kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ফুটপাতে চাঁদাবাজি : মিরপুর স্পট-১

কোটিপতি কাউন্সিলর চাঁদা তোলেন ফুটপাত থেকে

লায়েকুজ্জামান   

১৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পূরবী সিনেমা হল এবং পাশের মিডল্যান্ড ও পূরবী মার্কেটের সামনের ফুটপাত দখল করে আরেক জমজমাট বিপণিকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে ফুটপাতে বস্ত্র থেকে শুরু করে সব ধরনের সামগ্রীর পসরা সাজানো। ফুটপাতে অবৈধ এই বিপণিকেন্দ্র বসিয়েছে এলাকার ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। তাদের নেতা ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজি রজ্জব আলী। তিনিও ক্ষমতাসীন দলের নেতা। ওই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি তিনি। এলাকার মানুষ এই বিপণিকেন্দ্রের নাম দিয়েছে রজ্জব আলী ফুটবিতান। এখান থেকে তাঁর নামেই প্রতিদিন তোলা হয় চাঁদা। 

সেখানে বাচ্চাদের কাপড়ের ব্যবসা করেন এমন একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বেচা-বিক্রি হোক বা না হোক, প্রতিদিন কাউন্সিলরের লোক এসে ৩০০ টাকা নিয়ে যায়। সন্ধ্যার পর সামাদ নামের ওই লোক চাঁদার টাকা তোলেন। সামাদ টাকা তুললেও সবাই জানেন এ টাকা যায় রজ্জব আলীর কাছে।’

পূরবী মার্কেটের একজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘এই মার্কেটে দোকান নিয়ে আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। এলাকার কমিশনার ফুটপাতে দোকান বসিয়েছেন। তিনি ফুটপাত থেকে তাঁর লোক দিয়ে চাঁদা আদায় করেন। ফুটপাতের ওই সব দোকানের কারণে মার্কেটে ক্রেতাসাধারণ প্রবেশ করতে পারে না। প্রতিবাদ করার ক্ষমতা আমাদের নেই। নাম প্রকাশ হলে জীবন যাবে। আর তো প্রতিবাদ!’

ফুটপাতের একজন ফল ব্যবসায়ী বলেন, ‘দয়া করে আমার নামটা পত্রিকায় দেবেন না। তাহলে কালই দোকান ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে হবে। না হয় ওরা মেরে ফেলবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এখানে দোকান বসানোর সময় দিতে হয়েছে ২০ হাজার টাকা। আর এখন প্রতিদিন দিতে হয় ২৫০ টাকা।’

ওই ফুটপাত মিরপুরের ১২ নম্বর সেকশনের পল্লবী থানা এলাকায়। বিপণিবিতানের সামনের খোলা জায়গায় ফুটপাতে বসানো হয়েছে অস্থায়ী দোকান। এসব দোকান প্রধান সড়কের বেশ কিছু জায়গাও দখল করে নিয়েছে। বর্তমানে প্রধান সড়কে মেট্রো রেলের নির্মাণকাজ চলায় ফুটপাতের অনেক দোকান বন্ধ করে দিতে হয়েছে।

স্থানীয় লোকজন জানায়, মেট্রো রেলের কাজ শুরু হওয়ার আগে এখানে পাঁচ শতাধিক দোকান ছিল। বর্তমানে রয়েছে সাড়ে ৩০০। দোকানভেদে প্রতিদিন চাঁদা আদায় করা হয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা করে।

দোকান শুরুর সময় ব্যবসার ধরন অনুসারে দিতে হয়েছে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। একজন ফল ব্যবসায়ী জানান, তিনি দোকান শুরু করার সময় দিয়েছিলেন ১৮ হাজার টাকা। এ টাকা দিতে হয়েছে ফুটপাতের পজিশন বাবদ। বাচ্চাদের কাপড় বিক্রেতা মনসুর আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ২০ হাজার টাকা দিয়ে পজিশন নিয়েছিলাম। মেট্রো রেলের কাজ শুরু হওয়ার পর জায়গা কমে যাওয়ায় দোকান বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এখন অন্য কোথাও বসার জায়গা পাচ্ছি না। আবার জায়গা পেলেও নতুন করে পজিশন কেনার টাকা নেই। আগে যে টাকা দিয়েছিলাম সে টাকাও ফেরত পাইনি। টাকা চাইলে তারা বলে, মেট্রো রেলের কাজ শেষ হলে আবার দোকান শুরু হবে। টাকা ফেরত হবে না।’ কার কাছে টাকা ফেরত চেয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সামাদ ভাইয়ের কাছে। তিনি ওই কথা বলে দিয়েছেন।’

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি ও ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই ফুটপাত থেকে প্রতিদিন ৮৫ থেকে ৯০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। আদায় করা এই চাঁদা থেকে ৫০ হাজার টাকা নেন কাউন্সিলর হাজি রজ্জব আলী। ২০ হাজার টাকা নেন রজ্জব আলীর পিএস পরিচয় দানকারী মোর্শেদ। টাকা সংগ্রহকারী সামাদকে প্রতিদিন দেওয়া হয় ৫০০ টাকা।

একসময় কপর্দক শূন্য হাজি রজ্জব আলী বর্তমানে কয়েক শ কোটি টাকার মালিক। গার্মেন্টসহ একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে তাঁর। রাজনীতি তাঁর ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিলেও ছাড়েননি ফুটপাতের চাঁদাবাজি।

চাঁদা আদায়কারী আবদুস সামাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ফুটপাত থেকে কোনো চাঁদা তুলি না। অন্য কেউ তুলতে পারে। রজ্জব আলী আমার নেতা। তিনি অনেক টাকার মালিক। তাঁকে কেন ফুটপাত থেকে চাঁদা নিতে হবে? এ কথার পর সামাদকে যখন বলা হয় তাঁকে তো ফুটপাতের দোকান থেকে প্রতিদিন চাঁদার টাকা আদায় করতে দেখা যায়। উত্তেজিত হয়ে সামাদ তখন বলেন, ‘টাকার গায়ে কি চাঁদা লেখা আছে?’ 

চাঁদার টাকার ভাগ নেওয়ার কথা অস্বীকার করে মোর্শেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি কেন চাঁদার ভাগ নেব? আমি কাউন্সিলর হাজি রজ্জব আলীর পিএস। বেতন পাই।’ তিনি আরো বলেন, ‘এখানে ফুটপাতে কোনো চাঁদাবাজি হয় না। মেট্রো রেলের কাজ শুরুর পর দোকান কমে গেছে। ব্যবসায়ীরা চাঁদা দেয় না।’ কিন্তু ব্যবসায়ীসহ এলাকার মানুষ বলছে তিনি ওই ফুটপাতের চাঁদার ভাগ পান। এ কথা বললে মোর্শেদ অনেকটা হুঙ্কারের সুরে বলেন, ‘আমি চাঁদার টাকার ভাগ পাই, এ কথা বলার সাহস নেই কারো!’

জানতে চাইলে হাজি রজ্জব আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফুটপাতে চাঁদাবাজি হয় না তা নয়। হয়। তবে আমি চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নই। আমি এলাকার কাউন্সিলর। চাঁদাবাজি করলে মানুষ কি আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করত? আমার অনেক ব্যবসা আছে। আমার চাঁদার টাকার প্রয়োজন হয় না।’

কিন্তু এলাকার লোক এবং ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাঁর নেতৃত্বেই ওই এলাকায় চাঁদাবাজি হচ্ছে। এ কথা জানালে তিনি বলেন, ‘কেউ পারলে সামনে এসে বলুক। কে চাঁদা নেয় আমি জানি না। আমার কেউ নেয় না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা