kalerkantho

শনিবার । ২০ জুলাই ২০১৯। ৫ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৬ জিলকদ ১৪৪০

সংস্কারকাজে অনিয়মকেই দুষছে স্থানীয়রা

চারঘাটে ৫ মাসে দুইবার ট্রেন লাইনচ্যুত

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সংস্কারকাজে অনিয়মকেই দুষছে স্থানীয়রা

পাঁচ মাসের ব্যবধানে একই স্থানে দুইবার লাইনচ্যুত হলো ট্রেন। চারঘাটের হলিদাগাছিতে ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ায় যেমন ভোগান্তিতে পড়েছে যাত্রীরা, তেমনি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে। সব শেষ গত বুধবার বিকেলের ওই ঘটনার পরে গতকাল বিকেল পর্যন্ত কোনো ট্রেন ছেড়ে যেতে পারেনি দেশের অন্যতম বৃহত্তম স্টেশন রাজশাহী থেকে। রাজশাহীর সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বারবার ট্রেন লাইনচ্যুতির পেছনে রেলওয়ের কর্মকর্তাদের গাফিলতি ও সংস্কারের নামে অনিয়মকে দুষছে অনেকেই।

এদিকে এ ঘটনার পরে আব্দুর রশিদ নামে একজন সহকারী প্রকৌশলীকে তাৎক্ষণিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ওই প্রকৌশলীকে ঠিকই দুর্ঘটনাস্থলে ট্রেন উদ্ধারকাজে অংশ নিতে দেখা যায়। এ ছাড়া ট্রেন দুর্ঘটনায় বিভাগীয় ট্রান্সপোর্ট কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, পাবনার ঈশ্বরদী থেকে রাজশাহী স্টেশনের দিকে ছেড়ে যায় তেলবাহী একটি ট্রেন। ট্রেনটি সারদাহ স্টেশন পার হয়ে প্রায় দেড় কিলোমটার দূরে হলিদাগাছি রেলগেটের পশ্চিমে হঠাৎ লাইনচ্যুত হয়। এ সময় ট্রেনের ৯টি বগি লাইন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী রেলওয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ট্রেনটি যেখানে লাইনচ্যুত হয়, সেখানকার লাইনের অধিকাংশ ক্লিপ এবং কোথাও কোথাও নাট-বল্টু ছিল না। বহু পুরনো রেললাইনের কারণে ট্রেনের চাপে লাইনও ভেঙে যায়। এতেই ট্রেনটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়। একই কারণে চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি এই স্থানেই ঈশ্বরদী থেকে ছেড়ে আসা মালবাহী একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়।

এদিকে রাজশাহী রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আব্দুলপুর থেকে রাজশাহী স্টেশন পর্যন্ত রেললাইনটি গত তিন-চার বছরে কয়েক দফা সংস্কার করা হয়। আর এতে ব্যয় হয়েছে অন্তত ৫০ কোটি টাকা। রেললাইনের স্লিপার, ক্লিপ ও নাট-বল্টুও পরিবর্তনের নামে এমন খরচের পরও ঝুঁকিপূর্ণই রয়ে গেছে এ লাইনটি।

রেলওয়ের একাধিক সূত্রমতে, প্রতি বছর রেললাইন সংস্কারের নামে বিপুল পরিমাণ টাকা লুটপাট করা হয় পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে। একটি সিন্ডিকেট তেমন কোনো সংস্কার না করেই বছরে বছরে এলটিএম পদ্ধতিতে গোপনে টেন্ডারে কাজ করাচ্ছে।

সম্প্রতি পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধার সরাঞ্জাম কর্মকর্তা বেলাল উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরেও লিখিত অভিযোগ করেছেন পশ্চিমাঞ্চল রেলের ঠিকাদাররা। কেনাকাটার নামে নানা অনিয়ম করে তিনি গত এক বছরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অন্তত ২০ কোটি টাকার কাজ করিয়েছেন। এর বাইরে অতিরিক্ত ১৫ কোটি টাকা চেয়ে তিনি চিঠি দিয়েছেন রেল বিভাগকে। তিনি কোন খাতে অনিয়মের মাধ্যমে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে অর্থ লোপাট করেছেন, তার কিছু অংশ তুলে ধরা হয় ওই অভিযোগে। এর একটি কপি কালের কণ্ঠ’র কাছেও এসেছে।

বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ আরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধেও রেলের উন্নয়নের নামে ব্যাপক লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারে প্রতিবেদন দিয়েছে কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ট্র্যাক) আবু জাফর মিয়া জানান, ২০১৭-১৮ সালে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের সব কটি রুটের ট্রেনের গতি বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে পাটুরিয়া-ফরিদপুর লাইনে ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার থেকে বৃদ্ধি করে ১০০ কিলোমিটার, লালমনিরহাট-বুড়িমারী লাইনে ঘণ্টায় ৭৫ কিলোমিটার থেকে ৮০ কিলোমিটার, পার্বতীপুর-জয়দেবপুর সেকশনের অন্তর্ভুক্ত পার্বতীপুর-বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম লাইনে ঘণ্টায় ৯৫ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ১০৫ কিলোমিটার গতি করা হয়েছে। চাটমোহর ভাঙ্গুড়া সেকশনে ৫০ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৮০ কিলোমিটার, বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব-জয়দেবপুর সেকশনের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৮৫ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ১০০ কিলোমিটারে উন্নীত করা হয়েছে। রেলওয়ে সূত্র মতে, পশ্চিমাঞ্চলের মোট এক হাজার ৫৬৭ কিলোমিটার রেললাইন রয়েছে। এই রেললাইনগুলো, রেললাইনের সেতু, ব্রিজ ও কালভার্ট সংস্কারের নামে ২০১৬-১৮ সালের তিন বছরেই অন্তত তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। বছর দেড়েক না যেতেই আবার পরিস্থিতি বেগতিক হয়ে পড়ে কয়েকটি লাইনের। ফলে দুটি রুটে ট্রেনের গতিসীমা কমাতেও বাধ্য হয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, অনিয়ম করে সংস্কারের কারণেই পশ্চিমাঞ্চল এখনো প্রায় ২৭৫ কিলোমিটার লাইন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে আছে। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জের জামতৈল থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর পর্যন্ত ২২৫ কিলোমিটার লাইন এবং তিস্তা-কুড়িগ্রামের রমনা পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার লাইন বেশি খারাপ হয়ে আছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে এই অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আফজাল হোসেন বলেন, ‘কিছু রেললাইন খারাপ আছে। এগুলো আবার সংস্কারের জন্য এরই মধ্যে টেন্ডার আহ্বান করেছি। দ্রুতই জামতৈল-পার্বতীপুরের কাজ শুরু হবে। আর তিস্তা-রমনা রেললাইন সংস্কারের জন্যও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’

এই কর্মকর্তা আরো বলেন, এই অঞ্চলে পাঁচটি সেতু ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে আছে। এগুলোর মধ্যে তিনটির সংস্কারের কাজ চলছে। আরো দুটির কাজ দ্রুতই শুরু হবে। তাহলে সেতুগুলো নিয়ে আর শঙ্কা থাকবে না।’

তবে কেনাকাটার নামে কোনো অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেন বেলাল উদ্দিন সরকার। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট বিভাগের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে কেনাকাটা করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। অন্যদিকে সেতু প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম দাবি করেন, তিনি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন। রেলওয়েতে যা কিছু হয় তা সঠিক নিয়ম মেনেই হয়।

মন্তব্য