kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

সরকারের কোটি কোটি টাকা দুই কর্মকর্তার পকেটে!

স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল

শিমুল নজরুল, চট্টগ্রাম   

৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সরকারের কোটি কোটি টাকা দুই কর্মকর্তার পকেটে!

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান নিলেও দুর্নীতি বন্ধ নেই জ্বালানি তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কম্পানিতে (এসএওসিএল)। খোদ কম্পানির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদ এবং পরিচালক মঈন উদ্দিন আহমেদ নিয়মিত সরকারের কোটি কোটি হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নিয়ন্ত্রণাধীন এই বিপণন প্রতিষ্ঠানে সরকারি কোনো অডিট হয়নি গত পাঁচ বছর। কম্পানির অ্যাকাউন্ট থেকে নিয়মিত টাকা উত্তোলন করে তাঁরা ব্যক্তিগত দুটি কম্পানির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করছেন বলে প্রমাণ মিলেছে কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে। এই দুই কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৫৭ কোটি টাকা স্থানান্তরের ‘প্রাথমিক প্রমাণ’ পেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। 

অভিযোগ উঠেছে, অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে এসএওসিএলের বিভিন্ন পদে মহাব্যবস্থাপক নিজের আত্মীয়-স্বজনকে নিয়োগ দিয়ে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন প্রতিষ্ঠানটিকে। সরকার এই প্রতিষ্ঠানের ৫০ শতাংশ শেয়ারের মালিক হলেও কোনো হিসাব-নিকাশের তোয়াক্কা করেন না মহাব্যবস্থাপক মো. শাহেদ। সরকারের আমদানি করা জ্বালানি তেল বিক্রির কোটি কোটি টাকা এরই মধ্যে হাতিয়ে নিয়ে বহু ফ্ল্যাটসহ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন তিনি। ঢাকা ও চট্টগ্রামে তাঁর বিলাসবহুল ফ্ল্যাটই রয়েছে ছয়-সাতটি।

সরকার বিপিসির মাধ্যমে যেসব জ্বালানি তেল আমদানি করে তার একটি বড় অংশ বিপণন করে এসএওসিএল। অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন কম্পানিতে (পদ্মা, মেঘনা, যমুনা অয়েল) সরকারের শেয়ারের পরিমাণ ৫১ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতের ৪৯ শতাংশ হলেও এসএওসিএলের ক্ষেত্রে সরকারি শেয়ারের পরিমাণ ৫০ শতাংশ এবং বেসরকারি শেয়ার ৫০ শতাংশ। শেয়ারের পরিমাণ অর্ধেক অর্ধেক হওয়ার সুযোগে বিপিসির কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই এই বিপণন প্রতিষ্ঠানের ওপর।

জানা গেছে, অন্যান্য বিপণন কম্পানির মতো এসএওসিএলও জ্বালানি তেল বিক্রির টাকা তাদের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে (আইএফআইসি ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখা, এসএনডি হিসাব নম্বর ২০৩০২৮৪৭৫২০৪১, এনসিসি ব্যাংক আগ্রবাদ শাখা, হিসাব নম্বর ০০০৩০৩২৫০০১১৪২, মেঘনা ব্যাংক লিমিটেড আগ্রাবাদ শাখা, এসএনডি হিসাব নম্বর ২১০১১৩৫০০০০০০০৩) জমা করে। পরে সেই টাকা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নগদ উত্তোলন করে মোহাম্মদ শাহেদ তাঁর গড়ে তোলা নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘গুডউইন পাওয়ার লিমিটেড’-এর অ্যাকাউন্টে (প্রিমিয়ার ব্যাংক সাতমসজিদ রোড শাখা, ঢাকা হিসাব নম্বর ১৬২১১১০০০০০০৫২) জমা করেন। একইভাবে এসএওসিএলের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ‘পিরামিড এক্সিম লিমিটেডের’ অ্যাকাউন্টেও কোটি কোটি টাকা জমা করা হয়েছে। এর কিছু নমুনা কালের কণ্ঠের কাছে রয়েছে।

দুর্নীতি অনুসন্ধানে দুদক : এসএওসিএলের ৫৭ কোটি টাকা দুই কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের ‘প্রাথমিক প্রমাণ’ পেয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিমের কর্মকর্তারা জানান, গত ৬ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ায় নিয়মিত অনুসন্ধানের জন্য অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দুদকের কর্মকর্তারা জানান, এসএওসিএলের পরিচালক মঈন উদ্দিন আহমেদ এবং মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মাদ শাহেদ ‘পারস্পরিক যোগসাজশে’ কম্পানির বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন করে তাঁদের ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘পিরামিড এক্সিম লিমিটেড’ ও ‘গুডউইন পাওয়ার’ নামের দুটি কম্পানির বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে জমা ও উত্তোলন করেছেন বলে দুদকে অভিযোগ আসে।

এরপর গত ২৮ জানুয়ারি দুদকের উপপরিচালক এস এম সাহিদুর রহমান ও মো. মাহমুদুর রহমানের একটি দল সাউথইস্ট ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও এনসিসি ব্যাংকে ওই দুই কম্পানির অ্যাকাউন্টগুলোতে লেনদেনের তথ্য যাচাই করে। এতে মহিউদ্দিন আহমেদ ও তাঁর স্ত্রীর ‘পিরামিড এক্সিম’ কম্পানির নামে গত তিন বছরে বিভিন্ন ব্যাংকে ৪৩ কোটি টাকা এবং মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদের মালিকানাধীন গুডউইন পাওয়ার কম্পানির নামে গত তিন বছরে প্রায় ১৪ কোটি টাকা জমা ও উত্তোলনের ‘প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার’ কথা দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ : বিভিন্ন উপায়ে উপার্জিত বিপুল অর্থের মাধ্যমে মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদ নিজ নামে-বেনামে ঢাকার একটি অভিজাত আবাসিক এলাকায় দুটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট, চট্টগ্রামের ডিওএইচএস আবসিক এলাকায় ২১ নম্বর প্লট ‘বায়তুল আবরার’-এর পঞ্চম তলায় একটি ফ্ল্যাট, চট্টগ্রামের খুলশী আবাসিক ৩ নম্বর রোডে একটি ফ্ল্যাট, লালখান বাজার চানমারী রোডে মিসমাক ডেভেলপমেন্টের একটি ফ্ল্যাট, দক্ষিণ খুলশী জাকির হোসেন এলাকার ৩ নম্বর সড়কে ৪২০০ স্কয়ার ফুটের বিলাসবহুল একটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। এ ছাড়া তাঁর মালিকানায় চট্টগ্রামের নিউ মার্কেটে রয়েছে একটি দোকান।

চট্টগ্রাম পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট হোস্টেল গেটের পাশে খুলশী-২ আবাসিক এলাকায় একটি বিলাসবহুল বহুতল ভবনে পরিবারসহ বাস করেন মো. শাহেদ। এ ছাড়া পশ্চিম খুলশী এলাকার জালালাবাদ হাউজিংয়ে ‘ন্যাশনাল পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট’ নামে একটি প্রাইভেট পলিটেকনিক্যাল কলেজ পরিচালনা করেন শাহেদের বাবা মো. আবদুল বাকী। সম্প্রতি খুলশী-২-এর এয়াকুব ফিউচার পার্ক আবাসিক এলাকায় ১০ তলা ভবন গড়ে তোলা হয়েছে এই ইনস্টিটিউটের জন্য। এই ভবনের পাশের প্লটটিও মো. শাহেদের।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে মঈন উদ্দিন আহমেদ এবং মোহাম্মদ শাহেদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাঁরা ফোন রিসিভ করেননি। এসএমএস দিয়ে প্রতিবেদকের পরিচয় জানানো হলেও তাঁরা কোনো সাড়া দেননি।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. সামছুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অভিযোগটি পাওয়ার পর গত মাসে আমরা একটি কমিটি গঠন করেছি। তবে এসএওসিএল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আমাদের আইনগত নোটিশ পাঠিয়েছে। তাই আমরা তদন্ত করে দেখতে পারিনি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা