kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অক্টোবর ২০১৯। ৩০ আশ্বিন ১৪২৬। ১৫ সফর ১৪৪১       

অবৈধ অস্ত্রের বাহক ধরা পড়ে আড়ালে থাকে গডফাদাররা

জামায়াত-শিবির বড় ক্রেতা!

রেজোয়ান বিশ্বাস   

৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রাজনৈতিক মাঠ দখল, প্রতিপক্ষকে হত্যা করাসহ সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতেই চোরাই পথে সীমান্ত পেরিয়ে দেশে ব্যাপকহারে আনা হচ্ছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। জানা গেছে, এসব অস্ত্রের বড় ক্রেতা জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি অভিযানে এসব অস্ত্রের বাহক ও মাঠপর্যায়ে শিবিরের অস্ত্র কারবারিদের গ্রেপ্তার করে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তবে অস্ত্রের বাহক গ্রেপ্তার হলেও গডফাদাররা বরাবরই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবৈধ অস্ত্রের গডফাদারদের গ্রেপ্তার করতে না পারলে দেশে আরো খুন-খারাবির ঘটনা ঘটবে। সৃষ্টি হবে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। এ ছাড়া সামনের কোরবানি ঈদের পশুর হাট নিয়ন্ত্রণ, ঈদ উৎসবকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতেও একাধিক অস্ত্র কারবারিচক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর তদন্তে জানা গেছে।

একটি বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদন মতে, রাজনৈতিক প্রভাবশালীচক্রের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের বেশির ভাগ এলাকায় অবৈধ অস্ত্রধারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, ফেনী, বরগুনা, কুষ্টিয়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে বর্তমানে অপরাধীচক্রের হাতে প্রচুর অস্ত্র রয়েছে। সেসব অস্ত্রের ওপর ভর করে একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে উঠেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অবৈধ অস্ত্র আমদানির মূল উদ্দেশ্য হত্যাসহ দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অভিযানে এরই মধ্যে অনেক অস্ত্র কারবারিকে গ্রেপ্তার করে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।’ গত ১৯ জুলাই সকাল শ্যামপুর-গেণ্ডারিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে চারটি বিদেশি পিস্তল, দুটি রিভলবার, সাতটি ম্যাগাজিন, ১২৮ রাউন্ড গুলিসহ সাখাওয়াত হোসেন, মিনহাজুল ইসলাম ও রাজু গাজীকে গ্রেপ্তার করে ওয়ারী থানা পুলিশ। তাদের কাছ থেকে পুলিশ জানতে পেরেছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী বা গডফাদাররা বিশেষ উদ্দেশ্যে অস্ত্রগুলো বিদেশ থেকে এনেছে। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য রাজনৈতিক কোনো নেতাকে হত্যা করে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করা। 

তদন্তে আরো উঠে এসেছে, কোরবানির পশুর হাট নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা রয়েছে সন্ত্রাসীদের। বিশেষ করে শ্যামপুর এলাকায় গরুর হাট নিয়ন্ত্রণকারী একজন সন্ত্রাসীর কাছে অস্ত্রগুলো সরবরাহ করার পরিকল্পনা ছিল চক্রের সদস্যদের। তবে অস্ত্রের মূল মালিক বা নেপথ্যের গডফাদারকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় আসল রহস্য এখন পর্যন্ত অজানাই রয়ে গেছে। এসব বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার ইব্রাহিম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উদ্ধার করা ছয়টি অস্ত্রই লোডেড (গুলিভর্তি) ছিল। অস্ত্র ও গুলি সরবরাহকারী তিনজনকে আটক করা গেলেও তাদের সহযোগী আরো চারজন ঘটনার সময় পালিয়ে যায়। গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন রিমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে, যা যাচাই চলছে। শিগগিরই অস্ত্রের মূল মালিক ও গডফাদারদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যাবে।’

এর আগে ৩০ জুন সন্ধ্যায় ওয়ারীর স্বামীবাগ এলাকায় রাজধানী সুপারমার্কেটের সামনে থেকে শীর্ষ জামায়াত নেতা কাজী গোলাম কিবরিয়া ও শিবির ক্যাডার হাসিবের ঘনিষ্ঠ সাইদুল ইসলাম মজুমদার ওরফে রুবেল ও কামাল হোসেন নামে দুজনকে ৩০ রাউন্ড গুলিসহ .২২ বোরের একটি একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার করা হয়। তবে রুবেল-কামালের গডফাদার কিবরিয়া ও হাসিব এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। এদের মধ্যে শিবির ক্যাডার হাসিব কুমিল্লার কোতোয়ালি থানার লিলু মিয়ার ছেলে। আর কাজী গোলাম কিবরিয়া কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের এক নম্বর (চলতি) ওয়ার্ড কাউন্সিলর। এ ছাড়া তাদের সহযোগী চট্টগ্রামের বেলাল উদ্দিন ও সাদেক আহমেদও শিবির ক্যাডার। বর্তমানে পলাতক তারা। গোয়েন্দা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, একসময় হাসিব ছাত্রশিবিরের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। পরে তিনি জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন।

এ ছাড়া অতি সম্প্রতি গাবতলী মাজার রোড এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫৬ রাউন্ড গুলি ও রিভলবারসহ মির্জা বাশার বেগ ও আবু জাফর ওরফে রেজাউল করিম ওরফে মুকুল নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করে তাদের কাছ থেকে একটি পয়েন্ট ৩২ বোরের রিভলবার ও ৫৬ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে গোয়েন্দা পুলিশ। তবে অস্ত্রের মূল মালিক গ্রেপ্তার হয়নি।

ডিএমপির সিটিটিসি ইউনিটের স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের এডিসি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, অবৈধ অস্ত্র ক্রেতার তালিকায় এগিয়ে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা।

২০১৬ সালের ১৮ জুন উত্তরার ১৬ নম্বর সেক্টরের দিয়াবাড়ী খাল থেকে ৯৫টি ৭.৬২ এমএম পিস্তল, দুটি ৯ এমএম পিস্তল, ৪৬২টি ম্যাগাজিন (২৬৩টি এসএমজির), ১০৬০ রাউন্ড গুলি, ১০টি বেয়নেট, ১৮০টি ক্লিনিং রড ও ১০৪টি স্প্রিংযুক্ত বাক্স উদ্ধার করা হয়। সাত দিন পর একই এলাকার অন্য একটি খাল থেকে ৩২টি এসএমজির ম্যাগাজিন, সাত প্যাকেট বিস্ফোরক জেল, ৪০টি পলিথিনের ব্যাগে থাকা বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম, আটটি ওয়াকিটকি, দুটি ট্রান্সমিটারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। তবে তিন বছরেও সেই অবৈধ অস্ত্র-গুলি ও সরঞ্জামের মালিকদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘যারা দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে অশান্তি সৃষ্টি করতে চায় তারাই এই অস্ত্র এনেছে। এটি কোনো সাধারণ অপরাধীর কাজ নয়।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা