kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

এক প্রকল্পেই ৫ অনিয়ম

মাতামুহুরীর তীর সংরক্ষণে পলি মাটির সিসি ব্লক!

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া (কক্সবাজার)   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এক প্রকল্পেই ৫ অনিয়ম

কক্সবাজারের চকরিয়া পৌর এলাকায় মাতামুহুরী নদীর তীর সংরক্ষণের জন্য সিসি ব্লক তৈরি হচ্ছে ময়লা বালু (পলিমাটি) দিয়ে। ইনসেটে ব্লক তৈরির জন্য ময়লা বালু তোলা হচ্ছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

কক্সবাজারের চকরিয়া পৌর এলাকায় মাতামুহুরী নদীর তীর সংরক্ষণের জন্য সিসি ব্লক তৈরি হচ্ছে ময়লা বালু (পলি মাটি) দিয়ে। এ কাজে সিলেটের পাথর ও বালু ব্যবহারের শর্ত থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। ব্যবহৃত হচ্ছে নিম্নমানের সিমেন্ট, যা আবার পরিমাণেও কম দেওয়া হচ্ছে। ফলে পাঁচ কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্বয়ং চকরিয়া সদর তথা পৌরসভার কোচপাড়ায় চলছে এই অনিয়ম। নিয়মানুযায়ী, সিসি ব্লক তৈরির সময় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হলেও কোনো কর্মকর্তা সেখানে যাচ্ছেন না। ফলে ঠিকাদার ইচ্ছামতো কাজ চলিয়ে যাচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে মাতামুহুরী নদীর চকরিয়া পৌরসভার কোচপাড়া অংশের এক নম্বর গাইড বাঁধ ও আশপাশের বহু ঘরবাড়ী নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। এভাবে বছরের পর বছর ভাঙনের কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছিল স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয় মজিদিয়া দাখিল মাদরাসাটিও হুমকির মুখে রয়েছে।

এ অবস্থায় নদীর ভাঙনরোধে টেকসইভাবে তীর সংরক্ষণে এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কালের কণ্ঠসহ গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে লেখালেখি হয়। এর ধারাবাহিকতায় পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীর ভাঙন ঠেকাতে তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় ওই অংশে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০০ মিটার এবং লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের উত্তর লক্ষ্যারচরে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০ মিটার সিসি ব্লক নির্মাণে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে ঠিকাদার নিয়োগ করে। এই কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।

কিন্তু স্থানীয় এলাকাবাসী অভিযোগ করেছে, পৌরসভার কোচপাড়া অংশের ৩০০ মিটারের জন্য তৈরিকৃত ব্লকে ব্যবহার করা হচ্ছে মাতামুহুরী নদী থেকে শ্যালো মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে উত্তোলিত পলি মিশ্রিত ময়লা বালু। এই বালু দিয়ে তৈরি সিসি ব্লকের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

নিয়ম রয়েছে, এ ধরনের কাজ চলমান থাকার সময় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকতে হবে কাজের মান ঠিক রাখার জন্য। কিন্তু এ সময় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাউকেই দেখা যায়নি অকুস্থলে। এতে ঠিকাদার ইচ্ছেমতো ব্লক তৈরি করে চলেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানায়, কোচপাড়া অংশের এই কাজটি করা হচ্ছে একেবারেই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে। যেখানে সিলেটি বালু ও পাথর ব্যবহারের শর্ত রয়েছে, সেখানে ব্যবহৃত হচ্ছে মাতামুহুরী নদীর পলিমাটি মিশ্রিত ময়লা বালু এবং পাহাড়ি বোল্ডার পাথর। আবার যে পরিমাণ সিমেন্ট ব্যবহারের নিয়ম রয়েছে তাও মানা হচ্ছে না।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানান, নদীর তীর সংরক্ষণে ব্লক তৈরির কাজটি বাস্তবায়নের জন্য ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্টার লাইট সার্ভিসেস অ্যান্ড অর্ণা কনস্ট্রাকশন জয়েন্টভেঞ্চারকে কার্যাদেশ দেয় পাউবো। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠান থেকে সাব ঠিকাদার হিসেবে কাজটি নেন সরকারি দলের প্রভাবশালী এক নেতা।

সরজমিনে ব্লক তৈরির দৃশ্য ধারণ করতে যাওয়ার খবর পেয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন চৌধুরীর শ্যালক ও কাউন্সিলর মুজিবুল হক। এ সময় তিনি দাবি করেন, ব্লক তৈরিতে কোনো অনিয়মই করা হচ্ছে না। মাতামুহুরী নদী থেকে বালু তুলেই এই কাজ বাস্তবায়নের জন্য অনুমতি রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তাদের।

কাজটি তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের চিরিঙ্গা শাখা কর্মকর্তা (এসও) তারেক বিন ছগীরের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার অধীনে বেশ কয়েকটি সাইটে নানা ধরনের কাজ চলমান রয়েছে। এ কারণে নির্দিষ্ট একটি সাইটে সার্বক্ষণিক উপস্থিত থাকা সম্ভব হয়ে ওঠে না।’

এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজারের নবনিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাতামুহুরী নদী থেকে উত্তোলিত ময়লা বালু দিয়ে ব্লক তৈরির কোনো নিয়ম নেই। যদি ঠিকাদার এ ধরনের কাজ করে থাকেন তাহলে তৈরিকৃত ব্লক ল্যাবে পরীক্ষা করা হবে। কাজের মান ঠিক না থাকলে কোনোভাবেই অর্থ ছাড় করা হবে না। এমনকি ব্লক বসানোর পর অন্তত ছয় মাস পর্যন্ত জামানতের টাকাও ধরে রাখা হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা