kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অক্টোবর ২০১৯। ৩০ আশ্বিন ১৪২৬। ১৫ সফর ১৪৪১       

শুল্ক ফাঁকির রমরমা কারবার

♦ সোনামসজিদ স্থলবন্দরে ছয় মাসে ৩০০ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি
♦ জড়িত কাস্টমস কর্মকর্তারা

ইমতিয়ার ফেরদৌস সুইট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ   

৪ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ব্যাপক হারে শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মূলত কাস্টমস কর্মকর্তাদের সহায়তায় আমদানি পণ্যের মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে এবং আমদানি পণ্যের ওজন কম ধরার মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এ প্রক্রিয়ায় বন্দরে পণ্য খালাসের দায়িত্বে থাকা কিছু ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং এজেন্ট জড়িত।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ছয় মাসে অন্তত ৩০০ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। শুল্ক ফাঁকির পেছনে রয়েছে কাস্টমস কর্মকর্তাদের ‘ঘুষ বাণিজ্য’। ঘুষের টাকা ভাগবাটোয়ারা হতো রাজশাহীতে এক কাস্টমস কর্মকর্তার বাসায়।

জানা গেছে, শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে জড়িত চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ডা. সামিল উদ্দীন আহম্মেদ শিমুলের ভাই সোহেল আহমেদ পলাশ। যদিও পলাশ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

গত ২৪ জুলাই ঘুষ দিতে গিয়ে রাজশাহী মহানগরের উপশহর এলাকায় কাস্টমস কর্মকর্তা আইয়ুব আলীর বাসা থেকে গ্রেপ্তার হয় ছয়জন। ওই বাসায় প্রতি রাতেই ঘুষের টাকা ভাগবাটোয়ারা হতো বলে পুলিশ জানিয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আবু সাঈদ নয়ন ও মনিরুল ইসলাম জুয়েল বিভিন্ন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্সিতে কাজ করেন। তাঁদের নিজেদের লাইসেন্স নেই। আহসান কবির মিঠু সুলতান এন্টারপ্রাইজ নামের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্সির অংশীদার। বায়েজিদ হোসেন এরশাদ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী। আবদুল মান্নান নূর এন্টারপ্রাইজের মালিক। আবু হাসান রুবেল নামের আরেকজন সোনামসজিদ স্থলবন্দর কাস্টমসের সহকারী কমিশনার বিল্লাল হোসেনের অফিস সহায়ক। তাঁরা সবাই এখন জেলহাজতে। তবে কাস্টমস কর্মকর্তা আইয়ুব আলী পলাতক রয়েছেন।

পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন সোনামসজিদ বন্দর দিয়ে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মনিরুল ইসলাম জুয়েলের মাধ্যমে এক ট্রাক ভারতীয় প্রসাধনসামগ্রী আসে। এসব পণ্যের শুল্কের পরিমাণ প্রায় ৮০ লাখ টাকা। কিন্তু মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে চালানটি ২০ লাখ টাকা শুল্কায়নের মাধ্যমে খালাস করে নেওয়া হয়। আর শুল্ক কর্মকর্তাদের ঘুষের জন্য ২০ লাখ টাকা রাজশাহীতে আনা হয়। ওই টাকা কাস্টমস কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগ করার জন্য ওই দিন রাত ৯টায় কাস্টমস গোয়েন্দা সুপার আইয়ুব আলীর বাড়িতে জড়ো হন তাঁরা। এ সময় পুলিশ তাঁদের আটক করে।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত ৬০০ ট্রাক ফল ভারত থেকে এসেছে। ফলসহ প্রতিটি গাড়ির ওজন ৩০-৩১ মেট্রিক টন। এর মধ্যে প্রতিটি গাড়িতে ফল থাকে ২১ থেকে ২২ মেট্রিক টন। কিন্তু ব্যবসায়ীরা শুল্ক দেন ১৭ থেকে ১৮ মেট্রিক টনের। বাকি ফলের শুল্ক দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া প্লাস্টিক ক্যারেটের শুল্ক দেওয়ার বিধান থাকলেও তা নিচ্ছে না কাস্টমস। এ জন্য কাস্টমস কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়া হয় ফলের গাড়িপ্রতি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এ ছাড়া আঙুরের মতো উচ্চ শুল্কের ফল আনা হচ্ছে মিথ্যা ঘোষণায়। এ ছাড়া ফলের প্রতিটি ট্রাক থেকে ১০ হাজার টাকা করে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত তিন মাসে ভারত থেকে শুল্কমুক্ত পণ্য আমদানির মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে প্রায় ১০০ ট্রাক প্রসাধনসামগ্রী এনেছে আমদানিকারকরা। প্রতি ট্রাক প্রসাধনসামগ্রীর শুল্ক প্রায় এক কোটি টাকা। এর বিনিময়ে ট্রাকপ্রতি ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ নিচ্ছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে একাধিক ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কালের কণ্ঠকে বলেন, সোনামসজিদ স্থলবন্দর কাস্টমসের সহকারী কমিশনার বিল্লাল হোসেনের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের ঘুষের টাকা লেনদেন হয়ে থাকে। বেশির ভাগ ঘুষের টাকা লেনদেন হয় রাজশাহীতে। সেখানে বিল্লালের প্রতিনিধি হিসেবে কাস্টমসের কয়েকজন কর্মকর্তা আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের কাছ থেকে ঘুষের টাকা বুঝে নেন।

জানা গেছে, একাদশ সংসদ নির্বাচনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে ডা. শিমুল সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরই সোনামসজিদ স্থলবন্দরের ‘নিয়ন্ত্রণ’ নেন তাঁর ভাই সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সোহেল আহমেদ পলাশ। গত গত মার্চে পলাশ তাঁর অনুগতদের দিয়ে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের নতুন কমিটি গঠন করেন। তাঁর ছত্রচ্ছায়ায় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মেসবাহুল হক ও অর্থ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম শুল্ক ফাঁকি ও চাঁদাবাজির চক্রটিকে পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট শফিউর রহমান টানু ও হারুনুর রশিদ জানান, সংসদ নির্বাচনের আগে সংসদ সদস্য ডা. শিমুল কথা দিয়েছিলেন, বন্দরে কোনো অনিয়ম হবে না। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসেই সেই ধারণা পাল্টে গেছে। তাঁর ভাই পলাশ এখন বন্দরের সব অপকর্ম নিয়ন্ত্রণ করছেন।

সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন দাবি করেন, পলাশের নেতৃত্বে চক্রটি গত ছয় মাসে সরকারের ৩০০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। আর তাদের এই কার্যক্রমকে সহায়তা করছেন সোনামসজিদ স্থলবন্দর কাস্টমসের সহকারী কমিশনার বিল্লাল হোসেন।

বন্দরের আমদানিকারক আতাউর রহমান বলেন, ‘বন্দর পরিচালনার দায়িত্বে থাকা পানামা পোর্ট লিংক লিমিটেড, কাস্টমস ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের যোগসাজশে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি ও ওজনে ছাড় দেওয়ার ঘটনা অনেক বেড়েছে।’ এ ছাড়া প্রতিটি ট্রাক থেকে নামে-বেনামে তিন থেকে চার দফা চাঁদাবাজি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তবে সোহেল আহমেদ পলাশ অভিযোগ অস্বীকার করে কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁর ভাই সরকারি দলের সংসদ সদস্য হওয়ার কারণেই একটি রাজনৈতিক চক্র তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে এসব মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ করছে। তিনি বলেন, বর্তমানে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের কোনো পদে তিনি নেই। শুল্ক ফাঁকির ব্যবস্থা করে দিতে কাস্টমস কর্মকর্তাদের কাউকে তিনি সুপারিশ করেছেন, সেটাও কেউ প্রমাণ করতে পারবে না।

সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তাঁদের কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আমদানিকারকদের আস্থা ফিরে এসেছে। এতে গত কয়েক মাসে বন্দরের ব্যবসা বেড়েছে। আর এতেই কিছু ব্যক্তি মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে। তিনি চাঁদাবাজির অভিযোগও অস্বীকার করেন।

সোনামসজিদ স্থলবন্দর কাস্টমসের সহকারী কমিশনার বিল্লাল হোসেন বলেন, বন্দরের রাজস্ব আয়ের স্বার্থে পচনশীল কাঁচা পণ্য হিসেবে আমদানীকৃত ফলে ব্যবসায়ীদের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ওজন ছাড় দেওয়া হয়। এ জন্য আর্থিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়টি ঠিক নয়। এ ছাড়া মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির কোনো সুযোগ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা