kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১       

চট্টগ্রামেও হতে যাচ্ছিল আরেক ‘রেনু কাহিনি’

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৪ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



চট্টগ্রামেও হতে যাচ্ছিল আরেক ‘রেনু কাহিনি’

‘ছেলেধরা’ গুজব রটিয়ে রাজধানীর বাড্ডার রেনুর মতো চট্টগ্রামেও আরেক নৃশংসতার আয়োজন চলছিল। তবে এবার কপালের জোরে বেঁচে গেলেন সালমা খাতুন। কিছু সাহসী যুবকের হস্তক্ষেপে এ যাত্রায় রেনুর মতো প্রাণ দিতে হয়নি সালমাকে। ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে ছেলেধরা বলে এক টেকনিশিয়ানকে গণপিটুনির নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে এক প্রধান শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কুষ্টিয়ায় ২৪ ঘণ্টায় গণপিটুনির রোষে পড়েছে ছয়জন। এ ছাড়া মাদারীপুরের শিবচর, টাঙ্গাইলের কালিহাতী ও সিরাজগঞ্জে পিটুনিতে আহত হয়েছে আরো তিনজন। এ ছাড়া ছেলেধরা সন্দেহে পটুয়াখালীর কলাপাড়া, ঢাকার নবাবগঞ্জ, বগুড়ার নন্দীগ্রাম ও কুড়িগ্রামের উ?লিপু?র থেকে চারজনকে আটক করেছে পুলিশ। ঢাকার কেরানীগঞ্জে ছেলেধরার গুজবে দুই যুবককে পিটিয়ে হত্যা মামলায় ছয় আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পঞ্চগড়ে গণপিটুনির হাত থেকে তিনজনকে রক্ষা করেছে পুলিশ। এদিকে ছেলেধরা গুজব আতঙ্কে রাজশাহীর দুর্গাপুর ও খাগড়াছড়ির দীঘিনালার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অনেক কমে গেছে। জনমনে আতঙ্ক কাটাতে স্থানীয় প্রশাসন নিয়েছে নানা উদ্যোগ। এ ব্যাপারে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

চট্টগ্রাম : পোশাক কারখানার কাজ শেষে বোনসহ সন্তানকে নিয়ে কাঁচাবাজার করতে গিয়েছিলেন সালমা খাতুন। সেখানে মানুষের ভিড়ে মায়ের হাত থেকে ফসকে যায় তিন বছরের শিশু তাজিন। শুরু হয় মা-খালার পাগলের মতো খোঁজাখুঁজি। সন্তানের খোঁজে যখন পাগলপ্রায় ঠিক তখন বাজারেরই এক কোনায় সন্তানকে পেয়ে শুরু হয় মা-ছেলের কান্নাকাটি। এ ঘটনাকেই ছেলেধরা সন্দেহ করে সালমা খাতুনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বাজারের একদল বখাটে। শুরু হয় গণপিটুনি। তবে কিছু সাহসী যুবকের হস্তক্ষেপে এ যাত্রায় ঢাকার বাড্ডার রেনুর মতো জীবন হারাতে হয়নি সালমাকে।

গত শনিবার রাতে চট্টগ্রাম ইপিজেডের ২ নম্বর পকেট গেটসংলগ্ন কলশী দীঘিরপাড় এলাকায় ঘটনাটি ঘটলেও গতকাল মঙ্গলবার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। গণপিটুনির হাত থেকে বাঁচতে ঘটনাস্থলের পাশে আশ্রয় নেওয়া একটি ওষুধের দোকানের সিসি ক্যামেরা ফুটেজ গতকাল মঙ্গলবার সকালে ফেসবুকে আপলোড করা হলে কিছুক্ষণের মধ্যে সেটা ভাইরাল হয়। এক ফেসবুক পোস্টে ওই দোকানের মালিক মোহাম্মদ ইব্রাহিম জানান, ছেলেধরা সন্দেহে এক পথচারী ওই নারীকে মারধর শুরু করে। এরপর আশপাশের আরো মানুষ তাঁর ওপরে হামলে পড়ে। একপর্যায়ে কয়েকজন যুবকের সহায়তায় জে এফ মেডিক্যাল হল নামের পাশের ফার্মেসি দোকানে ঢুকে পড়েন রক্তাক্ত ওই নারী। এ সময় একটি শিশুকে আঁকড়ে ধরে ছিলেন তিনি। তার কপালের এক পাশ থেকে রক্ত ঝরছিল।

ফার্মেসির সিসিটিভি ফুটেজে পুরো ঘটনাটি উঠে আসে। ওষুধের দোকানটির মালিক ইব্রাহিম বলেন, ‘মারধরের একপর্যায়ে ওই নারী আত্মরক্ষার্থে আমার দোকানে ঢুকে পড়েন। জনতা সেখানেও ঢুকে মারধরের চেষ্টা চালায়। একপর্যায়ে আমরা দোকানের শাটার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই। আমরা পাশের দোকানের মালিক-কর্মচারীর সহায়তায় ওই নারীকে পুলিশের হাতে তুলে দিই। পরে জানতে পারি ওই নারীর সঙ্গে থাকা ছেলেটি তাঁরই সন্তান।’

এ ব্যাপারে বন্দর থানার ওসি সুকান্ত ভট্টাচার্য বলেন, সালমা চট্টগ্রাম ইপিজেডের একটি গার্মেন্টে সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করেন।

ঠাকুরগাঁও : পীরগঞ্জে ছেলেধরা সন্দেহে ইন্টারনেট সংযোগের কাজে নিয়োজিত টেকনিশিয়ান ইউনুস আলীকে গণপিটুনির নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে কামাল হোসেন নামের এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কামাল হোসেন পীরগঞ্জের চাঁদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। এ ঘটনায় অচেনা আরো ১০-১২ জনকে আসামি করে থানায় মামলা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে পীরগঞ্জের ভোমরাদহ এলাকায় ইন্টারনেটের ফাইবার টানতে গেলে গণপিটুনির শিকার হন টেনকিশয়ান ইউনুস আলী। তিনি ইনফো সরকার ফেস-৩ প্রকল্পের আওতায় অপটিক্যাল ফাইবার টানার কাজে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে কর্মরত।

পীরগঞ্জ থানার ওসি বজলুর রহমান জানান, এলাকায় প্রকল্পের কাজে এসেছিলেন টেকনিশিয়ান ইউনুস। ছেলেধরা সন্দেহে তাঁকে ডেকে নিয়ে ও গুজব রটিয়ে গণপিটুনির নির্দেশ দেন প্রধান শিক্ষক কামাল। তাঁর নেতৃত্বে দলবদ্ধ হয়ে আরো বেশ কয়েকজন ইউনুসকে পিটুনি দিয়ে তাঁর পকেটের সাড়ে তিন হাজার টাকা ও মোবাইল ফোনসেট ছিনিয়ে নেয়।

কুষ্টিয়া : ছেলেধরা সন্দেহে গত ২৪ ঘণ্টায় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজনই মানসিক ভারসাম্যহীন। গণপিটুনি দেওয়ার সময় পুলিশ সবাইকে উদ্ধার করেছে। এসব ঘটনায় ৩৬ জনকে আটক করেছে পুলিশ। কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এস এম তানভীর আরাফাত বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি দেওয়ার সময় পুলিশ ছয়জনকে উদ্ধার করেছে। গুজব রটিয়ে গণপিটুনি বন্ধ করতে আমরা বিভিন্নভাবে প্রচারনা চালাচ্ছি। পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের টহল বাড়ানো হয়েছে।’

শিবচর (মাদারীপুর) : ছেলেধরা সন্দেহে মাদারীপুরের শিবচরে আবু ব্যাপারী (৫০) নামের মানসিক ভারসাম্যহীন এক ব্যক্তিকে পিটুনি দিয়ে আহত করেছে এলাকাবাসী। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পরিবারের লোকজনের কাছে হস্তান্তর করেছে।

কলাপাড়া (পটুয়াখালী) : কলাপাড়ার মিঠাগঞ্জ ইউনিয়নের জয়বাংলা বাজারে ছেলেধরা সন্দেহে অচেনা এক নারীকে (৩৫) পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে গ্রামবাসী। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে জয়বাংলা বাজারে ঘুরতে দেখে তাঁকে আটক করে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও গ্রামবাসী। পরে তাঁকে পুলিশের হাতে দেওয়া হয়।

পঞ্চগড় : পঞ্চগড়ে ছেলেধরা সন্দেহে আটক তিনজনকে গণপিটুনি থেকে রক্ষা করেছে পুলিশ। পরে তাদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসা হয়। পুলিশ জানায়, আটক তিনজনের মধ্যে একজনের নাম-পরিচয় জানা গেলেও অন্যরা অসংলগ্ন কথা বলছে। গত সোমবার সন্ধ্যার পর শহরের পূর্ব জালাসী গরুহাটি এলাকা থেকে এক যুবককে উদ্ধার করা হয়। রাতে ডোকরোপাড়া এলাকায় আরেকজনকে ছেলেধরা সন্দেহে স্থানীয় জনতা আটক করে পিটুনি শুরু করে। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের গণপিটুনি থেকে রক্ষা করে। এদিকে একই দিন বিকেলে দেবীগঞ্জে সাজেদুল ইসলাম নামের মানসিক ভারসাম্যহীন এক যুবককে স্থানীয়রা ছেলেধরা সন্দেহে পিটুনি দিতে উদ্যত দেয়। পরে দেবীগঞ্জ থানার পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।

সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জে ছেলেধরা সন্দেহে আলম শেখ (৩৫) নামের এক যুবককে পিটুনি দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে এলাকাবাসী। গতকাল মঙ্গলবার সকালে সদর উপজেলার পাইকপাড়া দারুল কোরআন কওমি মাদরাসায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চারজনকে আটক করেছে। আটক আলম হোসেন গয়লা বটতলা এলাকায় আব্দুর রহিমের ছেলে। তাঁকে বর্তমানে সিরাজগঞ্জ বঙ্গমাতা শেখ ফজিলুতুন্নেছা মুজিব হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

টাঙ্গাইল : কালিহাতীতে গত রবিবার ছেলেধরা সন্দেহে ভ্যানচালক মিনু মিয়াকে গণপিটুনি দেওয়ার ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত সোমবার রাতে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন স্থান থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলো মাইনুল হক হিটু, প্রভাত চন্দ্র মালো, শিশির আহম্মেদ খান, ওমর মিয়া, মিজানুর রহমান তালুকদার ও আলামিন ইসলাম। গতকাল মঙ্গলবার তাদের টাঙ্গাইল আদালতে পাঠানো হয়েছে।

নন্দীগ্রাম (বগুড়া) : ছেলেধরা সন্দেহে বগুড়ার নন্দীগ্রামে জনি প্রামাণিক (২৬) নামের এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার রণবাঘা বাজার থেকে স্থানীয় লোকজন তাঁকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। আটককৃত জনি কাহালু উপজেলার বাতোই গ্রামের নাসির উদ্দিনের ছেলে।

দোহার-নবাবগঞ্জ (ঢাকা) : নবাবগঞ্জে ছেলেধরা সন্দেহে সাথী আক্তার (২৫) নামের এক নারীকে আটকের পর পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে স্থানীয়রা। গতকাল মঙ্গলবার সকালে উপজেলার কলাকোপা ইউনিয়নের বাগমারা বাজার থেকে ওই নারীকে আটক করে এলাকাবাসী।

উলিপুর (কুড়িগ্রাম) : উলিপুরে ছেলেধরা সন্দেহে এক ব্যক্তিকে পিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে এলাকাবাসী। ঘটনাটি ঘটেছে গত সোমবার রা?তে উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের বুড়াবুড়ি বাজারে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর নাম-ঠিকানা জানতে চাইলে তিনি তাঁর নাম বাবু এবং বাড়ি বাস টার্মিনাল ছাড়া আর কিছুই বলতে পারেন না। পুলিশের ধারণা, ওই ব্যক্তি মানসিক ভারসাম্যহীন।

কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) : ছেলেধরা গুজবে কেরানীগঞ্জে অচেনা দুই যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে কমপক্ষে ৫০০ জনকে আসামি করে আলাদা দুটি মামলা করেছে। গতকাল মঙ্গলবার পুলিশ অভিযান চালিয়ে এ দুই মামলার ছয় আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে।

রাজশাহী : মাথাকাটা ও ছেলেধরা গুজব আতঙ্কে রাজশাহীর দুর্গাপুরের কিন্ডারগার্টেন ও প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কমে গেছে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি। উপজেলার বেশ কয়েকটি স্কুলে এক সপ্তাহ ধরে উপস্থিতির সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। কোনো কোনো স্কুলে শিক্ষার্থী উপস্থিতি আরো কম। উপজেলার বেশ কিছু প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। তবে স্কুল ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা অভিভাবকদের গুজবে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিটন সরকার বলেন, ‘দু-এক দিনের মধ্যেই এলাকাবাসী এ গুজব থেকে বেরিয়ে আসবে।’

দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি) : ছেলেধরা আতঙ্ক বিরাজ করছে দীঘিনালায়। গ্রামের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর উপস্থিতির হার অনেক কমে গেছে। আবার বিদ্যালয়ে আসা শিক্ষার্থীদের অনেকের সঙ্গে অভিভাবকরা সঙ্গ দিচ্ছেন। তবে এ আতঙ্ক কাটাতে নানাভাবে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে পুলিশসহ স্থানীয় প্রশাসন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা