kalerkantho

ঈদে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ছে জাহাজজটে

বহির্নোঙরে ভিড়তেই লাগছে ৯ দিন

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চট্টগ্রাম বন্দরে প্রায় ৯ দিনের জাহাজজটের কবলে পড়েছে কোরবানি ঈদকে ঘিরে আনা বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য। এসব পণ্যের মধ্যে আছে আদা-রসুন ও মসলাজাতীয় অন্যান্য পণ্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এসব পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছেছে অন্তত ৯ দিন আগে। কিন্তু জেটি খালি না থাকায় পণ্যবাহী জাহাজ বন্দরে ভিড়তে পারছে না। ফলে সরবরাহ সংকটে বাজারে এসব পণ্যের দাম বাড়ছে।

গত এক সপ্তাহে শুধু আদা-রসুনের দাম বেড়েছে কেজিতে ২৫ টাকা। এখন চট্টগ্রাম বন্দরেই রসুন বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ টাকা আর আদা ১২০ টাকায়। সরবরাহ সংকটের কারণে ঈদের আগে দাম আরো বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কোরবানি ঈদ উপলক্ষে চীন থেকে দুই কনটেইনার দারচিনি কিনে ২৮ মে সিঙ্গাপুর বন্দরে এনেছেন অসীম কুমার দাশ; উদ্দেশ্য কোরবানির বাজার ধরা। কিন্তু বাজার ধরা দূরে থাক, এখন কোরবানি ঈদের বন্ধে তাঁর আনা দারচিনি আটকে পড়ার শঙ্কা করছেন তিনি। অসীম এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার অসীম কুমার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চালানটি ১৪ জুন চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছার কথা ছিল, সেটি চার দফা পিছিয়ে এখন ২ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। দুই মাস সিঙ্গাপুর বন্দরে পড়ে থাকলে এই পণ্যের পরিবহন খরচ কোথায় গিয়ে ঠেকবে চিন্তা করেছেন? সবাই বলেন, পণ্যের দাম বাড়ে কেন? বন্দরে জটের কারণে এভাবেই দাম বাড়ে।’

কোরবানিকে টার্গেট করে ১২ কনটেইনার আদা আমদানি করেছেন খাতুনগঞ্জের ফরহাদ ট্রেডিংয়ের কর্ণধার নূর হোসেন। ৪ জুলাই চীনের বন্দর থেকে পণ্যের জাহাজীকরণ হয়েছে। ২৫ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছেছে জাহাজ ‘সি মাস্টার’। কিন্তু ৩ আগস্টের আগে জাহাজটি জেটিতে ভেড়ার সম্ভাবনা নেই।

হতাশ কণ্ঠে নূর হোসেন বললেন, ‘কিভাবে আমদানি ব্যবসা করব, বলেন? এমনিতেই আদা-রসুনের আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট রয়েছে। কিনতে হচ্ছে অনেক বেশি দামে। এর মধ্যে ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়িয়েছে; সরকার আরোপ করেছে অগ্রিম আয়কর। এখন নতুন বোঝা যোগ হয়েছে শতভাগ ইনস্যুরেন্স কাভারেজ। এত ঝামেলা পাড়ি দিয়ে দেশের স্বার্থে পণ্য কিনলাম, দেশে আনলাম, কারণ আমি এই ব্যবসা করে খাই। এনে দেখি জাহাজ ১৮ দিনের স্থলে এখন ২৮ দিন লাগছে!’

আক্ষেপ করে অভিজ্ঞ এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘বহির্নোঙরে বাড়তি ১০ দিন বসে থাকার আর্থিক ক্ষতি কে পুষিয়ে দেবে? কোরবানির বাজার তো ধরতেই পারব না। শেষমেশ দেখা যাবে ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে আমি নিঃশেষ হয়ে যাব।’ 

জানা গেছে, কোরবানি ঈদের চাহিদা ধরতে বিভিন্ন মসলার কনটেইনারভর্তি ২০টি জাহাজ এখন বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ। নূর হোসেনের আমদানি করা আদাভর্তি কনটেইনার রয়েছে ‘সি মাস্টার’ ও ‘মায়ের্কস বিনটুলু’ জাহাজে। ‘সি মাস্টার’ জাহাজের শিপিং লাইন হচ্ছে কন্টিনেন্টাল শিপিং। কন্টিনেন্টাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান ইকবাল চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বন্দর সাধ্যমতো চেষ্টা করছে জাহাজজট কমানোর, কিন্তু প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সামাল দিতে পারছে না। সামনে কোরবানি ঈদ, পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকলে জট আরো বাড়বে। এখন এটা আমাদের মেনে নেওয়া ছাড়া তো কোনো উপায় নেই। কারণ আমাদের যে পরিমাণ পণ্য ওঠানামা বেড়েছে সে অনুযায়ী তো বন্দর সম্প্রসারণ হয়নি। জেটি টার্মিনাল নির্মাণ ছাড়া তো সমাধান দেখছি না।’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এত কিছুর পরও আমরা বন্দর থেকে কোনো রপ্তানি কনটেইনার ফেলে জাহাজ ছাড়তে দিইনি।’ তিনি বলেন, ‘আবহাওয়া অনুকূল থাকলে ঈদের আগেই আমরা জাহাজজট পাঁচ দিনে নামিয়ে আনতে পারব, সে জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। এরই মধ্যে নতুন চারটি কিউ গ্যান্ট্রি ক্রেন বন্দরে পৌঁছেছে; আগামী ২০ দিনের মধ্যে সেগুলো পণ্য ওঠানামায় যোগ হবে।’

বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছে, কোরবানির ঈদ নয়, আগামী সেপ্টেম্বরের আগে এই জাহাজজটের সমাধান মিলবে না। কারণ এই জাহাজজটের মাঝে সাগরে ৩ নম্বর সতর্কতা সংকেত চলছে, সেটি ৫ নম্বরে গেলেই আবারও জাহাজ ভেড়া বন্ধ থাকবে; আর কোরবানি ঈদের আগে-পরে ছয় দিন মহাসড়কে পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকবে। এর মধ্যে যদি আবারও মুষলধারে বৃষ্টি হয় তাহলে সৃষ্টি হবে জলাবদ্ধতা ও যানজট। এ ছাড়া ঈদের ছুটির কারণে বন্দর ব্যবহারকারী সংস্থাগুলোর অফিস বন্ধ থাকায় এমনিতেই বন্দরের ভেতর কনটেইনারজটের সৃষ্টি হয়।

 

মন্তব্য