kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

লালবাগ জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন

২৫ কোটি টাকা নিয়ে উধাও পরিচালক

একই এলাকায় তিন বছর আগে আরেক চক্র হাতিয়ে নেয় সাড়ে সাত কোটি টাকা

জহিরুল ইসলাম   

১৪ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



২৫ কোটি টাকা নিয়ে উধাও পরিচালক

দোকানে দোকানে পানি টেনে দিনে উপার্জন দেড় শ থেকে দুই শ টাকা। তা থেকে ২০ টাকা করে জমা করেছিলেন বেনু বেগম। এক বছরে তাঁর জমা হয় সাত হাজার টাকা। লালবাগ জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন সমিতিতে জমানো অতি কষ্টের সেই টাকা হাতে পাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। কারণ বেনু বেগমের মতো হাজারো শ্রমজীবীর তিলে তিলে জমানো টাকা নিয়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন সমিতির নির্বাহী পরিচালক মাঈনউদ্দিন কাদের রাজু ওরফে এম কে রাজু।

লালবাগ শহীদ নগর ৩ নম্বর গলির ২১৮ নম্বর বাড়ির নিচতলায় লালবাগ জনকল্যাণ ফাউন্ডেশনের অফিস। তবে অফিস থাকলেও বর্তমানে সেখানে কোনো কার্যক্রম নেই। স্থানীয় লোকজন বলছে, সমিতির মূল পরিচালক এম কে রাজু কোথায় আছে কেউ জানে না। তিন বছর আগে একই এলাকায় ‘জাগরণ শ্রমজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে আরেক ফটকা প্রতিষ্ঠান হাতিয়ে নেয় সাধারণ মানুষের সাড়ে সাত কোটি টাকা।

জানা গেছে, লালবাগ জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন সমিতিতে তিনভাবে লেনদেনের কাজ চলত। এর মধ্যে এককালীন হিসাবে লভ্যাংশ দেওয়ার কথা প্রতি মাসে, দৈনিক হিসেবে জমা অর্থ লাভসহ বছর শেষে ফেরত, মাসিক ডিপিএস আকারে জমানো টাকা পাঁচ বছর থেকে সাড়ে সাত বছর মেয়াদে দ্বিগুণ ফেরত প্রদান। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জমানো টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য সমিতির অফিসে ভিড় করছে অনেক সদস্য। তবে পাওনাদারদের অভিযোগ শোনার মতো কোনো ব্যক্তি ওই অফিসে নেই। সেখানে কথা হলো আরিফ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে, যিনি রাজুর মামাতো ভাই। তিনিও বলেন যে রাজুর খোঁজ জানেন না। ঠিকানা দিতেও অপারগতা জানান তিনি।

জানা গেল, সালমা খাতুনের স্বামী মারা গেছেন ছয় বছর আগে। তিনি গত তিন বছর ধরে অনেক কষ্ট করে সপ্তাহে ৫০০ টাকা করে জমা করেন সমিতিতে। উদ্দেশ্য একমাত্র মেয়ে বড় হলে টাকা লাগবে। এখন লাভ তো দূরের কথা, জমানো টাকাটা ফেরত পাওয়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় তাঁর মাথায় হাত।

টাকার জন্য ভিড় জমানো অনেকের মধ্যে সাজেদা আক্তারের ১৬ হাজার, হোসেন মিয়ার ২৫ হাজার, মায়া আক্তারের ছয় লাখ, রেহানা আক্তারের দুই লাখ, হাওয়া বেগমের ২০ হাজার, শিখা আক্তারের ২০ হাজার, বিপুল মিয়ার ৫২ হাজার, আলতাফ হোসেনের তিন লাখ, জোহরা বেগমের পাঁচ লাখ টাকাসহ সমিতির প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার সদস্যের প্রায় ২৫ কোটি টাকা সমিতিতে জমা।

স্বামী, সন্তান ও নিজের নামে ১২টি পাস বইয়ে প্রায় আট লাখ টাকা জমা ছিল শহীদ নগর ৫ নম্বর গলির ময়না বেগমের। ময়না বলেন, ‘এমন হবে জানতাম না। আমার তো আট লাখ, অনেকের আরো অনেক বেশি টাকা রয়েছে এই সমিতিতে।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোসাদ্দেক হোসেন জাহিদ বলেন, ‘বেশ কয়েকবার আমরা বসেছি। সে (রাজু) সময় নিয়ে এখন লাপাত্তা। এলাকায় তো আসেই না, তার মোবাইল ফোনও বন্ধ। হাজার হাজার গরিব মানুষের কষ্টের টাকা উদ্ধার করা আমাদের সবার দায়িত্ব। এমপি সাহেবও (ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজি সেলিম) অনেক চেষ্টা করছেন।’

জানা যায়, তিন বছর আগে শহীদ নগর দুই নম্বর গলিতে জাগরণ শ্রমজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড নামে আরেকটি সমিতির অফিস ছিল। আল আমিন ইসলাম রুবেল মিয়াসহ আরো কয়েকজন মিলে এ সমিতি চালাতেন। তাঁরা সদস্যদের জমানো প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা নিয়ে অফিস বন্ধ করে দেন। দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো ফল না পেয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ওই টাকা পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, লালবাগ থানা, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং সর্বশেষ গত ৩ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী পারভীন বেগম।

লালবাগ থানার ওসি কে এম আশরাফ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি এই থানায় নতুন যোগদান করেছি। রাজুর বিরুদ্ধে আগের মামলা থাকতে পারে।’

মন্তব্য