kalerkantho

সোমবার । ২৬ আগস্ট ২০১৯। ১১ ভাদ্র ১৪২৬। ২৪ জিলহজ ১৪৪০

কুড়িগ্রামে ভাঙন

তিস্তার পেটে ৫০ বাড়ি

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি   

১১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তিস্তার পেটে ৫০ বাড়ি

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের এক-চতুর্থাংশ এলাকা ১০ বছরে তিস্তা নদীর ভাঙনে বিলীন হয়েছে। এবার বন্যার আগে ইউনিয়নের কিছুটা ভেঙেছে। আর বন্যার পর চলছে ভয়াবহ ভাঙন। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) দেড় মাস ধরে জিও ব্যাগ ফেলেও ভাঙন ঠেকাতে পারেনি। গত এক সপ্তাহেই অর্ধশতাধিক বাড়িঘর নদীগর্ভে গেছে। নদীতীরে চলছে ভাঙনকবলিতদের আর্তনাদ। অনেকেই খোলা আকাশের নিচে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

এদিকে নদীতীর রক্ষা বাঁধ থেকে মাটি কেটে জিও ব্যাগ ভরার অভিযোগ উঠেছে পাউবোর শ্রমিকদের বিরুদ্ধে। ফলে সেই এলাকা দিয়ে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া বাঁধের ৫০ ফুট পাশ থেকেই ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা কতটুকু পরিবেশবান্ধব, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গতকাল শনিবার ভাঙনকবলিত চতুরা ও কালিরহাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভাঙন এলাকা থেকে বেশ কয়েকটি বাড়ি ভেঙে এনে রাখা হয়েছে। উদাস চোখে তাকিয়ে আছে লোকজন। কালিরহাটের বৃদ্ধা সোহাগী রানী (৮৫) দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেঁদে বলেন, ‘বাপ-মায়ে আদর করি নাম রাখছিল সোহাগী। স্বামী চলি গেল; সেই সাথে সোহাগ-সুখ কাড়ি নিল তিস্তা নদী।’ তাঁর ছেলে সামারু চন্দ্র রায়ের স্ত্রী পূর্ণিমা চন্দ্র রায় বলেন, ‘বাড়িঘর, জমি, গাছপালা সব নদী কেড়ে নিল। চার দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছি। জায়গা না পেয়ে ঘরবাড়ি রাস্তায় ফেলে রেখেছি। ছেলে ইন্টারে আর মেয়ে ক্লাস সিক্সে পড়ে। তাদের নিয়ে খুব বিপদে আছি। এখন কী করব জানি না।’

সাংবাদিক এসেছেন শুনে নারায়ণ চন্দ্র বর্মণ (৬৩) ছুটে এলেন। বললেন, ‘বাবারে, ২০ বার বাড়ি ভাঙছি। হামরা এ্যালা নিঃস্ব হয়া গেছি। হামাকগুলার দেকপের কাঁইয়ো নাই। টেকা-পয়সা নাই। জায়গাও কিনবার পাবার নাগছি না। হামরা পথের ভিখারি হয়া গেছি। সরকার হামারগুলার জন্য থাকবার জাগা করি দেউক।’

চতুরা-হংসধর বাঁধের মাথা এলাকার আহাম্মদ আলীর রাত কাটে নির্ঘুমে। ঘরের উঠানে চলে এসেছে নদী। যেকোনো সময় বাড়িটি বিধ্বস্ত হয়ে যেতে পারে। তিনি জানালেন, বিদ্যানন্দ বাজার, তৈয়ব খাঁ, ডাংরা, ডাবুরহালান, ডারিয়া, হংসধর, কালিরভিটাসহ সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙছে তিস্তা নদী। গত এক সপ্তাহে ভেঙেছে চতুরার মনতাজ আলী, আমজাদ আলী, হাফিজুর রহমান, আলী মণ্ডল, মমতাজ, আইজুল ও জমির হোসেনের বাড়ি। ভাঙনের মুখে আছে আরো অনেকের বাড়ি। বাড়ি ভাঙনের আশঙ্কায় থাকা কালিরহাটের জয়ন্তী রানী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘বাপুরে, বাড়ি আগুনে পুড়লেও ভিটাটা থাকে। কিন্তু নদী খাইলে কিছুই থাকে না।’

চতুরা এলাকার আজাদ ও কামরুল জানান, এখানে পাউবোর নিয়োজিত শ্রমিকরা বাঁধ নষ্ট করে মাটি কেটে জিও ব্যাগে ভরছে। এখন এই রাস্তা দিয়ে গাড়ি-ঘোড়া চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে শ্রমিকদের প্রশ্ন করা হলে তারা জানায়, তারা বাঁধ থেকে মাটি কেটে জিও ব্যাগ ভরছে। আবার ড্রেজার দিয়ে সেটা পূরণ করছে। বাঁধ থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরেই বসানো হয়েছে ড্রেজার। তা দিয়েই মাটি পূরণ করছে।

বিদ্যানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাইজুল ইসলাম বলেন, ‘গত এক দশকে আমার ইউনিয়নের এক-চতুর্থাংশ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আগে ভোটার ছিল ২৯ হাজার, এখন কমে ১৩ হাজার। ১১টি মৌজার মধ্যে সাতটি মৌজা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আমরা সরকারের কাছে ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত স্থায়ী কাজ চাই।’

কুড়িগ্রাম পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের লোকজন কালিরহাট এলাকায় ভাঙন ঠেকাতে জিও ব্যাগ ডাম্পিংকাজ করছে। কেউ বাঁধ কেটে মাটি ভরার কাজ করে থাকলে সেটা আমাদের জানা নেই। আমরা চর থেকে নৌকায় বালু এনে কাজ করছি। আর ড্রেজারের কাজ এখন বন্ধ রয়েছে।’

জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন বলেন, ‘ভাঙনকবলিতদের পুনর্বাসনের জন্য সরকার কাজ করছে।’

হংসধর বাঁধের মাথায় ও কালিরহাট এলাকায় মকবুল, ইয়াকুব মিস্ত্রী, দীনবন্ধু রায়, নিপেন চন্দ্র রায়, সামাল চন্দ্র রায়, সুরেশ চন্দ্র রায়, সুধীর চন্দ্র রায়, নারায়ণ চন্দ্র রায়, প্রদীপ চন্দ্র রায়, সুকুমার চন্দ্র রায়, বানেশ্বর চন্দ্র রায়, উপেন চন্দ্র রায়, লক্ষ্মীকান্ত চন্দ্র রায়, নিবাস চন্দ্র রায়, নিবারণ চন্দ্র রায়, সুবাস চন্দ্র রায়, সঞ্জয় চন্দ্র রায়, রঙমালা, সুবল, প্রফুল্ল, যতীশ, নবীন চন্দ্র রায়সহ আরো অনেকের বসতভিটা। সে সব বসতভিটাও ভাঙনের মুখে রয়েছে।

মন্তব্য