kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণায় কাঁদলেন মাহবুব তালুকদার

বাঁশের লাঠিকে রাইফেল ধরে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ শুরু করি : সিইসি

বিশেষ প্রতিনিধি   

২৭ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শুধু মনোবল সঙ্গী করে বাঁশের লাঠিকে রাইফেল ধরে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেন বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা। তিনি বলেন, ‘৭ই মার্চের ভাষণে রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আমরা কেউ মশারি টানানোর লাঠি, কেউ বাঁশ—এসব নিয়ে ছুটে যাই। সেখানে লাখ লাখ মানুষ ছিল, তার মধ্যে আমরাও ছিলাম। আমিও ছিলাম। কারণ আমরা স্বাধীনতা চেয়েছিলাম।’

গতকাল মঙ্গলবার মহান স্বাধীন ও জাতীয় দিবস-২০১৯ উপলক্ষে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবন মিলনায়তনে নির্বাচন কমিশন (ইসি) আয়োজিত আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন সিইসি। অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর স্মৃতি তুলে ধরতে গিয়ে নিজে কাঁদেন, দর্শকদেরও কাঁদান।

সিইসি নুরুল হুদা বলেন, ‘৭ই মার্চ রাতে আমার এক স্যারের সঙ্গে দেখা করে বলি, বঙ্গবন্ধু তো দিকনির্দেশনা দিয়ে দিয়েছেন, এখন কী করব? স্যার বলেন, ঢাকা শহর কারো জন্য নিরাপদ নয়, তুমি বরং গ্রামে চলে যাও। আমি ফরিদপুরের এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের দিকে রওনা হই। গ্রামে পৌঁছে দেখি, সব তরুণ-যুবা, কৃষক-শ্রমিক-জনতা, সবার মধ্যেই যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি।’

অনুষ্ঠানে ইসি মাহবুব তালুকদার তুলে ধরেন এক অজানা ইতিহাস। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমার অনেক স্মৃতি। আজ মাত্র দুটি বিষয়ে বলব। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু। ওই দিনই তিনি আমায় ডেকে বলেন, মাহবুব তুমি আমার সঙ্গে থাকবা। আমাকে রাষ্ট্রপতির সহকারী প্রেসসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমার দায়িত্ব পড়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে তাঁর আত্মজীবনীর ডিকটেশন নেওয়ার। সিদ্ধান্ত হয় দুপুরে খাওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর বিশ্রামের সময়টুকুতে আমি তাঁর রুমে ঢুকে যাব। তিনি আমাকে বলেন, যদি কোনো অজুহাতে ডিকটেশন দেওয়ার জন্য তিনি সময় না দিতে পারেন, তাহলে আমি যেন জোর করে ডিকটেশন নিই। সেই মতে, আমি পর পর তিন দিন ডিকটেশন নিই। রেকর্ডও করি। চতুর্থ দিন বঙ্গবন্ধু বেঁকে বসেন। বলেন, তোমার জন্য তো আমি বিশ্রামটুকুও নিতে পারছি না। আমি তাঁকে বলি, আইয়ুবের শাসন, আপনার ছয় দফা, পাকিস্তানের জেলে বন্দি থাকার দিনগুলো, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা—এ রকম গুরুত্বপূর্ণ সব অধ্যায়ের বিষয়গুলো নিয়ে তো আপনাকে ডিকটেশন দিতে হবে। বিশ্রামের সময় আপনাকে বিরক্ত করতে আমারও ভালো লাগে না। তাই আপনি আমাকে অন্য একটা সময় বের করে দিন।’

বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি সমস্ত কাজ গুছিয়ে আনছি, পরিবারের সদস্যদের বিয়ে-শাদি শেষ করে দিয়েছি। সামনেই ডিকটেশন নেওয়ার সময় বের করে দেব। কোনো কিছুই আটকে থাকবে না। এরপরই এলো সেই ঘৃণ্য আগস্ট।’

মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘দ্বিতীয় ঘটনাটি ১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসের। বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান যেদিন মারা যান সেদিন আমি ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সারা দিন ছিলাম। চল্লিশার দিনে ঠিক হয় বঙ্গবন্ধু টুঙ্গিপাড়া যাবেন। সঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ, তিন বাহিনীর প্রধান ও সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা থাকবেন। গাজী জাহাজে টুঙ্গিপাড়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু হয়। আমার জাহাজ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা না থাকায়, কাপড়চোপড় সঙ্গে নেওয়ার কথা মনে হয়নি। রাতে জাহাজ ছাড়লে দেখি, আমার শোবার কোনো জায়গা নাই। একপাশে একটি খালি সোফা পেয়ে শুয়ে পড়ি। পাশেই তখনকার এডিসি রাব্বানি সাহেব ছিলেন। মাঝরাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়। দেখি, রাব্বানি জেগে আছেন। আমার মাথার নিচে বালিশ। আমি অবাক হয়ে রাব্বানিকে জিজ্ঞেস করি, এই বালিশ আমার মাথার নিচে কে দিলেন? রাব্বানি বলেন, রাতে বঙ্গবন্ধু রাউন্ডে এসেছিলেন। তিনি দেখেন আপনি মাথার নিচে হাত দিয়ে সোফায় শুয়ে আছেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর রুমে গিয়ে বালিশ নিয়ে এসে আপনার মাথার নিচে রেখে গেছেন।’

এই স্মৃতিচারণার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মাহবুব তালুকদার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি জানতাম বঙ্গবন্ধুর দুটি বালিশ ছাড়া ঘুম হয় না। তখন আমি বালিশ ফিরিয়ে দিতে বঙ্গবন্ধুর রুমের দিকে যাওয়ার কথা বলি। রাব্বানি জানান, গিয়ে লাভ নেই। বঙ্গবন্ধু দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছেন।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা