kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সিলেটেও ‘ড্যান্ডির’ হানা

আসক্তদের বড় অংশই শিশু-কিশোর

ইয়াহইয়া ফজল, সিলেট    

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সিলেটেও ‘ড্যান্ডির’ হানা

সিলেট নগরের মূল প্রবেশপথ শাহজালাল সেতু। দক্ষিণ সুরমার হুমায়ুন রশীদ চত্বর থেকে সেতুমুখী হলেই বাঁ পাশে চোখে পড়বে জঙ্গলময় পরিত্যক্ত জমি। সেখানে খেলছিল ৮-৯ বছর বয়সী কয়েকটি ছেলে। সবার হাতেই পলিথিন ব্যাগ। একজন আরেকজনকে ধাওয়া করছে, ধরতে গেলে সরে যাচ্ছে অন্যজন। তা দেখে অন্যরা হেসে লুটোপুটি। এমন খেলার ফাঁকে ফাঁকে পলিথিনের ব্যাগে নাক-মুখ গুঁজে লম্বা শ্বাস নিচ্ছে তারা। যেন বিষয়টি খেলারই অংশ। গতকাল শনিবার বিকেলে নগরের দক্ষিণ সুরমার হুমায়ুন রশীদ চত্বর থেকে শাহজালাল সেতুমুখী হতেই এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। পলিথিনের ঠোঙায় নাক-মুখ গুঁজে শ্বাস টানার এ দৃশ্য সর্বনাশা মাদকের নেশা ছাড়া আর কিছু নয়। এটা ড্যান্ডি নামে পরিচিত।

রাজধানীর ফুটপাতে ‘ড্যান্ডি নেশা’র দৃশ্য পুরনো হয়ে গেছে। সিলেটেও চলছে দীর্ঘদিন ধরে। নানা বয়সীদের মধ্যে এ নেশার প্রভাব থাকলেও উদ্বেগের বিষয় হলো আসক্তদের বেশির ভাগই শিশু-কিশোর। বিশেষ করে পথশিশু ও বস্তিবাসী শিশু-কিশোরদের বড় অংশই ড্যান্ডিতে আসক্ত হয়ে পড়েছে। তারা রাস্তাঘাট ও ফুটপাতে অনেকটা প্রকাশ্যে এ মাদক সেবন করছে।

হুমায়ুন রশীদ চত্বরের পাশের এলাকায় যারা ড্যান্ডি মাদক সেবন করছিল তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সমবয়সী অন্যদের দেখে দেখে তারা ড্যান্ডিতে আসক্ত হয়েছে। প্রথম প্রথম কৌতূহলে, এখন তা অভ্যাস হয়ে গেছে।

শুধু নগরের হুমায়ুন রশীদ চত্বরই নয়, সিলেট রেলস্টেশন এলাকা, কিনব্রিজসংলগ্ন সুরমা নদীর তীর, সুরমা মার্কেট পয়েন্টের আশপাশ, কোর্টের আশপাশ, বন্দরবাজার এলাকায় ফুট ওভারব্রিজের ওপরে, পশ্চিম জিন্দাবাজারে পানশী রেস্টুরেন্টের আশপাশে, রিকাবীবাজারে সিলেট অডিটরিয়ামসংলগ্ন কবি নজরুল চত্বর এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় শিশু-কিশোরের ড্যান্ডি সেবনের দৃশ্য চোখে পড়ে।

নগরের কিনব্রিজসংলগ্ন এলাকায় গতকাল বিকেলে গিয়ে দেখা গেছে একই চিত্র। ব্রিজের ওপরের বিশাল পাঠাতনে পা ঝুলিয়ে বসে আছে দুই কিশোরের একজন। আরেকজন দুই পা তুলে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। দুজনের হাতেই পলিথিন ব্যাগ। ড্যান্ডি সেবনে মগ্ন দুজনই। নিচে সুরমা নদীর তীরঘেঁষা দীর্ঘ ওয়াকওয়েতে হাঁটছে বিভিন্ন বয়সী মানুষ।

নগরের জালালাবাদ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী নাকিব আহমদ স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে কিনব্রিজ এলাকায় বেড়াতে এসেছেন। তিনি বললেন, ‘সারা দিন ব্যস্ততার পর ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ খুব একটা মেলে না। মাঝেমধ্যে এখানে আসি পরিবার নিয়ে। কিন্তু এখানকার পরিবেশ ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। বাচ্চা ছেলেরা প্রকাশ্যে মাদক সেবন করছে। এসব দেখে কোমলমতি শিশুদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ার শঙ্কা থেকে যায়। তা ছাড়া এসব বাচ্চার জীবনও তো অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।’

এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সিলেটের অতিরিক্ত পরিচালক মো. জাহিদ হোসেন মোল্লা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিশু-কিশোররাই ড্যান্ডি নেশায় আসক্ত হচ্ছে বেশি, বিশেষ করে পথশিশুরা। সরকারি নিরাময় কেন্দ্র সিলেটে নেই। শিগগিরই হয়ে যাবে। সরকারি নিরাময় কেন্দ্র হলে তখন তাদের ধরে এনে সংশোধন করা যাবে।’ এটি রোধে করণীয় সম্পর্কে জাহিদ বলেন, ‘আমরা মাঝেমধ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে এদের ধরে এনে ১০-১৫ দিন আটকে রাখি। কিন্তু এত কম সময়ে সংশোধন করা যায় না। কমপক্ষে তিন মাস রাখা গেলে সংশোধন করা সম্ভব।’

পথশিশুদের মধ্যে ড্যান্ডি আসক্তি বাড়ার কারণ সম্পর্কে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রথমত সহজলভ্যতা। ড্যান্ডি নেশার জন্য যে গ্লু (আঠা) ব্যবহার করা হয়, এটি সহজেই পাওয়া যায়। বিশেষ করে জুতা ও ফোম ইন্ডাস্ট্রির কাজে লাগে এই আঠা। সেটার ফেলে দেওয়া অংশের অপব্যবহার করে তারা।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা