kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

সায়েমের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল সামরিক বাহিনী

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

১০ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সায়েমের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল সামরিক বাহিনী

রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের পদত্যাগের আগে তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছিল তখনকার প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (সিএমএলএ) জিয়াউর রহমান ও সামরিক বাহিনী। গত বৃহস্পতিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের অবমুক্ত করা গোপন কূটনৈতিক নথি থেকে জানা যায়, ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি সায়েমকে সরিয়ে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতি হওয়ার কারণ ও সম্ভাব্য প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে ২২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাস্টার্স। তিনি তাঁর বার্তায় লিখেছিলেন, সায়েমের স্বাস্থ্যের অবনতি হয়ে থাকতে পারে। এটি জানা ছিল যে জিয়া এবং হয়তো সামরিক বাহিনীর আরো অনেকে সায়েমের শ্লথগতির কাজকর্মে অসন্তুষ্ট ছিলেন। এর বাইরে কোনো জটিলতার কথা জানা যায়নি। তবে এখনো নিশ্চিত করে বলা না গেলেও সম্ভবত ১৯৭৬ সালের নভেম্বর মাসে সাধারণ নির্বাচন স্থগিত করার ব্যাপারে সায়েমের বিরোধিতার কারণে সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক উপদেষ্টাদের সবাই বা কেউ কেউ অধৈর্য হয়ে উঠেছিল। তা ছাড়া ১৯৭৭ সালের জুন মাসে কমনওয়েলথ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার বিষয়টিও ছিল।

রাষ্ট্রদূত মাস্টার্স লিখেছিলেন, ‘আমরা ধারণা করছি, ওই সিদ্ধান্তটি (সায়েমকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরানো) জিয়া সম্ভবত এককভাবেই নিয়েছিলেন। তবে সেনাবাহিনীর শীর্ষ সদস্যদের সঙ্গে পূর্ণ সমন্বয় করেই তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অ্যাডমিরাল খান ও এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদও এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন কি না তা স্পষ্ট নয়।’

রাষ্ট্রপতি সায়েমের অসুস্থতা কতটা গুরুতর ছিল বা আদৌ তা ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার জন্য যৌক্তিক ছিল কি না, তা নিয়েও কিছুটা সংশয় আছে মার্কিন ওই টেলিগ্রামে। সে সময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ শামসুল হককে উদ্ধৃত করে তাতে বলা হয়েছে, সায়েম অসুস্থ হলেও তা এত গুরুতর ছিল না। অন্যদিকে তৎকালীন পররাষ্ট্রসচিব বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি সায়েম দুই দিন ধরে অসুস্থ ছিলেন।

তবে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের তারবার্তায় বলা হয়েছে, ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদ থেকে সায়েমকে সরিয়ে দেন। এরপর সায়েম রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক কিছু দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি উপদেষ্টা পরিষদের দায়িত্ব পালন করছিলেন। জিয়াউর রহমান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন।

এদিকে জিয়া রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর মেজর জেনারেল এরশাদ সেনাপ্রধান ও উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হতে পারেন—এমন সম্ভাবনার কথাও ওই টেলিগ্রামে ছিল।

ছিনতাই করা বিমান ঢাকায় : ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বরে বিমান ছিনতাই করে জাপানিজ রেড আর্মির ঢাকায় নামানো ও জিম্মি পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কয়েকটি কূটনৈতিক বার্তাও প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ছিনতাইকারীদের দাবি অনুযায়ী জাপান সরকার তার দেশের বিমানের যাত্রীদের মুক্তির জন্য নগদ ৬০ লাখ ডলার মুক্তিপণ দিতে রাজি হলেও আটক আট সন্ত্রাসীকে মুক্তি দিতে রাজি হয়নি। জিম্মিকারীরা তা প্রত্যাখ্যান করে জানায়, দেড় ঘণ্টার মধ্যে দাবি মানা না হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কার্টারের বন্ধু গেরফিল্ড ব্যাংকের বোর্ড চেয়ারম্যান জন গ্যাব্রিয়েলকে মেরে ফেলা হবে।

জাপানের মন্ত্রিসভা তখন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কাছে জানতে চেয়েছিল গ্যাব্রিয়েল সত্যিই কার্টারের বন্ধু কি না। হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে কোনো উত্তর দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র তখন বলেছিল, গ্যাব্রিয়েল মার্কিন প্রেসিডেন্ট কার্টারের সম্পর্কে প্রভাবিত না হয়ে জাপানের উচিত নিজেদেরই সিদ্ধান্ত নেওয়া।

এরপর স্বাস্থ্যগত কারণে জিম্মিকারীদের একজন গ্যাব্রিয়েলকে ছেড়ে দিয়েছিল।

অভ্যুত্থানচেষ্টা : ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস থেকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিকে (ডিআইএ) পাঠানো বার্তায় বিশ্বাসযোগ্য সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে বিমানবাহিনীর সদস্যদের অভ্যুত্থানচেষ্টার তথ্য জানানো হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, সকালের দিকে অভ্যুত্থানচেষ্টার পর দুপুর পর্যন্ত ১২০ জন সন্দেহভাজন আটক হয়েছে। প্রায় ২৫০ জন অভ্যুত্থানচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

রেড ক্রসের এক কর্মকর্তা বিমানবন্দরে হামলার পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কাজ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের এক কর্মকর্তাকে বলেন, টাওয়ার এরিয়া থেকে ৪১ জন বিদ্রোহী সেনার মরদেহ সরানো হয়েছে। কিছু ছিলেন বিমানবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা। সব বিদ্রোহীকে হত্যা করা হয়েছে। বিমানবন্দরের অফিসার্স মেসের কাছে বিদ্রোহীদের হামলাস্থল থেকে বিদ্রোহী সেনাদের মরদেহ সরানো হয়েছে।

রাষ্ট্রদূত মার্শালের ওই বার্তায় বলা হয়েছে, ‘অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার আজ (২ অক্টোবর ১৯৭৭) রাষ্ট্রদূতকে (মার্শাল) বলেছেন, তিনি এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, বিদ্রোহীরা আজ ভোরে এয়ারপোর্ট টাওয়ারে হামলা চালালে অনুগত বাহিনী তাদের হত্যা করেছে। নিহতদের মধ্যে এয়ারফোর্স মিলিটারি পুলিশের সাতজন ও এয়ার ফোর্সের চারজন কর্মকর্তা আছেন।’

১৯৭৭ সালের ৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাস্টার্সের পাঠানো আরেকটি বার্তায় বলা হয়েছে, জিম্মি সংকটের পটভূমিতে বিদ্রোহ নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে এবং সেগুলোর উত্তর মিলছে না। বিদ্রোহীদের উদ্দেশ্য, তাদের মধ্যে সমন্বয় এবং বগুড়া ও চট্টগ্রামে বিদ্রোহীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সন্দেহ আছে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের কোনো ভূমিকা আছে কি না, তাও নিশ্চিত নয়। তবে সামরিক আইন প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের লোকজন জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ আছে। জিয়া ও তাঁর সহযোগীদের ঐক্যের ওপর তাঁদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। ৩ অক্টোবর এক বৈঠকে জিয়াউর রহমান কঠোর পথ বেছে নেওয়ার ইঙ্গিত দেন।

রাষ্ট্রদূত মাস্টার্স তাঁর বার্তায় লিখেছেন, এসব ঘটনায় বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যে ক্ষুণ্ন হয়েছে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা