kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

ছেলেহারা এক মায়ের ক্ষোভ হতাশা

‘বিচার চাই না, জানতে চাই কী ঘটছে তার কপালে’

আশরাফ-উল-আলম   

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘বিচার চাই না, জানতে চাই কী ঘটছে তার কপালে’

‘এক বছর ১০ মাস আগে ছেলেরে নিয়া গ্যাছে। সেই থ্যাইক্যা নিখোঁজ। আর পাব কি না জানি না। কিন্তু জানতে চাই কী ঘটছে তার কপালে।’ যিনি এই আর্তি জানান, তাঁর বয়স হয়েছে। ছেলে অপহৃত হওয়ার মামলার হাজিরা দিতে তিনি গত ১২ সেপ্টেম্বর ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এসেছিলেন। নাম জমিলা বেগম। ঢাকার সাভার থানার ভবানীপুর গ্রামের বাসিন্দা। কালের কণ্ঠকে জমিলা জানান, তাঁর স্বামী মৃত। একমাত্র ছেলে মো. রাসেল মাদরাসায় পড়াশোনার পাশাপাশি রাজফুলবাড়িয়া এলাকায় দিলুকা ফ্যাশন গার্মেন্টের সামনে চায়ের দোকান চালাতেন। কিছু টাকা জমিয়ে ও  ধারদেনা করে একপর্যায়ে দুটি বাস কেনেন। রাসেল এন্টারপ্রাইজ নামে বাস দুটি ঢাকা-রংপুর রোডে চলাচল করত। এই ব্যবসা সূত্রেই রাসেলের জীবন নিরাপত্তাহীন হয়।

জমিলা বেগম জানান, রাসেল পরিবহন ব্যবসা করে ধীরে ধীরে দেনা পরিশোধ করে আসছিলেন। কিন্তু পাওনাদাররা টাকা একসঙ্গে পরিশোধের জন্য চাপ দিচ্ছিল। ২০১৬ সালের ১৫ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় কয়েক ব্যক্তি রাসেলের দুটি বাস আটকে রাখে, রাসেলকেও ধরে নিয়ে যায়। তারা বড়দেশী আমিনবাজারের মাছের হাটের গলিতে একটি ভবনের তিনতলায় রাসেলকে আটকে রেখে জমিলা বেগমকে খবর দেয়। জমিলা বেগম গিয়ে দেখেন গাড়ি ব্যবসায়ী আবু, গিয়াস উদ্দিন, আলমগীর, আলমাস, অনিক ও মাহাবুব নামের ছয়জন উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা মা-ছেলে দুজনকেই মারধর করে তাঁদের কাছ থেকে বিভিন্ন কাগজপত্রে স্বাক্ষর নেন। তাঁরা জমিলা বেগমকে ছেড়ে দিয়ে রাসেলকে রেখে দেন। এরপর আর রাসেল ফিরে আসেননি।

জমিলা বেগম জানান, তিনি তিন দিন ছেলের অপেক্ষায় থেকে সাভার থানায় যান এবং পুলিশের সহযোগিতা চান। কিন্তু পুলিশ মামলা নেয়নি বা কোনো সহায়তা দেয়নি। জমিলা বেগম বলেন, প্রায় এক বছর ধরে থানা-পুলিশের পেছনে ঘুরে গত বছরের ২৬ নভেম্বর ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অপহরণ, গুম ও হত্যার অভিযোগ এনে ছয়জনের বিরুদ্ধে তিনি মামলা করেন। আদালত অভিযোগ তদন্তের জন্য সাভার থানার ওসিকে নির্দেশ দেন।

ঘটনাস্থল ‘অস্তিত্বহীন’ : এসআই মো. আবিদ হোসেন খান তদন্ত করে গত ৫ মে তিনি আদালতে প্রতিবেদন দিয়ে জানান, রাসেল মামলার আসামি গিয়াস উদ্দিনের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা ঋণ নেন। ঋণের কিস্তি শোধ না করে গিয়াস উদ্দিনকে একটি চেক দেন রাসেল। মামলাও হয়। আসামি অনিকের কাছ থেকেও এক লাখ টাকা ঋণ নেন রাসেল। আর আসামি মাহাবুবের সঙ্গে যৌথ ব্যবসা করতেন রাসেল। এসব দেনা-পাওনা নিয়ে বিভিন্ন স্থানে সালিস বৈঠক হয়। তদন্ত কর্মকর্তা এসব তথ্য উল্লেখ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে বলেন, বাদী জমিলার অভিযোগের সমর্থনে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি রাসেলকে কোথায় নিয়ে আটক রাখা হয় সেই ঘটনাস্থলটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সিআইডিতে গেলেও নিষ্ক্রিয় : জমিলা বেগম গত ২ জুলাই নারাজি আবেদন দিয়ে বলেন, আসামিরা প্রভাবশালী। এ কারণে তদন্ত কর্মকর্তা প্রভাবিত হয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন। রাসেল গাড়ি বিক্রি করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হলেও কার কাছে বিক্রি করেছেন, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। নারাজি আবেদনের শুনানি শেষে আদালত ঘটনাটি তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন।

তদন্তকারী কে বাদীর অজানা : সিআইডিকে তদন্তে পাঠানোর পর এ মামলার তদন্ত কে করছেন দুই মাসেও জানতে পারেননি জমিলা বেগম। কেউ যোগাযোগও করেননি। জমিলা বেগম বলেন, ‘আমাকে সিআইডির কেউ এখনো জিজ্ঞাসাবাদ করেননি। আমি জানি না কে তদন্ত করছেন। শুনেছি, মালিবাগে সিআইডি অফিস। আমি চিনি না। তাই সেখানে যেতেও পারিনি।’

আদালতের নথি থেকে দেখা গেছে, সিআইডি অফিস কাকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে, তা নথিতে উল্লেখ নেই। এমনকি তদন্তের কোনো অগ্রগতির খবরকে আদালতকে জানানো হয়নি। চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অতিরিক্ত পিপি আনোয়ারুল কবীর বাবুল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আদালত সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্ত হবে। তদন্ত প্রতিবেদনও আদালতে দাখিল করবেন। তবে তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতকে জানানো উচিত। বাদীর ছেলে প্রায় দুই বছর ধরে নিখোঁজ। এটা মানবিক কারণ হিসেবে দেখা উচিত।’

জমিলা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, মামলার পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে তিনি ক্লান্ত। তিনি এখন অসহায়। তিনি এখন শুধু সন্তানের খবরটি জানতে চান। জমিলা বলেন, ‘আমি বিচার চাই না। সন্তানটাকে চাই।’

 

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা