kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

‘আবু-বাঙালি’ জঙ্গি প্রচারণার নাম

এস এম আজাদ   

১৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘আবু-বাঙালি’ জঙ্গি প্রচারণার নাম

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) প্রচারমাধ্যমে কথিত বাংলাদেশ-ভারতীয় শাখার আমির বলে যে নাম প্রকাশ পেয়েছে বাংলাদেশে সে নামের কোনো অস্তিত্ব নেই। ‘শায়খ আবু মুহাম্মদ আল বাঙালি’ নামটি একটি ছদ্মনাম। আইএসের নামে প্রোপাগান্ডা চালাতে এ নামটি ব্যবহার করা হচ্ছে। ভার্চুয়াল মাধ্যমে নামটি ব্যবহার করে হামলার হুমকি এবং শ্রীলঙ্কায় জঙ্গি হামলার পর এ নামটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। গত সপ্তাহে শ্রীলঙ্কা ঢাকার কাছে এই জঙ্গির ব্যাপারে জানতে সহযোগিতা চেয়েছে বলে জানা গেছে।

জঙ্গিবিষয়ক তদন্তকারী একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে গিয়ে যারা কথিত আইএস মতাদর্শী জঙ্গি হয়েছে তাদের একটি ছদ্মনাম দেওয়া হচ্ছে। ওই নামের শুরুতে আবু এবং শেষে বাঙালি থাকে। চেনার জন্য এ জাতীয় নাম ব্যবহার করা হয়। নব্য জেএমবির জঙ্গিদের মধ্যেও কয়েকজন নিজেদের এমন ছদ্মনাম ব্যবহার করেছে। আইএসের প্রোপাগান্ডায় দেশে ও বিদেশে নিহত কয়েকজন জঙ্গির নামও ‘আবু মুহাম্মদ আল বাঙালি’ বলে দাবি করা হয়েছিল। বয়স ও স্থানের ভিন্নতার কারণে এই নাম নিয়েও রয়েছে অনেক সংশয়। গ্রেপ্তার ও নিহত মিলে অন্তত এক ডজন জঙ্গির ‘আবু-বাঙালি’ যুক্ত ছদ্মনাম পাওয়া গেছে। তবে সাংগঠনিক নেতা বলে যে দাবি করা হচ্ছে, সে ধরনের কোনো সাংগঠনিক ভিত্তি বা কার্যক্রম নেই বাংলাদেশে। দেশের জঙ্গি কর্মকাণ্ডের তদন্তকারীরা বলছেন, আইএস মতাদর্শী নব্য জেএমবির দেশীয় জঙ্গিরা যেসব ছদ্মনাম ব্যবহার করে তা তদন্তে বেরিয়ে আসে। যারা বিদেশে জঙ্গি হয়েছে তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন প্রবাসজীবন কাটানোর সময় এই ফাঁদে পা দেয়। বিদেশে নিহত সবার ব্যাপারে তদন্ত করে দেশে তাদের সাংগঠনিক কোনো কার্যক্রম চালানোর তথ্য মেলেনি। গণমাধ্যমে প্রচারের পরই আবু মুহাম্মদ আল বাঙালির ব্যাপারে নজরদারি করে একই ধরনের তথ্য পাচ্ছেন গোয়েন্দারা।

গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) কার্যনির্বাহী কমিটির সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) কোনো তৎপরতা বাংলাদেশে নেই। তবে কারো কারো সঙ্গে আদর্শিক যোগাযোগ থাকতে পারে।’ আইএসের দাবি করা বাংলাদেশ শাখার খলিফা শায়খ আবু মুহাম্মদ আল বাঙালির বিষয়ে আইজিপি বলেন, ‘গণমাধ্যমে আল বাঙালির বিষয়টি এসেছে। তার হুমকির বিষয়টিও গণমাধ্যম থেকেই আমরা জানতে পেরেছি। তবে বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার সুনির্দিষ্ট কোনো হুমকি নেই। তবে সামগ্রিক বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশও সম্পূর্ণরূপে ঝুঁকিমুক্ত নয়। তাই বাড়তি সতর্কতার পাশাপাশি সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি।’

গত ১২ মার্চ আইএসের মুখপত্র ‘আত তামক্বিন’-এর একটি সংখ্যায় বলা হয়েছে, শাইখ আবু মুহাম্মদ আল বাঙালি এ অঞ্চলের নতুন খলিফা। শ্রীলঙ্কার সরকার গত সপ্তাহে বাংলাদেশকে জানিয়েছে, ‘আবু মোহাম্মদ আল বেঙ্গলি’ একজন বাংলাদেশি। গত ২১ এপ্রিল শ্রীলঙ্কায় ভয়ংকর সন্ত্রাসী হামলার পর ওই ব্যক্তিকে ভারতীয় উপমহাদেশে আইএসের কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে কলম্বোর কাছে তথ্য রয়েছে।

সিটিটিসি ইউনিটের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভিন্ন দেশ থেকে আইএসে যোগ দিলে ছদ্মনামে আবু নামটি যোগ করে দেওয়া হয়। নামের শেষে থাকে দেশ বা এলাকার শব্দ। বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে বাঙালি দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। এ কারণে দেশীয় জঙ্গিরা এটা অনুসরণ করে নিজেরাও নাম দেয়। তবে কথিত আইএস জঙ্গির সঙ্গে দেশে কোনো সাংগঠনিক যোগাযোগের তথ্য নেই।’ আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘এগুলো মনগড়া নাম।মূলত ভার্চুয়াল প্রোপাগান্ডা চালানোর জন্য ও একটি অঞ্চলে লোক আছে দেখানোর জন্য দেওয়া হয়। তাই প্রচার চালাতে গিয়ে ভুলে একই নাম বারবারও বলা হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ভারতে পালিয়ে থাকা শীর্ষ জঙ্গিদের মধ্যে মামুনুর রশিদ রিপন, শরিফুল ইসলাম খালিদ, হাতকাটা মাহফুজ, বোমা মিজান গ্রেপ্তার হয়েছে। শুধু ত্রিশালে পালিয়ে যাওয়া সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীন আছে। সে আইএস মতাদর্শী নয় বলে আগেই জানা গেছে।’

২০১৭ সালের ২৪ মার্চ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে চেকপোস্টে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয় এক তরুণ। পরে আয়াদ হোসেন নামে রাজধানীর মিরপুরের এক তরুণকে শনাক্ত করা হয়—যে ঘটনার আট মাস আগে তার খালাতো ভাই রাফিদ আল হাসানের সঙ্গে নিখোঁজ হয়। আইএসের মুখপত্র ‘আমাক’-এ ছবি প্রকাশ করে বোমা বিস্ফোরণ তাদের সদস্য ‘আবু মোহাম্মদ আল বাঙালি’ ঘটিয়েছে বলে দাবি করে। ওই ঘটনায় প্রথম আবু মোহাম্মদ আল বাঙালি নামটি ব্যবহার করা হয়। আয়াদ নব্য জেএমবিতে যুক্ত ছিল বলে নিশ্চিত হলেও কথিত ছদ্মনামের পরিচয় নিশ্চিত হতে পারেনি গোয়েন্দারা। আয়াদের পুরনো ছবির সঙ্গে আইএসের প্রচার করা ছবিরও মিল ছিল না। এখনো আয়াদের লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পড়ে আছে। অথচ তাকে নিজেদের সদস্য বলে দাবি করা কথিত নামটি ফের ব্যবহার করেছে আইএস!

গত বছরের অক্টোবরে নরসিংদীতে সিটিটিসির ‘গর্ডিয়ান নট বা জটিল গেরো’ নামে অভিযানে নিহত দুজনের মধ্যে একজনের নাম ছিল আবদুল্লাহ আল বাঙালি এবং অন্য নারীর নাম আকলিমা আকতার মনি। এই সূত্র ধরেও তদন্ত করা হচ্ছে।

পান্থপথে ওলিও ইন্টারন্যাশনালে বিস্ফোরণের ঘটনায় গত বছর গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গি আকরাম হোসেন নিলয়ের সাংগঠনিক নাম ছিল ‘আবু আল বাঙালি’ ও ‘আবু আব্দুল্লাহ’। এই নিলয় দেশে নব্য জেএমবির অন্যতম সংগঠক। শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুর পর তাকে আমিরের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

২০১৬ সালে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর নব্য জেএমবির প্রধান হিসেবে ‘আবু ইউসুফ আল বাঙালি’ ও ‘শায়খ আবু ইব্রাহীম আল হানিফ’ নামটি আসে। পরে ভার্চুয়াল প্রোপাগান্ডায় শায়খ আবু ইব্রাহীম আল হানিফ নামটি বেশি প্রকাশ পায়। আশুলিয়ায় অভিযানের সময় নিহত জঙ্গি সরোয়ার জাহান মানিকই এই নেতা বলে দাবি করে র‌্যাব। তবে সিটিটিসি জানায়, মানিকের সাংগঠনিক নাম অসিম আজওয়াদ বিন আব্দুল্লাহ। পরবর্তী সময়ে মৌলভীবাজারের অভিযানে নিহত নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা মাইনুল ইসলাম মূসার সাংগঠনিক নাম ছিল আবু মুহাবিদ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা