kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ফুলবাড়িয়ায় ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ভ্যান

পিএলআইডি রোগে ভুগছে চালকরা

মো. আব্দুল হালিম, ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ)   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পিএলআইডি রোগে ভুগছে চালকরা

৩৬ বছর বয়সী রুহুল আমীন রিকশা চালান। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া পৌর এলাকার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পাঁচ কুশমাইল গ্রামে তাঁর বাস। ১৮ বছর ধরে দুই পায়ে রিকশায় পেডাল দিয়েছেন। ছয় বছর আগে নিজের শরীরকে আরাম দিতে পেডালের রিকশা ছেড়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানো শুরু করেন। তাঁর জমিজমা নেই। রিকশার চাকা ঘুরলে তাঁর পাঁচ সদস্যের সংসারের চাকা ঘোরে। সারা দিনে রিকশা চালিয়ে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত ইনকাম (ভাড়া) করতে পারেন। তা দিয়ে সংসার চালিয়ে মাস শেষে কিছুটা সঞ্চয় হতো তাঁর। ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানোর কারণে তাঁর হাঁটু, কোমর ও শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা। ভারী কোনো কাজও করতে পারেন না। চিকিৎসক তাঁকে জানিয়েছেন  পিএলআইডি রোগে আক্রান্ত তিনি। ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানো বন্ধ না করলে তাঁর এই সমস্যা (রোগ) ভালো হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন তাঁকে। যেদিন শরীরে বেশি ব্যথা হয়, সেদিন রিকশা নিয়ে বের হন না তিনি।

ফুলবাড়িয়া শহরের রুহুল আমীন, মোজাম্মেল হক, তালুকদার, সাইফুল ইসলাম, রমজান আলী, মোসলেম উদ্দিন, আবুল হোসেন, চাঁন মিয়াসহ কমপক্ষে ৩০ জন ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ভ্যানচালকের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তাঁরা সবাই ১০ থেকে ৩৫ বছর ধরে ভ্যান ও রিকশা চালাচ্ছেন। আগে পায়ে পেডাল দিয়ে রিকশা-ভ্যান চালিয়েছেন, আর এখন ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান গাড়ি চালান। পেডালের রিকশা চালাতে কষ্ট বেশি হলেও শরীর, দুই হাত, হাঁটু ও কোমর ব্যথা ছিল না তাঁদের। ব্যাটারিচালিত রিকশা চালিয়ে শরীরসহ দুই হাত, হাঁটু ও কোমর ব্যথায় আক্রান্ত প্রায় সবাই। দুই পা ওপরে তুলে গাড়ি চালানোর সময় তাঁদের পায়ে ঝিঁ ঝিঁ ধরে। কেউ তেমন কোনো ভারী কাজ করতে পারেন না। বেশি ব্যথা করলে ফার্মেসি থেকে ব্যথানাশক ওষুধ কিনে সেবন করেন। তবে তাঁরা সবাই বলেছেন, ব্যাটারিচালিত গাড়ি চালানোর কারণে তাঁদের শরীরে এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। পেডালে রিকশা-ভ্যান চালানোর সময় তাঁদের এ সমস্যা ছিল না।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেছেন, রিকশা ও ভ্যানগাড়ি চালকদের বসার সিটের জায়গা স্বল্প। ঠিকমতো বসতে পারেন না। গাড়ি চালানোর সময় তাঁরা পা ওপরে তুলে সামনের দিকে ঝুঁকে থাকেন ও গাড়ির সম্পূর্ণ ঝাঁকি তাঁদের কোমরের হাড়ে লাগে। অতিমাত্রায় ঝাঁকি লাগার ফলে মেরুদণ্ডের হাড়ের মাঝখানে যে পরিমাণ স্পেস (জায়গা) থাকে, তা ছোট হয়ে যাওয়ার ফলে তাঁদের কোমরে ব্যথার সৃষ্টি হচ্ছে। যেটাকে লাম্বার ইন্টার-ভার্টিব্রাল ডিস্ক প্রল্যাপস (পিএলআইডি) রোগ বলা হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পা দুটি ওপরে তুলে রাখার কারণেই চালকদের হাঁটুতে ব্যথা করে। যেটা অস্টিওআর্থ্রাইটিস রোগের প্রধান কারণ। অস্টিওআর্থ্রাইটিস রোগটি ধীরে ধীরে হয়ে থাকে হাঁটুর জয়েন্টে, ঠিকমতো চিকিৎসা না করালে একসময় মানুষের চলাফেরা বন্ধ হয়ে যায়।

ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল কর্মকর্তা ডা. হারুন আল মাকসুদ বলেন, ব্যাটারিচালিত ভ্যান ও রিকশাচালকরা দ্রুতগতিতে গাড়ি চালায়। অতিরিক্ত ঝাঁকুনির কারণে তাদের শরীরের হাড়ে ব্যথার সৃষ্টি হচ্ছে, যেটাকে বলা হয় পিএলআইডি রোগ। একজন রিকশা-ভ্যানচালক যদি ২০-২৫ বছর এসব গাড়ি চালায় তাহলে তার পঙ্গু হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বেশি ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার ফলে তাদের কিডনিতে সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি থাকে। স্বল্প ও মাঝারি মাত্রার পিএলআইডি আক্রান্ত হলে ওষুধ ও ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তীব্র মাত্রার পিএলআইডি হলে অপারেশন প্রয়োজন হতে পারে।

রিকশা-ভ্যান গাড়িচালক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, রিকশা ও ভ্যানচালকরা প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা গাড়ি চালায়। এর মধ্যে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা সময় তাঁরা চালকের সিটে বসে ডান দিকে পা দুটি গাড়ির ফ্রেমে ওপরে তুলে বসে থাকে। ব্যাটারিচালিত হওয়ায় রিকশা ও ভ্যানগাড়ির গতিও থাকে অনেক। গতি এবং রাস্তাঘাট ভাঙা থাকায় তাদের শরীরে ঝাঁকি লাগে অনেক বেশি। উপজেলায় প্রায় ১৬ হাজার রিকশা-ভ্যান রয়েছে। এর মধ্যে ১৪ হাজার রিকশা-ভ্যান ব্যাটারিচালিত। এসব চালকের হাত, কোমর ও হাঁটুতে কমবেশি ব্যথা রয়েছে। ভাড়া বেশি পাওয়ার কারণেই চালকরা ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যানগাড়ির দিকে ঝুঁকছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা