kalerkantho

শনিবার । ২৪ আগস্ট ২০১৯। ৯ ভাদ্র ১৪২৬। ২২ জিলহজ ১৪৪০

অবহেলিত মুক্তিযোদ্ধা

এখন বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করছি

মাহফুজ শাকিল, কুলাউড়া    

৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



এখন বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করছি

হরেন্দ্র দাস

হরেন্দ্র দাস। কুলাউড়া উপজেলার জয়চণ্ডী ইউনিয়নের রংগীরকুল গ্রামের এই বীরসন্তান ১৯৭১ সালে সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিলেন ৪ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল সি আর দত্তের অধীনে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধে গিয়ে পাল্টা আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন। হানাদারদের মর্টার শেলের আঘাত থেকে প্রাণে বেঁচে যান। বাংলাদেশ স্বাধীনের পর সিলেটে অস্ত্র জমা দিয়ে ফেরেন নিজ বাড়িতে।

মর্টার শেলের আঘাত থেকে বাঁচলেও বর্তমানে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে উঠেছে হরেন্দ্র দাসের (৬৫) জন্য। স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে কোনোমতে চলছে সংসার। একে তো বয়সের ভার, তার ওপর শরীরে বেঁধেছে নানা রোগ। এরই মধ্যে ৭ অক্টোবর স্ট্রোক হয় হরেন্দ্র দাসের। বাঁ হাত ও পা দুটি নিস্তেজ হয়ে যায়।

জানা যায়, রংগীরকুল গ্রামের মৃত অষ্টিনী দাসের ছোট ছেলে মুক্তিযোদ্ধা হরেন্দ্র দাস দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে ঠেলাগাড়ি চালিয়ে অনেক কষ্টে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু পক্ষাঘাতে (প্যারালিসিস) আক্রান্ত হওয়ার পর এখন ঠেলাগাড়িও চালাতে পারেন না। তাঁর নিজস্ব জমি নেই। তিন শতক সরকারি জমিতে একটি ঘর বানিয়ে থাকেন সপরিবারে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যে ভাতা (টাকা) পান, তা দিয়ে কোনোমতে একটি ঘর তৈরি করেছেন আর সংসার চালাচ্ছেন। ঘরের কাজ এখনো শেষ হয়নি। ঘরে নেই বিদ্যুৎ। ঘরের পাশ দিয়ে বিদ্যুৎ লাইন গেলেও টাকার অভাবে সংযোগ পাচ্ছেন না। কিভাবে স্বামীর চিকিৎসা হবে আর খেয়ে বাঁচবেন সেই দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরেছে স্ত্রী শেফালী দাসকে।

১ ডিসেম্বর হরেন্দ্র দাসের বাড়িতে গেলে দেখা যায়, তিনি ঘরের বারান্দায় একটি চেয়ারে বসে আছেন। মেয়ে গীতা দাস বাবার পায়ে ওষুধ লাগাচ্ছেন। গীতা জানান, ৭ অক্টোবর রাত ২টার দিকে স্ট্রোক হয় হরেন্দ্র দাসের। রাতেই তাঁকে সিলেটের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. শাকির আহমেদ শাহিনের অধীনে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসার পর ১৫ অক্টোবর রাতে তাঁকে বাড়িতে আনা হয়। চিকিৎসক বলেছিলেন আরো কিছুদিন হাসপাতালে থাকতে। কিন্তু টাকার অভাবে তা সম্ভব হয়নি। ধার করে হাসপাতালের ১১ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করেছেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে হরেন্দ্র দাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একাত্তরে যুদ্ধ করেছি দেশের জন্য, আর এখন যুদ্ধ করছি বেঁচে থাকার জন্য। কিন্তু ভালো কিছু খাবার বা কেনার সুযোগ হয় না। আমার বাড়ি থেকে বাইরে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। একটি বাঁশের সাঁকো দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করতে হয়। আমার ঘরে বিদ্যুৎ নেই। এসব চিন্তা করলে আমার মনে অনেক পীড়া দেয়। রাস্তা ও বিদ্যুৎ সমস্যা নিয়ে তিন বছর আগে জয়চণ্ডী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কমরউদ্দিন আহমদ কমরু ও উপজেলা ভারপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সুশীল দেকে জানিয়েছি। কিন্তু এখনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’

জয়চণ্ডী ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সাবেক ডেপুটি কমান্ডার অমর আতিক বলেন, ‘হরেন্দ্র দাস একজন অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা।  কেউ তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি। আমি হরেন্দ্র দাসের চিকিৎসার কাগজপত্র নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতেছি।’

কুলাউড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আসম কামরুল ইসলাম বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে মুক্তিযোদ্ধা হরেন্দ্র দাসের বাড়িতে বিদ্যুৎ ও রাস্তার ব্যবস্থা করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’

মন্তব্য