kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস আজ

জাগিয়ে তুলছে প্রতিবন্ধী শিশুপ্রাণ

মৃত্তিকা বিশেষায়িত বিদ্যালয়

নাসরুল আনোয়ার, হাওরাঞ্চল    

৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



জাগিয়ে তুলছে প্রতিবন্ধী শিশুপ্রাণ

বাজিতপুর উপজেলার গোথালিয়ায় তিন বছর আগে প্রতিষ্ঠিত মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী শিশু পাঠশালা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। ছবি : কালের কণ্ঠ

কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর শহরতলির নিভৃত পল্লী গোথালিয়ায় তিন বছর আগে গড়ে ওঠে মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী শিশু পাঠশালা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। সমাজ ও পরিবারে অবহেলিত প্রতিবন্ধী শিশুদের মানসিক বিকাশে কাজ করছে এ শিক্ষালয়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিশুরা এখানে এসে দুই ঠোঁটে বা ইশারায় অ-আ-ক-খ শিখছে। পড়ালেখার পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে বসেই খেলাধুলা করছে। শিক্ষকরা পরম মমতায় আগলে রাখছেন ওদের। পরিবারের প্রতিবন্ধী শিশুটির একরকম ‘সুগতি’ দেখতে পেয়ে অভিভাবকরাও হাঁফ ছাড়ছেন। মৃত্তিকা এভাবেই জাগিয়ে তুলছে প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রাণ।

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর ভোগপাড়ার সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সোহরাব মিয়ার ১৩ বছরের মেয়ে বৃষ্টি শারীরিক প্রতিবন্ধী। জন্ম থেকেই তার পা নেই। টেবিলের ওপর বসে ক্লাস করছিল সে। পাঠশালার প্রথম শ্রেণির ছাত্রী বৃষ্টি কালের কণ্ঠকে জানায়, সে লেখাপড়ার পাশাপাশি কম্পিউটার শেখার স্বপ্ন দেখে। বৃষ্টির মা মেয়ের দুর্গতির কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। বলেন, ‘বৃষ্টি তো আর কিছু করত পারত না! দেহি লেহাফড়াডা শিহাইতাম ফারিনি।’

বাজিতপুরের নবুরিয়া গ্রামের আরশ মির্জার মেয়ে কণিকাও (১৫) প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে। নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিস-এবিলিটি (এনডিডি) আক্রান্ত সে। কণিকার মা জানান, মেয়ের বাবা নেই। মেয়েটিকে নিয়ে ভীষণ বিপাকে আছেন তিনি। মৃত্তিকা পাঠশালায় এ ধরনের শিশুদের লেখাপড়া শেখানো হয় জানতে পেরে তিনি মেয়েটিকে এনে ভর্তি করিয়েছেন।

শ্রেণিকক্ষের ফাঁকা একটি জায়গায় হুইলচেয়ারে বসে বই ঘাঁটছিল বাজিতপুরের গাজীরচর গ্রামের হাবিব মিয়ার ছেলে সোহেল (১৫)। সে শারীরিক প্রতিবন্ধী। মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী শিশু পাঠশালার প্রধান শিক্ষক নূরে হায়াত আফসানা জানান, সোহেল মৃত্তিকা পাঠশালার পুনর্বাসন কেন্দ্রের ছেলে। তাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে পুনর্বাসনে সহায়তা করা হবে। এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে সে ক্ষুদ্র বা মুদি ব্যবসার পাশাপাশি গাভি পালন করতে পারবে।

কটিয়াদীর চরজাকালিয়ার শামীম মিয়ার মেয়ে সামিয়াও (৮) পড়ছে এ শিক্ষালয়ে। সামিয়ার মা ফারজানা আক্তার জানান, সামিয়া কথা বলতে পারে না, বসতেও পারে না। পাঁচ বছরের মোহনার মা জান্নাতুল ইসলামের চোখেও দুনিয়ার স্বপ্ন। বললেন, ‘লেখাপড়া শিখে মেয়েটি যেন নিজের মতো করে চলতে পারে, এটাই চাই।’

পাঠশালা সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিশেষায়িত বিদ্যালয়টি পরিচালনাও করছে ‘মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন’। নানা মাত্রার প্রতিবন্ধীতার শিকার প্রায় ১১৫টি শিশু পড়ছে এখানে। এর মধ্যে অটিস্টিকসহ এনডিডি শিশু রয়েছে ৫৭টি এবং নন-এনডিডি শিশুর সংখ্যা ৫৮। এমন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার খবর পেয়ে দেখতে অস্ট্রেলিয়া থেকে ছুটে এসেছেন বাজিতপুরের ডা. মেহরুল হুদা। তিনি বলেন, ‘এত সংকটের মধ্যেও সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে এমন একটি প্রতিষ্ঠান চলছে, যা অবিশ্বাস্য।’ শিক্ষক-কর্মচারীরা বিনা বেতনে কাজ করছেন শুনে তিনি আক্ষেপ করেন।

মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন, প্রতিবন্ধিতা গবেষক ও লেখক ম. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া জানান, ২০১৪ সালে সরকার প্রতি উপজেলায় একটি বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতির প্রতিশ্রুতি দেয়। একীভূত শিক্ষার পাশাপাশি বিশেষায়িত বিদ্যালয় অনুমোদন না পেলে দেশের মাঝারি ও চরম মাত্রার, বিশেষ করে এনডিডি প্রতিবন্ধী শিশুরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হবে। তিনি মৃত্তিকা শিশু পাঠশালাসহ দেশের সর্বত্র বিশেষায়িত বিদ্যালয় এমপিওভুক্তির দাবি জানান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা