kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

‘খোদেজার আত্মা শান্তি পাইবো’

ট্রাকচালকের ফাঁসির আদেশ

তায়েফুর রহমান, সাভার   

২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘খোদেজার আত্মা

শান্তি পাইবো’

ঢাকার সাভার উপজেলার ঝাউচরে ট্রাকচাপা দিয়ে খোদেজা বেগম (৩৮) নামের এক নারীকে হত্যার দায়ে ট্রাকচালককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর কালের কণ্ঠ’র কাছে প্রতিক্রিয়ায় ওই নারীর স্বামী মো. নুরু গাজী (৬০) দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অহন যতো তাড়াতাড়ি এই রায় কার্যকর হইবো, ততোই ভালো। এতে খোদেজার আত্মাও শান্তি পাইবো।’

নুরু গাজী বলেন, ‘১৪ বছর ধইরা আদালতের বারান্দায় না খাইয়াদাইয়া ঘুইরা বেড়াইছি। অহন আল্লাহ আমাদের দিকে মুখ তুইল্লা চাইছে। আদালত মিরু ড্রাইভারকে ফাঁসি দিছে। এই রায়ে আমি ও আমার ছেলে-মেয়েরা সন্তুষ্ট। আমার স্ত্রী হত্যার ঘটনার বিচার হওয়ায় অন্য কোনো ট্রাকচালক ভবিষ্যতে আর এমন অপরাধ করার সাহস পাইবো না।’

গত সোমবার ঢাকার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রদীপ কুমার রায় ট্রাকচাপা দিয়ে খোদেজা হত্যা মামলার রায় দেন।

মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে জানা যায়, ২০০৩ সালের ২০ জুন সাভারে ট্যানারি শিল্পনগরীসংলগ্ন ঝাউচর এলাকায় ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে নিহত হন নুরু গাজীর স্ত্রী খোদেজা বেগম। ঘটনার পর নুরু গাজী বাদী হয়ে সাভার থানায় ট্রাকচালক মীর হোসেন ওরফে মীরু, তার সহকারী ইমতাজ আলী ও ট্রাক মালিক মনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পুলিশ তদন্ত শেষে ২০০৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ট্রাকচালক মীর হোসেন ও ইমতাজের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ট্রাক মালিক মনোয়ার হোসেনের কোনো সংশ্লিষ্টতা না পেয়ে তাঁকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদন জানায়। পরের বছর ৪ এপ্রিল আদালত দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। ১৩ জন সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়ার পর গত সোমবার আদালত ট্রাকচালক মীর হোসেন মীরুকে মৃত্যুদণ্ড ও তার সহকারী ইমতাজ আলীকে খালাস দেন।

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ঝাউচরে নুরু গাজীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিবেশীরা তাঁর বাড়িতে এসে ভিড় জমাচ্ছে। ১৪ বছর আগে তিনি যে কাঁচা ঘরটিতে থাকতেন সেটি এখন চারদিকে দেয়াল দিয়ে ওপরে টিনের শেড নির্মাণ করেছেন। তিনি ওই ঘরের পাশেই আরো একটি টিনশেড বাড়ি নির্মাণ করে দুই ছেলেসন্তান নিয়ে বসবাস করেন। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। বাড়ির পাশেই তিনি একটি মাদরাসাও করেছেন।

অন্যদিকে নুরু গাজীর বাড়িতে যাওয়া ও আসার পথে বিভিন্ন স্থানে পরিবহন শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ করতে দেখা যায়। ট্রাকচালক মীর হোসেন মীরুকে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রতিবাদে তারা এ অবরোধ করেছে বলে জানিয়েছে পরিবহন শ্রমিকরা। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কসহ হেমায়েতপুরের ঝাউচর এলাকার কোনো সড়কে কোনো ধরনের যানবাহন চলতে দেয়নি তারা।

খোদেজার স্বামী ও তাঁর প্রতিবেশীরা জানায়, দণ্ডিত মীরু ও মামলার বাদী নুরু দুজনই ঝাউচর এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা। ঘটনার দিন নুরু গাজীর বাড়ির সামনের পারিবারিক রাস্তা দিয়ে ট্রাকে করে মাটি পরিবহনের কাজ করছিল মীরু। একপর্যায়ে নুরু ও খোদেজা দম্পতি ওই রাস্তা দিয়ে ট্রাকে মাটি পরিবহনে বাধা দেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বাগিবতণ্ডা শুরু হয়। তখন স্বামী-স্ত্রী দুজন মীরুর ট্রাকের সামনে দাঁড়িয়ে যান। এ সময় ট্রাকচালক তাঁদের উদ্দেশে বলে, ‘গাড়ির সামনে থেকে সরে দাঁড়া, নইলে গাড়ি তোদের ওপর তুলে দেব।’ প্রতিবেশীরা ছুটে এসে তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। মীরু তখন ট্রাক চালিয়ে দিলে নুরু গাজী লাফ দিয়ে সরে যেতে সমর্থ হলেও তাঁর স্ত্রী খোদেজা বেগম পিষ্ট হন। তাঁর মাথা থেঁতলে যায় এবং তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।

নুরু গাজী দাবি করেন, রায় ঘোষণার পরও মীরুর লোকজন তাঁদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। ১৯৯৭ সালের ২৩ নভেম্বর তাঁর মেয়ে নার্গিস আক্তারকে কয়েকজন দুর্বৃত্ত গলায় ওড়না পেঁচিয়ে হত্যা করে তাঁদের বাড়ির পাশের একটি ক্ষেতে ফেলে রেখে যায়।