যাপারে বিএনপির সুপারিশের বিষয়ে সায় নেই সরকারের নীতিনির্ধারকদের। সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্রে জানা যায়, বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ, উচ্চপর্যায়ে আলোচনা—এসব সরকারই করে থাকে। এর বাইরে এসব ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য ‘লিপ সার্ভিস’ ছাড়া তেমন কিছু করতে পারে না। গত দুই বছরে সরকারের বাইরে থাকা দলগুলোর রোহিঙ্গা ইস্যুতে তেমন কোনো তৎপরতাও দেখা যায়নি।

বিএনপির দ্বিতীয় সুপারিশটি হলো—রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, সুরক্ষাসহ অধিকার নিশ্চিত করে প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নেওয়া। সরকারি সূত্রগুলো বলছে, প্রত্যাবাসন চুক্তি থেকে শুরু করে সরকার এ লক্ষ্যেই কাজ করছে।

তৃতীয় সুপারিশে বিএনপি মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা নেওয়ার কথা বলেছে। বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর কেউ কেউ এখনো বাংলাদেশের পাশে নেই বলেও সেখানে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। সরকারি সূত্র মতে, বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সবাই একবাক্যে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের প্রত্যাশা জানাচ্ছে। সরকারও তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে নিবিড় যোগাযোগ রাখছে।

চতুর্থ সুপারিশে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার পর ‘ক্যাম্পে (শিবিরে)’ না রাখার কথা বলেছে বিএনপি। সরকারি সূত্রের দাবি, প্রত্যাবাসন চুক্তি এবং পরে এসংক্রান্ত সমঝোতাগুলোতেও এ বিষয়টির সুরাহা হয়েছে। পঞ্চম সুপারিশে বিএনপি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অন্যদের রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পর থাকার জন্য নির্ধারিত এলাকা পরিদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, সরকারি প্রতিনিধিদলের সফরের চেয়ে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের ‘মাঝিদের’ (নেতা) ওই এলাকা পরিদর্শনের সুযোগ দিলে তাদের আস্থা ফেরাতে ভূমিকা রাখবে। সরকার এ বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল গত বছর রাখাইন রাজ্য সফর করেছে। বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে মিয়ানমার রাখাইন রাজ্য সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, রোহিঙ্গাদের যাওয়ার পর তারা কেমন আছে তা তিনি দেখতে যাবেন।

ষষ্ঠ সুপারিশে বিএনপি প্রত্যাবাসন দেখভাল প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘকে যুক্ত করতে বলেছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তি সই হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে যুক্ত করেছে। বিএনপি তার সপ্তম সুপারিশে সরকারকে রোহিঙ্গা জেনোসাইড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে সহযোগিতা দিতে বলেছে। এটি বিএনপির সুপারিশ দেওয়ার অনেক আগেই সরকার নিজ উদ্যোগে করেছে এবং করে চলেছে বলে সরকারি সূত্রগুলো বলছে। বিশেষ করে, আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতকে (আইসিসি) বাংলাদেশই বলেছে, এ দেশে থাকা রোহিঙ্গাদের ওপর আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার আছে। বিএনপি তার অষ্টম সুপারিশে রোহিঙ্গা সংকট থেকে জঙ্গি বা সন্ত্রাসের উত্থান ঠেকানোর আহ্বান জানিয়েছে। এ বিষয়েও সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছে বলে সরকারি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন। নবম ও দশম সুপারিশে বিএনপি রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় তার কূটনৈতিক মিশন ও অন্য অংশীদারদের কাজে লাগানোর এবং বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ এ বিষয়ে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা