kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

রাজশাহীতে খাল খননে বিএমডিএর হরিলুট

সব মিলে ২৭ কিলোমিটার খাল খনন
সরকারের গচ্চা যাচ্ছে ১৭ কোটি টাকা

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

২ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রাজশাহীতে খাল খননে বিএমডিএর হরিলুট

রাজশাহীর কাটাখালী এলাকার এ খালটি কয়েক দিন আগে খনন করা হয়। বৃষ্টি হওয়ার পর পারে তোলা মাটি গড়িয়ে পড়ে খালটি আবারও ভরাট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজশাহীর পবার শাহপুর থেকে হরিয়ান বিল পর্যন্ত খালটি খনন করছে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। দরপত্রের নিয়ম অনুযায়ী খালটি সর্বনিম্ন তিন ফুট থেকে ৯ ফুট পর্যন্ত খনন করার কথা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কোথাও তিন ফুট পরিমাণও খনন করা হয়নি। ভরা বর্ষায় কোনোমতে দুই ধারের কিছু মাটি আর আবর্জনা সরিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছেন ঠিকাদাররা।

সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের সূত্রে এমন অভিযোগের পর সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ খালটির ৭০ শতাংশ ইতিমধ্যে জোড়াতালি দিয়ে ‘খনন’কাজ শেষ করা হয়েছে। আবার খালের পারেই ফেলে রাখা মাটি ও আবর্জনা নেমে গিয়ে আবারও বেশির ভাগ অংশই ভরাট হয়ে গেছে। আবার কাজ শেষ না হতেই দুজন ঠিকাদার সব বিল তুলে নিয়েছেন। শুধু পবার এই খাল নয়, এমন আরো তিনটি খাল খননের নামে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের দাবি, ভরা বর্ষার মধ্যে খাল খননের নামে সরকারের কোটি কোটি টাকা তছরুপে নেমেছে বিএমডিএ। একই সঙ্গে ঠিকাদারদেরও হয়েছে পোয়াবারো। এভাবে বিএমডিএ ও ঠিকাদার মিলে খাল খননের জন্য বরাদ্দ ১৭ কোটি টাকার বেশির ভাগই লুটপাট করেছে। আবার ঠিকমতো খাল খনন না হওয়ায় সরকারের পুরো টাকাই গচ্চা যাবে।  

সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ খালটি দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনায় ভর্তি হয়ে পদ্মার সঙ্গে পানি চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে খালটি খননের উদ্যোগ নেয় বিএমডিএ। এ জন্য দরপত্রের মাধ্যমে ১০টি ভাগে ১০ জন ঠিকাদার নির্বাচন করে বিএমডিএ। ২০ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে গত মে মাসে শুরু হয় খননকাজ। এ কাজের জন্য ইতিমধ্যে দুজন ঠিকাদারকে বিলও পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী স্থানভেদে ৩ থেকে ৯ ফুট গভীরতায় খালটি খননের কথা থাকলেও তার ধারেকাছেও যাননি ঠিকাদাররা। কোথাও এক ফুট আবার কোথাও দুই ফুট, কোথাও বা খনন না করে শুধু ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করেই কাজ শেষ করা হয়েছে। এভাবে খালটির প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজটুকুও এভাবে জোড়াতালি দিয়ে কয়েক দিনের মধ্যে শেষ করার তোড়জোড় চলছে।

পবার হরিয়ানে খালটির বেশ কিছু অংশে দেখা গেছে, খালটি কোনো মতে কেটে মাটি ও ময়লা-আর্বজনা তুলে পারেই ফেলে রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে বর্ষার পানিতে সেগুলো আবারও খালে গিয়ে পড়ে কোথাও কোথাও ইতিমধ্যে ভরাট হয়ে গেছে। আবার কাটাখালী বাজারের কাছে কোনো মতে আবর্জনা তুলেই খাল খননের কাজ শেষ করা হয়েছে। এভাবে গোটা খালটিতেই খননের নামে যেন তামাশা করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আকরাম হোসেন বলেন, ‘ভরা বর্ষায় খাল খননের নামে হরিলুট করা হয়েছে। কোথাও কোথাও সামান্যতম খননও করা হয়নি। সব মিলে এই খাল খননের নামে শুধু সরকারি অর্থের অপচয়ই হয়েছে।’

হরিয়ানের আরেক বাসিন্দা আজমল হোসেন বলেন, ‘খাল খননের নামে উল্টো সাধারণ মানুষের ক্ষতিই করা হয়েছে। নিচে গভীর না করে খালের পারের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিও কেটে ফেলা হয়েছে। ফলে কারো কারো বাড়িঘর হুমকির মুখে পড়েছে। অথচ নিচের দিকে কোথাও তিন ফুট গভীর করেও কাটা হয়নি। এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ঠিকাদারদের এমন কর্মকাণ্ড নিয়ে বিএমডিএর কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি। কারণ তাঁরাও এই হরিলুটের অংশীদার।

অন্যদিকে চারঘাটের মেরামতপুর-কাঁকড়ামারি আড়াই কিলোমিটার খাল, বাঘার ব্যাঙ্গাড়ী-চাঁদপুর ৩৮৫ মিটার খাল ও বাঘার নওটিকা-মোর্শেদপুর ১১ কিলোমিটার খাল খননেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অনিয়মের অভিযোগ এনে নওটিকা-মোর্শেদপুর খালটির প্রায় আড়াই কিলোমিটার অংশের কাজ বন্ধই করে দিয়েছে এলাকাবাসী।

তবে খাল খননে কোনো অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেছেন এই প্রকল্পের পরিচালক নির্বাহী প্রকৌশলী নাজিরুল ইসলাম। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমি বেশির ভাগ এলাকাই পরিদর্শন করেছি। কোথাও কোনো অনিয়ম হয়নি। তবে কোনো কোনো জায়গায় মাটি কাটা যায়নি এটা ঠিক। সে কারণে প্রকল্পের কাঠামো আমরা পরিবর্তন করেছি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা