kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

কোমর ভাঙে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কে

১৪০ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়ম শম্বুকগতি

পার্থ সারথি দাস ও শামস শামীম, সুনামগঞ্জ থেকে ফিরে   

১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



১৪০ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়ম শম্বুকগতি

পাথরের কণা ছড়িয়ে পড়েছে। পিচ উঠে গর্ত বড় হয়ে হাঁ করে আছে।  গাড়ির চাকা পড়ে যায় গর্তে। মাত্র ১৮ ফুট চওড়া মহাসড়কে একটি গাড়ি আটকে গেলে আরো সংকীর্ণ হয়ে পড়া মহাসড়কে অন্য গাড়িগুলো চলে ধীরে। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য জেলা থেকে হাওর-জেলা সুনামগঞ্জ যেতে সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক ধরে যেতে যেতে যাত্রী ও চালকদের এখন কোমর ভাঙে গর্তে গর্তে।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর মহাসড়কের ৬৫ কিলোমিটার ১৮ থেকে ২৪ ফুট চওড়াসহ মজবুত করতে ১৪০ কোটি ৫৪ লাখ টাকার প্রকল্প নিয়েছে। ২০১৬ সালে প্রকল্প নেওয়ার পর এক বছর আইনি জটিলতায় কাজ শুরু হয়নি। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে কার্যাদেশ দেওয়ার পর তিন বছরে ৪০ শতাংশ কাজও হয়নি। আগামী বছরের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে। স্থানীয়রা শুধু কাজের শম্বুকগতি, রাস্তায় কর্মসূচি পালন করে অনিয়মের অভিযোগও করেছে জেলা প্রশাসনে। অভিযোগ করা হয়েছে—মহাসড়কের নিচ ও পাশ থেকে ২০ কোটি টাকার উন্নত বোল্ডার পাথর সরিয়ে নিয়েছেন ঠিকাদাররা। তবে ঠিকাদার ও সওজ কর্মকর্তারা বলছেন, এ অভিযোগ ঠিক নয়।

সওজ ও ঠিকাদাররা জানান, সিলেট-গোবিন্দগঞ্জ, গোবিন্দগঞ্জ-ডাবরঘাট ও ডাবরঘাট-সুনামগঞ্জ—এই তিন অংশে ভাগ করে মহাসড়ক উন্নয়নের কাজ চলছে। কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এম বিল্ডার্স অ্যান্ড এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স জন্মভূমি নির্মাতা অ্যান্ড ওয়াহিদুজ্জামান চৌধুরী জনজেবি কনস্ট্রাকশন।

প্রকল্প এলাকায় দুই দিকে তিন ফুট করে গভীর ও প্রস্থে উন্নত পাথর ও বালু দিয়ে ভরাটের কথা ছিল। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো তার বদলে দুই থেকে দেড় ফুট গভীরে গিয়ে বালু ও পাথর দিয়ে ভরাট করেছে। ষাটের দশকে এই মহাসড়কে দুই দিকসহ সড়কের নিচের পুরো অংশে বড় বড় বোল্ডার বসানো হয়েছিল। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছে, এসব পাথর গত ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে ট্রাক ভরে সরিয়ে নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। সরিয়ে ফেলা বোল্ডারের দাম কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এই লুটপাটের অভিযোগ করা হলেও সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম নীরব আছেন।

সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা ইউপি সদস্য মহিনুর আলম বলেন, ‘দুই পাশের বর্ধিত অংশের গভীরতা তিন ফুট করা হয়নি। প্রস্থেও বিভিন্ন স্থানে কম। প্রস্থ ও গভীরতা কম থাকায় কার্যাদেশের চেয়ে উপকরণ কম লেগেছে। এ ছাড়া আমাদের চোখের সামনে পাকিস্তান আমলে দেওয়া দুই দিকের উন্নত বোল্ডার পাথরগুলো ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

সুনামগঞ্জ যাত্রী অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক মুুক্তিযোদ্ধা মালেক হুসেন পীর বলেন, মহাসড়কের কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রকাশ্যে হচ্ছে। এ বিষয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করা হলেও জবাব দিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ।

সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী অমিয় চক্রবর্তী বলেন, দুই দিকের বোল্ডার পাথরের গড়পড়তা মূল্য ধরে ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে। দুই দিকের মাটি সড়কের জায়গা থেকে কেটে তোলা হলেও বিল থেকে সেটা কেটে রাখা হবে। পাথরের মূল্য প্রায় ৮০ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রাক্কলন অনুসারে, সড়ক প্রশস্থকরণ, সার্ফেসিং, রিজিড পেভমেন্ট ও ইন্টারসেকশনের কাজ চলছে। তবে কত ভাগ কাজ হয়েছে তা বলতে পারেননি তিনি। মহাসড়কের দুই দিকের দামি বোল্ডার পাথর কোন প্রক্রিয়ায় সরানো হলো, এর মূল্য কিভাবে নির্ধারণ করা হলো সেটা জানতে তাঁর কাছে লিখিত আবেদন দেওয়ার পরও তিনি তথ্য দিতে অস্বীকার করেন।

সওজ সিলেট সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনোয়ারুল আমীন বলেন, প্রায় চার বছর আগে পরিকল্পনা কমিশনের প্রতিনিধিদল সরেজমিনে ঘুরে মহাসড়ক চওড়া করার সুপারিশ করে। তার পরিপ্রেক্ষিতেই সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ১৪০ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয় হবে তাতে। ২০১৬ সালে প্রকল্প পাস হলেও এক বছর কাজ শুরু করা যায়নি আইনি জটিলতায়। এখন মহাসড়কের যে অবস্থা তা রক্ষণাবেক্ষণের পুরো দায়িত্ব ঠিকাদারদের।

ওয়াহিদুজ্জামান চৌধুরী জনজেবি কনস্ট্রাকশনের পরিচালক ওয়াহিদুজ্জামান চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা বাজেট নেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর। বর্ষার কারণে কাজ কম হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ হয়ে যাবে প্রকল্পের। বোল্ডার সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তিনি স্বীকার করেননি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা