kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

আজ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস

হারিয়ে যাচ্ছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি

নিখিল ভদ্র   

৯ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত প্রায় অর্ধকোটি মানুষ। ক্রমে তারা মূলধারা থেকে পিছিয়ে পড়ছে। আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ শুক্রবার পালিত হবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। প্রতিবছর ৯ আগস্ট দিবসটি পালিত হয়। আদিবাসীদের অধিকার, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সুরক্ষা দিতে দিবসটি পালন করতে তাগিদ দেয় জাতিসংঘ।

এ বছর জাতিসংঘ ঘোষিত আদিবাসী দিবসের রজত জয়ন্তী। এবারের আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য—‘আদিবাসী ভাষাচর্চা এবং সংরক্ষণে এগিয়ে আসুন’। দিবসটি উপলক্ষে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আদিবাসীদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক জীবনের বঞ্চনা ও বৈষম্যের কথা তুলে ধরতে আদিবাসী দিবসকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের দাবি জানিয়েছেন আদিবাসী ফোরামের নেতারা।  

আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা কালের কণ্ঠকে বলেন, স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও দেশের ৩০ লক্ষাধিক আদিবাসী জনগণ মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত। এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে আদিবাসী ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। পপুলেশন ট্রান্সফার ও ক্রমাগত উচ্ছেদের ফলে নিজ ভূমি থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম, গারো পাহাড়, উত্তরবঙ্গ, গাজীপুর, মধুপুর বনাঞ্চল, পটুয়াখালী-বরগুনা, খাসিয়া অঞ্চলে সর্বত্র আদিবাসীরা সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছে। এ অবস্থায় আদিবাসীদের মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা তো দূরের কথা, বর্তমানে আত্মপরিচয়, মাতৃভাষা ও নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি আরো বলেন, ‘খাড়িয়া, কোড়া, সৌরা, মুণ্ডারি, কোল, মালতো, খুমি, পাংখোয়া, রেংমিটচা, চাক, খিয়াং, লুসাই ও পাত্র ভাষা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং এই ভাষা চর্চাকারী মানুষদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এই বেহাল। এ ক্ষেত্রে পার্বত্য শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়াও একটি বড় কারণ।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা ছাড়া শিক্ষা বা কোনো কাজেই নিজ ভাষা ব্যবহার করতে পারে না ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণ। এসব ভাষায় অন্য ভাষার অনুপ্রবেশ ঘটেছে প্রবলভাবে। বয়সে প্রবীণরা নিজ ভাষায় কথা বলতে পারলেও নতুন প্রজন্ম তাদের ভাষাটির ব্যবহার জানে না। দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী চাকমাদের ভাষায় সাহিত্য আছে। কিন্তু ওই সাহিত্য খুব কম লোকের কাছেই পৌঁছায়। অনেকে শুধু প্রার্থনার সময় মাতৃভাষা ব্যবহার করে। সাঁওতালদের ৪৯ শতাংশ মনে করে, নিজ মাতৃভাষার চেয়ে বাংলাই এখন বেশি প্রয়োজনীয়। উত্তরবঙ্গের কোদা ও কোল জাতির কেউই এখন আর নিজ ভাষায় পড়তে বা লিখতে পারে না। একই অবস্থা টাঙ্গাইলের কোচ ও দিনাজপুরের কড়া, ভুনজার, মুসহর জনগোষ্ঠীর।

দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারা দ্রুত বিকাশমান হলেও ভাষা ও সংস্কৃতির দিক থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণ পিছিয়ে পড়ছে বলে মনে করেন প্রাণ ও প্রকৃতি গবেষক পাভেল পার্থ। তিনি বলেন, শুধু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা বিলুপ্ত হচ্ছে তা নয়, তাদের সংস্কৃতিও হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের অনেক উৎসব ফসল কাটা ও উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু বন, প্রকৃতি ও জুম চাষ থেকে তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। আবার কখনো ইকো পার্কের নামে, কখনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামে বা প্রভাবশালীদের চাপে উচ্ছেদের কারণে তাদের সেই উৎসব হারিয়ে যাচ্ছে।

আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আদিবাসীদের উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তাদেরকে ভূমির অধিকার থেকে দূরে রাখা হয়েছে। সংবিধান সংশোধন করে তাদের ভূমি ও সংস্কৃতির অধিকার ফেরত দেওয়া জরুরি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা