kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ফ্রুট জুসের জাতীয় মান কমাচ্ছে বিএসটিআই

কম্পানিগুলোর চাপে নতি স্বীকার!

শওকত আলী   

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) নির্ধারিত ফ্রুট সিরাপের জাতীয় মান (বিডিএস-৫২৮) কমানো হচ্ছে। এই জুস উৎপাদনকারী কম্পানিগুলোর চাপের মুখে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সে লক্ষ্যে ইতিমধ্যে কাজও শুরু করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি।

ফ্রুট জুসের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় আগেও দুইবার এর জাতীয় মান সংশোধন করা হয়। তবে সাধারণ একটি বিষয় তখন সামনে আসেনি। পণ্যটিতে প্রিজারভেটিভ হিসেবে ব্যবহৃত বেনজয়িক এসিডের মাত্রা কত হবে তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। কারণ বাজারে থাকা বিভিন্ন কম্পানির পণ্যে জাতীয় মানের চেয়ে অধিক মাত্রায় বেনজয়িক এসিড পাওয়া যায়। একই সঙ্গে এসব পণ্যে ঘোষণা ছাড়াই নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে স্যাকারিন।

জানা গেছে, একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার ল্যাব টেস্টে এই চিত্র উঠে আসার পর কম্পানিগুলোর চাপে বিডিএস পরিবর্তন করে বেনজয়িক এসিডের নতুন মাত্রা নির্ধারণে কাজ শুরু করেছে বিএসটিআই। একই সঙ্গে ফ্রুট সিরাপের বিডিএসে নতুন করে স্যাকারিন যুক্ত করা হতে পারে।

তথ্য মতে, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) বাজার থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ফ্রুট সিরাপ, বিশেষ করে রুহ্ আফজা, সিনা রোজ ও বায়োরোজের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে। বেনজয়িক এসিডের মাত্রা থাকার কথা সর্বোচ্চ ১০০ মিলিগ্রাম/কেজি। অথচ জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নমুনা পরীক্ষায় তা পাওয়া যায় ৫৩৪ মিলিগ্রাম/কেজি। বিএফএসএর পরীক্ষায় আরো বেশি মাত্রায় বেনজয়িক এসিড পাওয়া যায়।

বিডিএস মান অনুযায়ী পণ্যগুলোতে স্যাকারিন মেশানোর সুযোগ নেই। অথচ পরীক্ষায় দেখা গেছে, ২৬৪ মিলিগ্রাম/কেজি বা তারও বেশি হারে স্যাকারিন মিশিয়েছে কম্পানিগুলো। রুহ্ আফজার লেভেলিংয়ে ফ্রুট সিরাপের উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত স্যাকারিন সংক্রান্ত কোনো ঘোষণাই নেই। এটা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং প্রবিধানমালা, ২০১৭ পরিপন্থী।

তবে একটি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের জুলাই মাসে বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক বরাবর বিএফএসএ থেকে একটি চিঠি পাঠানো হয়। তাতে বলা হয়, রুহ্ আফজার ২৫ নং ব্যাচের পণ্য পরীক্ষা করে ২৬৮.৬০ এমজি/কেজি এবং বেনজয়িক এসিড ৪৩৫.১৯ এমজি/কেজি পাওয়া গেছে। পরীক্ষায় প্রাপ্ত স্যাকারিনের উপস্থিতি এবং পরিমাণ ও বেনজয়িক এসিডের পরিমাণের আইনগত বৈধতা সম্পর্কে বিএসটিআইয়ের মতামত চাওয়া হয়; যদিও এর পরপরই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। বিএফএসএ অবস্থান পরিবর্তন করে কম্পানির পক্ষে সাফাই গাইতে থাকে।

সূত্র মতে, বিএফএসএর পরীক্ষায় অনিয়মের বিষয়টি উঠে আসার পরপরই ফ্রুট সিরাপ উৎপাদনকারী কম্পানিগুলো জোর তদবির শুরু করে। বিএফএসএর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে মিটিং হয়। সেখানে কম্পানিগুলো জাতীয় মানের বদলে কোডেক্স মানকে প্রাধান্য দিয়ে পণ্য উৎপাদন করেছে বলে ব্যাখ্যা দেয়। আর বিএফএসএ তা মেনেও নেয়।

এই প্রতিবেদক বিএফএসএর কাছে রুহ্ আফজা, বায়োরোজ ও সিনারোজের ল্যাব টেস্টের ফলাফলের তথ্য জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃত তথ্য দেয়নি। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়, বায়োরোজ ও সিনারোজ ফ্রুট সিরাপের উৎপাদন ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা চলমান থাকায় তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী তথ্য প্রদান সম্ভব নয়। মামলা শেষ হওয়ার পর তথ্য দেওয়া যাবে। যদিও বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে লেভেলিং আইন অনুযায়ী চলমান মামলায় পণ্য দুটির ল্যাব টেস্টের তথ্য কেন প্রদান করা যাবে না তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে রুহ্ আফজা ফ্রুট সিরাপের ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফলাফল কোডেক্স মানের সঙ্গে কমপ্লাই করার কথা বলেছে বিএফএসএ। কোডেক্স মান হলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি স্ট্যান্ডার্ড। যেখানে এই মাত্রার কথা বলা রয়েছে ডায়ালেটেড অবস্থায় (পানি বা অন্য কোনো তরলের সঙ্গে মেশানোর পর) ১০০০ মিলিগ্রাম/কেজি। আর বিএসটিআইয়ের বিডিএসে বলা আছে, এটা হতে হবে ১০০ মিলিগ্রাম/কেজি। তবে বিএসটিআইয়ের এ কথায় সামান্য ফাঁক বা ভুল রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের জাতীয় মানে উল্লেখ করা হয়নি এটা মেশানো অবস্থায় সরাসরি না খাওয়ার জন্য।

বিএফএসএ রুহ্ আফজার পক্ষ নিয়ে কথা বললেও কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পণ্যটির গায়ে যে লেবেল রয়েছে তাতে সরাসরি রুহ্ আফজা খাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। যেখানে দুধ, দধির সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ার কথা বলা হচ্ছে, যেটা সরাসরি খাওয়ার শামিল।

যদিও তারা বলছে পানির সঙ্গে মিশ্রণের অনুপাত হবে ১ ঃ ৮। এ বিষয়েও বিএফএসএ কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বরং তাদের পক্ষেই সাফাই গাইছে।  

বিএসটিআইয়ের ফ্রুটস অ্যান্ড ভেজিটেবল প্রডাক্টস টেকনিক্যাল কমিটি একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ করে দিয়েছে। যারা এসব দিক যাচাই-বাছাই করে টেকনিক্যাল কমিটির কাছে সুপারিশ দেবে। টেকনিক্যাল কমিটি অনুমোদন দিলে বিষয়টিতে পরিবতন আসবে।

ওয়ার্কিং গ্রুপের কনভেনর ও বিএফএসএ সদস্য ইকবাল রউফ মামুন বলেন, ‘সোডিয়াম বেনজয়েডের মাত্রা পানিতে মেশানো অবস্থায়, না মেশানোর আগে হিসাব করা হবে সে বিষয়টি জাতীয় মানে উল্লেখ ছিল না। সেটি সংশোধনের কাজ চলছে। আর জাতীয় মানে স্যাকারিনের উল্লেখ না থাকলেও বিএফএসএর প্রবিধানে নির্দিষ্ট মাত্রায় তা ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে। সুতরাং স্যাকারিন নিয়ে সমস্যা নেই। আলাদা করে জাতীয় মানে যোগ করারও দরকার নেই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা