kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

বায়োমেট্রিক ডাটাবেইস দিয়েও ঠেকানো যাচ্ছে না জালিয়াতি

নিবন্ধনের বাইরে সাড়ে তিন লাখ রোহিঙ্গা

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বায়োমেট্রিক ডাটাবেইস দিয়েও ঠেকানো যাচ্ছে না জালিয়াতি

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দেশের ভেতর ছড়িয়ে পড়া এবং স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে যাওয়া ঠেকাতে একটি বায়োমেট্রিক ডাটাবেইস তৈরি করা হয়েছে। ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার আঙুলের ছাপ নিয়ে এ বায়োমেট্রিক ডাটাবেইস তৈরি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ ডাটাবেইস থাকা সত্ত্বেও রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্ট জালিয়াতি ঠেকানো যাচ্ছে না।

জানা গেছে, এখনো বায়োমেট্রিক ডাটাবেইসের বাইরে রয়েছে সাড়ে তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা। তারা মূলত আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম। তারাই জালিয়াতির মাধ্যমে পাসপোর্ট ও এনআইডি সংগ্রহে মরিয়া হয়ে উঠেছে। সে কারণে তাদের শনাক্ত করতে সন্দেহই একমাত্র ভরসা।

এ ছাড়া পাসপোর্ট ও নির্বাচন কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, ২০১৬ সালের আগে আসা রোহিঙ্গারা ডাটাবেইসের বাইরে থাকায় রোহিঙ্গা শনাক্তে বায়োমেট্রিকের খুব বেশি সুফল মিলছে না।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত চট্টগ্রামের দুটি পাসপোর্ট অফিসে মোট ১২৬ জনকে রোহিঙ্গা সন্দেহে আটক করা হয়। এর মধ্যে সাইফুল নামের মাত্র একজনকে রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরি করা বায়োমেট্রিক ডাটাবেইসের মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তায় রোহিঙ্গাদের ডাটাবেইস তৈরি করে পাসপোর্ট অধিদপ্তর। এ কাজে সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের তৎকালীন উপপরিচালক আবু নোমান মো. জাকির হোসেন। বর্তমানে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক (অর্থ ও নিরীক্ষা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক ডাটাবেইস তৈরি প্রসঙ্গে আবু নোমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা ডাটাবেইসটি তৈরির কাজ মূলত ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি শুরু হয়। ওই সময় কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের তথ্য ও আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়। মূলত ২০১৬ সাল থেকে আসা রোহিঙ্গাদের তথ্য এ ডাটাবেইসে আপলোড করা হয়।’ সব মিলিয়ে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার তথ্য বায়োমেট্রিক ডাটাবেইসে সংরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু এর আগে আসা রোহিঙ্গাদের এ ডাটাবেইসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে তিনি জানান।

এ ডাটাবেইস ব্যবহার করেই রোহিঙ্গাদের এনআইডি ও পাসপোর্ট জালিয়াতি ঠেকানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অবশেষে গত ২৪ জুলাই বায়োমেট্রিক ডাটাবেইসটি সংযুক্ত করা হয়েছে পাসপোর্ট অধিদপ্তর ও নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সার্ভারের সঙ্গে। তবে কৌশলে বায়োমেট্রিক পদ্ধতির বাইরে থাকা তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশি পাসপোর্ট ও এনআইডি নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, চান্দগাঁও চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৭২ জনকে রোহিঙ্গা সন্দেহে আটক করা হয়। তাদের কারো আঙুলের ছাপ বায়োমেট্রিক ডাটাবেইসের সঙ্গে মেলেনি।

এ অফিসের উপপরিচালক মো. আল আমিন মৃধা কালের কণ্ঠকে বলেন, যারা পাসপোর্ট করতে আসে, তারা মূলত রোহিঙ্গাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম। অর্থাৎ ১৯৯২-৯৩ সালের দিকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের পর যাদের জন্ম, তাদের চিহ্নিত করা খুব কঠিন। কারণ এ প্রজন্ম বাংলায় পড়ালেখা জানে। চট্টগ্রামের স্থানীয় ভাষা যেমন জানে, তেমনি শুদ্ধ বাংলাও বলতে পারে। তাদের চেহারা, গায়ের রং, উচ্চতা কোনো কিছুতেই চট্টগ্রামের স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আলাদা করা যায় না।

এ কর্মকর্তা বলেন, এর পরও রোহিঙ্গা শনাক্তে চট্টগ্রামের ভাষায় পারদর্শী একজন উচ্চমান সহকারী ও একজন ডাটা এন্ট্রি অপারেটর নিয়োজিত রয়েছেন। তাঁরা স্থানীয় ও রোহিঙ্গা ভাষা আলাদা করতে পারেন। কাউকে বিন্দুমাত্র সন্দেহ হলেই জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পাসপোর্ট করার জন্য দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী যোগাযোগ করে প্রকৃত পরিচয় জানার চেষ্টা করা হয়। চট্টগ্রামে রোহিঙ্গা হিসেবে সন্দেহভাজনদের বেশির ভাগ বাঁশখালী, লোহাগাড়া ও পটিয়া উপজেলার বলে আল আমিন মৃধা জানান।

একই কথা বলেন চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মনির হোসাইন খান। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা বায়োমেট্রিক ডাটাবেইস দিয়ে নতুন রোহিঙ্গাদের কেউ এনআইডি করাতে এলে আমরা আঙুলের ছাপ দিয়ে সেটা শনাক্ত করতে পারব। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যাদের রোহিঙ্গা হিসেবে ধরা হচ্ছে, তাদের প্রায় সবাই অনেক আগে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। অনেকের মা-বাবা এ দেশে এসেছে। এখন বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া সন্তানরা এনআইডি ও ভোটার তালিকায় নাম তুলতে তৎপর। এ জেনারেশনটি অনেক আগেই ক্যাম্প থেকে বের হয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে বায়োমেট্রিকের পুরো সুফল পাচ্ছি না।’

এ অবস্থায় বায়োমেট্রিক ডাটাবেইস থেকে বাদ পড়া রোহিঙ্গাদের পুনরায় নিবন্ধনের আওতায় আনা গেলে এ সমস্যা থেকে রেহাই মিলবে বলে মনে করেন সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) চট্টগ্রাম জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট আকতার কবীর চৌধুরী। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘কোনো রোহিঙ্গাই যেন তালিকার বাইরে না থাকে। অন্যথায় তারা দেশের জন্য বিষফোড়া হয়ে উঠবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা