kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

চলন্ত বাসে নার্সকে ধর্ষণের পর হত্যা

বাঁচার চেষ্টা করেও পারেননি তানিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক, হাওরাঞ্চল ও কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি   

১৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাঁচার চেষ্টা করেও পারেননি তানিয়া

ইবনে সিনা হাসপাতালের সিনিয়র নার্স শাহীনূর আক্তার তানিয়াকে চলন্ত বাসে একে একে ধর্ষণ করে হেলপার বোরহান, চালক নূরু এবং আরেক হেলপার লালন। শুরুতে ওই তিনজনের মতলব বুঝতে পেরে তানিয়া বাস থেকে নামার জন্য কিছুটা এগিয়ে আসেন। এ সময় বাসচালক হঠাৎ কড়া ব্রেক করে। ভারসাম্য হারিয়ে তানিয়া বাসের মেঝেতে পড়ে মাথার পেছনে গুরুতর আঘাত পেয়ে জ্ঞান হারান। এ সময় তারা তিনজন একে একে তানিয়ার ওপর নির্যাতন করে। একপর্যায়ে চেতনা ফিরে পেয়ে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা চালান তানিয়া। ওই সময় তিনজনের সঙ্গে পেরে ওঠেননি তিনি। গত মঙ্গলবার কিশোরগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আল মামুনের আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে এভাবেই ঘটনার বর্ণনা দেয় হেলপার লালন। জবানবন্দিতে লালন বলে, ধর্ষণ শেষে মুমূর্ষু তানিয়াকে রাস্তায় এমনভাবে ফেলে রাখা হয়েছিল যেন অন্য গাড়ি তাঁকে চাপা দেয়। সড়ক দুর্ঘটনায় তানিয়ার মৃত্যু হয়েছে বলে সবাই জানবে বলে তাদের ধারণা ছিল। কিন্তু চালক নূরুজ্জামান নূরু, হেলপার লালন ও বোরহানের এই পরিকল্পনা ভেস্তে যায় কটিয়াদীর দড়িচড়িয়াকোনার রিকশাচালক জাকির হোসেনের কারণে। তিনি ঘটনাস্থলে চলে আসায় তা আর সম্ভব হয়নি। তাঁর চাপাচাপিতে ঘাতকরা তানিয়াকে আবার বাসে তুলে পিরিজপুরের বাজারে চলে যায়। পরে সেখানে দুর্ঘটনার নাটক করে এক ফার্মেসিতে মেয়েটির চিকিত্সার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।

তানিয়ার মৃত্যু সম্পর্কে লালন জবানবন্দিতে আরো জানায়, চালকের খালাতো ভাই হেলপার বোরহানের মাথায় সবার আগে তানিয়াকে ধর্ষণের কুবুদ্ধি চাপে। তার প্রস্তাবেই সবাই এ অপকর্মের পরিকল্পনা করে। প্রথমে  বোরহান মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের একপর্যায়ে বোরহান ও লালন তানিয়াকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয়। এ সময় বাসের দরজায় আরেক দফা আঘাত পান তানিয়া।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, লালন তার জবানবন্দিতে জানায়, তানিয়াকে তারা প্রথমে কাপাসিয়ায় নিয়ে যেতে চেয়েছিল। পরে তারা কী করবে তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও সিদ্ধান্তহীনতা পড়ে যায়। এভাবে পিরিজপুর বাজারের ফার্মেসি হয়ে তারা এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করে রাত সাড়ে ১০টার দিকে ইজি বাইকে করে আল-আমিন ও রফিকের মাধ্যমে তানিয়াকে কটিয়াদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়।

কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, গুরুতর আহত তানিয়াকে সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে হয়তো তিনি বাঁচতেন। কিন্তু আসামিদের সময়ক্ষেপণের কারণে অনেক পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়।

তিনি বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বোরহানকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। খুব শিগগির তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে আমার বিশ্বাস। সে ধরা পড়লেই ঘটনায় সরাসরি জড়িত সবাই আইনের আওতায় চলে আসবে। এর আগে সোমবার নার্স তানিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার অন্যতম আসামি স্বর্ণলতা বাসের চালক নূরুজ্জামান নূরু ঘটনার দায় স্বীকার করে একই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিল। গতকাল বুধবার কিশোরগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আল মামুনের আদালতে ওই মামলার আরেক আসামি রফিকুল ইসলাম ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

গত ৮ মে বাসচালক নূরু ও হেলপার লালনসহ পাঁচজনকে আট দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। আট দিনের রিমান্ডে থাকা অন্য তিন আসামি হলো বাসের সুপারভাইজর রফিকুল ইসলাম রফিক, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর ভোগপাড়া গ্রামের দুলাল মিয়ার ছেলে খোকন মিয়া (৩৮) এবং বাজিতপুরের পিরিজপুরের নিলখী গ্রামের মৃত আব্দুস শহীদের ছেলে বকুল মিয়া (৫০)। 

তানিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় তাঁর বাবা গিয়াস উদ্দিন চারজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে বাজিতপুর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে আর দুজন পলাতক রয়েছে। তারা হলো স্বর্ণলতা বাসের কটিয়াদী কাউন্টারের আল-আমিন ও স্থানীয় আব্দুল্লাহ আল মামুন।

গত ৬ মে রাতে ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের পিরিজপুর রুটে চলাচলকারী স্বর্ণলতা ভিআইপি পরিবহন নামের একটি বাসে নার্স শাহীনূর আক্তার তানিয়াকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয়। তিনি কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুরি ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের মো. গিয়াস উদ্দিনের মেয়ে।

 

মন্তব্য