kalerkantho

পরিচ্ছন্ন নগরে চাই স্বস্তির পরিবেশ

নিয়ামুল কবীর সজল, ময়মনসিংহ   

১৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পরিচ্ছন্ন নগরে চাই স্বস্তির পরিবেশ

ময়মনসিংহ শহরে নতুন কোনো অতিথি এলেই তার চোখে যে বিষয়টা দৃষ্টিকটু ঠেকে তা হলো এ শহরের নোংরা চেহারা। শহরের এ হাল প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের রুচিবোধকে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এ ছাড়া শহরের বাসিন্দারা প্রতিদিন কুকুর, গরু ও মশার উৎপাতে অতিষ্ঠ।

ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহরটিকে সিটি করপোরেশন ঘোষণার পর নাগরিকদের প্রত্যাশা তাদের পরিচ্ছন্ন নগরের স্বপ্ন বাস্তব রূপ পাবে। নোংরা শহর হিসেবে ময়মনসিংহের যে বদনাম সেটা এবার ঘুচবে। পাশাপাশি শহরের রাস্তায় অবাধে গরুর পাল ঘুরে বেড়ানো, বেওয়ারিশ কুকুরের উৎপাত আর মশার যন্ত্রণা থেকেও তারা মুক্তি পাবে।

শম্ভুগঞ্জের ভাগাড় : সরেজমিনে দেখা গেছে, ময়মনসিংহ শহরের ময়লা ফেলার নির্ধারিত এ স্থানটি হলো শহরের ব্রহ্মপুত্র নদের সেতু পার হয়ে সড়ক ধরে অল্প কিছুটা দূরে হাতের ডান পাশে। ময়লা ফেলার যুৎসই জায়গা না পেয়ে প্রায় ৮-১০ বছর ধরে সড়কের পাশের নিচু এ জায়গাটিতে ময়লা ফেলা হচ্ছে। এত দিনে ময়লার স্তূপ জমতে জমতে এখন জায়গাটি ভরাট হয়ে সড়কের ওপর এসে পড়েছে। আবর্জনা পচে-গলে মারাত্মক দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ভাগাড়ের আশপাশের প্রায় সোয়া কিলোমিটার এলাকার বাতাসে সব সময় দুর্গন্ধ পাওয়া যায়।

নগরবাসীর ভাষ্য মতে, ময়লা ফেলার স্থানটির একেবারে পাশেই ময়মনসিংহ-শম্ভুগঞ্জ সড়ক। গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করে চার জেলার শত শত মানুষ। রিকশা, ভ্যান, টেম্পো, মোটরসাইকেলসহ শত শত যানবাহন চলে। নাক চেপে, মুখ ঘুরিয়ে জায়গাটি পার হয় যাত্রী আর পথচারীরা।

মূল শহরের চিত্রও ভালো না : পুরান পৌর এলাকা অর্থাৎ মূল শহর সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সব প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে ময়লার স্তূপ। চরপাড়া, পণ্ডিতবাড়ী, পণ্ডিতপাড়া, আমলাপাড়া, হরিকিশোর রায় রোড, ধোপাখলা মোড়, সেহড়া, হিন্দুপল্লী, কবরখানা, মহারাজা রোড, পুরোহিত পাড়া, ত্রিশাল বাসস্ট্যান্ডের মোড়, আর কে মিশন রোড, নওমহল বাইলেন ইত্যাদি এলাকার সড়ক ও অলিগলির স্থানে স্থানে স্তূপাকার ময়লা-আবর্জনা।

শামীমা আহমেদ নামে একজন গৃহিণী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ শহরটা আরো পরিচ্ছন্ন থাকা দরকার।’

কয়েক মাস ধরে শহরের ময়লা-আবর্জনা দ্রুত অপসারণের জন্য স্থানে স্থানে প্লাস্টিকের ড্রাম বসানো হয়েছে। এতে কিছুটা সুফল মিলছে। তবে ড্রামগুলোতে আবর্জনা জমে উপচে পড়ে রাস্তায়। এখন রাতের বেলা ময়লা অপসারণের কারণে নোংরা দৃশ্যের অনেকটা উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু দুটি কারণে শহর পুরোপুরি পরিচ্ছন্ন হচ্ছে না। প্রথমত, অনেক নাগরিকের কুঅভ্যাস ও অসচেতনতা। যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপ করা অধিকাংশ বাসিন্দার স্থায়ী বদ-অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া আবর্জনা পলিথিনে ভরে নালায় ফেলে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে অকার্যকরও করছে অনেক নাগরিক। আরেকটি হলো—আবর্জনা অপসারণে প্রয়োজনীয় যানবাহনের অভাব। এ খাতে বরাদ্দও অপ্রতুল।

নগরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কবি স্বাধীন চৌধুরী বলেন, ‘একটি পরিচ্ছন্ন শহরের দাবি আমাদের আগেও ছিল, এখনো আছে। তবে আগে বিভিন্ন সংকটের কারণে এ শহর সর্বতোভাবে পরিচ্ছন্ন রাখা যায়নি। কিন্তু এখন আমরা আশা করছি সিটি করপোরেশন হওয়ার কারণে এ নগর একটি পরিচ্ছন্ন নগর হিসেবে রূপ পাবে।’

আকাশ দেখা যায় না : নগরের অলিগলি থেকে রাজপথ—সবখানেই প্যানা আর ফেস্টুনে ভরা। যে কারণে শহরের স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। এগুলোর কারণে শহরের আকাশ দেখা যায় না। জানা গেছে, প্রায় তিন বছর আগে তৎকালীন জেলা প্রশাসক শহরকে প্যানামুক্ত করেছিলেন। স্বাভাবিক চেহারায় ফিরেছিল শহর। কিন্তু ছয় মাস পর বিশেষ করে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের কারণে সেই সুফলটি আর ধরে রাখা যায়নি।

গরু, কুকুর ও মশার উৎপাত : ‘রাতের বেলা বাসার সামনে ছয়-সাতটা কুকুর নিজেদের মধ্যে ঝগড়া আর কামড়াকামড়ি করে। করে চিৎকার চেঁচামেচি। এতে ঘুম তো ভেঙে যায়ই, মনের মধ্যে ভয়ও ঢোকে—না জানি কুকুরগুলো এখন কাকে আক্রমণ করে।’ এ কথাগুলো বলছিলেন ময়মনসিংহ শহরের সি কে ঘোষ সড়কের বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন। শুধু এ এলাকাই নয়, নগরজুড়েই এখন বেওয়ারিশ কুকুরের ভয়াবহ উৎপাত। নগরবাসীর আরেক ভয় ও বিড়ম্বনার কারণ শহরের যত্রতত্র অবাধে বিশালাকার গরু ঘুরে বেড়ানো। কুকুর ও গরুর কারণে ভয়ে ভয়ে পথ চলে নারী-শিশুরা। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া নগরীর প্রায় সব এলাকায় মশার যন্ত্রণায় বাসিন্দারা অতিষ্ঠ।

শহরের চরপাড়া এলাকার বাসিন্দা প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তাঁর বাসা মেডিক্যাল কলেজ গেটের উল্টা দিকে। এখানে কমপক্ষে ২০টি কুকুর প্রতিদিন ঘোরাঘুরি করে। তাঁর নিজের মেয়ে কয়েক দিন আগেও কুকুরের কারণে ভয় পেয়েছিল।

গরুর কারণে রিকশা ও ইজিবাইক দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং পথচারী বিশেষ করে শিশু ও নারীরা ভয় নিয়ে পথ চলে। বেশ কয়েক বছর আগে পুলিশ গরুর বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানে নেমেছিল। গরুর অবাধে বিচরণ বন্ধে শহরে মিছিল সমাবেশও হয়েছে। কিন্তু সমূলে সমাধান কখনোই হয়নি।

শহর দাপিয়ে বেড়ানো প্রায় পাঁচ-ছয় শ গরুর মালিকরা শহরেই বাস করেন। মালিকরা এসব গরু শহরে ছেড়ে দেন। গরুগুলো খাবারের সন্ধানে শহরের ডাস্টবিনগুলোতে হানা দেয়। ফলে ময়লা-আবর্জনা আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশ দূষিত করে।

প্রভাতি ইনস্যুরেন্স কম্পানির ময়মনসিংহ অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক (জিএম) এম এ বারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পথের এসব গরু হর্ন দিলেও সরে না।’

নগরের রাজবাড়ীর পেছনে ভাড়া বাসায় থাকেন মজিবুর রহমান শেখ মিন্টু। তিনি বলেন, মাঝে মাঝে মশার অত্যাচার অসহনীয় হয়ে ওঠে। আবার কখনো কখনো মশা থাকে না। শহরের সানকিপাড়া এলাকায় মেসে থাকে অনেক শিক্ষার্থী। কিবরিয়া সরকার নামে একজন বলে, ‘সন্ধ্যার পর বড় বড় মশার কারণে তাদের পড়াশোনা কঠিন হয়ে পড়ে।’

মন্তব্য