kalerkantho

বুধবার। ১৯ জুন ২০১৯। ৫ আষাঢ় ১৪২৬। ১৫ শাওয়াল ১৪৪০

শ্রমিক থেকে সর্বোচ্চ পদেও নারী

অর্থনীতিতে বাড়ছে নারীর অংশগ্রহণ ♦ প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেকে ছিটকে পড়েন

ফারজানা লাবনী   

৮ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অর্থনীতিতে ক্রমেই বাড়ছে নারীর অংশগ্রহণ। সফলতার সাক্ষর রাখছেন চাকরি, ব্যবসায়ে। ছোট্ট পরিসরে শুরু করে যোগ্যতায় উঠে আসছেন প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে। তার পরও নারীর এগিয়ে চলার পথ এখনো মসৃণ নয়। ঘরে-বাইরে প্রতিদিন মুখোমুখি হতে হচ্ছে নানা প্রতিবন্ধকতার। ফলে অনেক নারী কাজ শুরুর পর থামিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। চাকরি, ব্যবসায়ে অংশ নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভূমিকা রাখছেন এমন নারীর সংখ্যা এখনো কম।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কম থাকার তথ্য দেশি-বিদেশি গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৬ সালে কর্মক্ষেত্রে ছিলেন এক কোটি ১৩ লাখ নারী। ২০১০ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় এক কোটি ৬২ লাখ। গত ৯ বছরে এ সংখ্যা প্রায় দুই কোটিতে দাঁড়িয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণাপত্র ‘অর্থনীতির মূলধারায় নারীর অংশগ্রহণ’-এ উল্লেখ আছে, ‘অতিদ্রুত অর্থনীতিতে বিশেষভাবে চাকরি, ব্যবসায়ে নারীর সংখ্যা বাড়ছে। মোট শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ১৯৯৫-৯৬ সালে ১৫.৮ শতাংশ, ২০০২-২০০৩ সালে ২৬.১ শতাংশ, ২০০৫-২০০৬ সালে  ২৯.২ শতাংশ এবং ২০১১-১২ সালে ৩৯.১ শতাংশ। গত পাঁচ বছরে এ হার বেড়ে গড়ে ৪৫ শতাংশের বেশি হয়েছে। আশির দশকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ১ শতাংশও ছিল না। সেখানে বর্তমানে ১৫-১৮ শতাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী নারী।’

সিপিডির গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, ‘অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও উচ্চপদস্থ নারী কর্মকর্তার সংখ্যা অনেক কম। এখনো নারী তাঁর পূর্ণ যোগ্যতা অনুযায়ী অর্থনীতিতে অংশ নিতে পারছেন না। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর সংখ্যা আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেলেও আশানুরূপ নয়।’

২০১৬ সালে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘দ্য গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ’ রিপোর্ট অনুসারে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে, ব্যবস্থাপনায় নারীর অংশগ্রহণের হার ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। আর পুরুষের অংশগ্রহণের হার ৯৫ শতাংশ। দুই বছর পর ২০১৮ সালে একই সংস্থার আরেক রিপোর্টে দেখা যায়, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ কিছুটা বেড়েছে। তবে তা এখনো পুরুষের তুলনায় অনেক কম। এ রিপোর্টে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কিংবা ব্যবস্থাপনায় নারীর অংশগ্রহণের হার ১০.৭ শতাংশ। যেখানে পুরুষের অংশগ্রহণ ৮৯.৩ শতাংশ।   

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও পরিবারের বাধা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের কারণে তাঁরা হারিয়ে যাচ্ছেন। তবে নারীরা তাঁদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হচ্ছেন। নিজেদের দক্ষতা বাড়াচ্ছেন। বর্তমানে কর্মক্ষেত্র থেকে ছিটকে পড়া নারীর সংখ্যা কমছে। প্রায় ২৫ বছর পর সিপিডিতে আমি প্রথম নারী যে নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছি।’  

বার্জার পেইন্ট বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১৯৯০ সালে বার্জার পেইন্টে যোগ দিই। বহু পথ পাড়ি দিয়ে, যোগ্যতা প্রমাণ করে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়েছি। দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে বলছি, যোগ্যতা থাকলেও একজন নারীকে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে সহজে দায়িত্ব দেওয়া হয় না। বর্তমানে নারীরা হার না মানা মন নিয়ে কাজে অংশ নিচ্ছেন। চলাচলে সময় বাঁচাতে নারীরা মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন। দক্ষতার সঙ্গে কম্পিউটার চালাচ্ছেন। উপার্জনের অর্থ সংসারে ব্যয় করছেন। তাই তাঁর সিদ্ধান্ত সংসারের অন্যরা মেনে নিচ্ছে। এভাবে নারীরা পরিবারে ও কর্মক্ষেত্রের বাধা সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করছেন। প্রতিবাদ করে অধিকার আদায় করে নিচ্ছেন।’ 

সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের গবেষণায় দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে সরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেসরকারি পর্যায়ে নারীর কাজের সুযোগ বেশি সৃষ্টি হয়েছে। নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় এ সুযোগ বাড়ছে। বেসরকারি পর্যায়ে নারীর পদোন্নতিও দ্রুত হচ্ছে। বেতনও বাড়ছে। তবে পুরুষের তুলনায় এখনো নারী তাঁর প্রাপ্য কম পাচ্ছেন।

গত ১০ বছরে নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি দ্রুত পাল্টাচ্ছে জানিয়ে মাইডাস ফাইন্যান্সিং লিমিটেডের চেয়ারম্যান রোকেয়া আফজাল রহমান বলেন, ‘১৯৬৪ সালে মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকে আমি ছিলাম প্রথম নারী ম্যানেজার। বাচ্চাদের সময় দিতে হবে তাই চাকরি ছেড়ে দিই। দীর্ঘ বিরতির পর বাচ্চারা বড় হলে আবারও কাজ শুরু করি। এখন সময় বদলাচ্ছে। বর্তমানে ছোট-বড় সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে অর্ধেকের বেশি রয়েছেন নারী অফিসার।’

দিনে ১০ হাজার মানুষের খাবার রান্না করতে সক্ষম খান কিচেনের উদ্যোক্তা আফরোজা খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চার-পাঁচজন লোকের খাবার রান্নার মধ্য দিয়ে আমার প্রতিষ্ঠানের যাত্রা। ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছি। শুধু নারী হওয়ার কারণে কত বাধা এসেছে। কিন্তু হার মানিনি। আমার প্রতিষ্ঠানের খাবার দেশের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। দুই শর বেশি মানুষ এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন।’

মন্তব্য