kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

সপ্তম জাতীয় ফিজিকস অলিম্পিয়াড চূড়ান্ত পর্ব শুরু

খুদে বিজ্ঞানীদের মিলনমেলা

নাদিম মজিদ   

২১ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



খুদে বিজ্ঞানীদের মিলনমেলা

গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল চত্বরে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক সপ্তম বাংলাদেশ ফিজিকস অলিম্পিয়াডের উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। ছবি : কালের কণ্ঠ

খুদে শিক্ষার্থীদের কলকাকলিতে মুখরিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের মাঠ থেকে শীত পালিয়ে গেছে সকাল হতে না হতেই। সকাল ১০টায় উদ্বোধন হওয়ার কথা দুই দিনব্যাপী ডাচ্- বাংলা ব্যাংক সপ্তম বাংলাদেশ ফিজিকস অলিম্পিয়াডের। কিন্তু সকাল ৭টার মধ্যেই মাঠ ভরে গেছে সারা দেশ থেকে আসা পদার্থবিদ্যা পিপাসু শিক্ষার্থীদের পদচারণে। এভাবে অন্য আট-দশটা দিন থেকে একটু ভিন্নভাবে শুরু হয়েছিল গতকালের কার্জন হলে চত্বরের সকালটি।

বিজ্ঞাপন

  দিনব্যাপী এই উৎসবে প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী বিজ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ ফিজিকস অলিম্পিয়াডের চূড়ান্ত্ম পর্বে অংশ নেয়। গত এক মাসে সারা দেশে অনুষ্ঠিত হওয়া আঞ্চলিক পর্বে বিজয়ীরা উপস্থিত হয় এ অলিম্পিয়াডে। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে থেকে শুরু হয় রিপোর্টিং ও রেজিস্ট্রেশন। আঞ্চলিক পর্বে বিজয়ীরা অঞ্চলভিত্তিক রেজিস্ট্রেশন বুথে তাদের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করে।

চট্টগ্রাম থেকে এসেছেন ফাইরুজ ইশরাক। পড়েন চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে। এত দূর থেকে জাতীয় পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অংশ নিতে পেরে দীর্ঘ পথের ক্লান্তি যেন নিমেষেই উধাও। খুদে শিক্ষার্থীদের এই আনন্দে সঙ্গী হতে সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চলে এসেছেন অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন যাবেন চট্টগ্রামের একটি অনুষ্ঠানে। দুপুর ১২টায় তাঁর ফ্লাইট। হাতে একদম সময় নেই। তিনিও ছুটে এসেছেন যেটুকু সময় পাওয়া যায় খুদে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সময় কাটাবেন। এসেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক প্রমুখ।

শিক্ষার্থী ও অতিথিরা সবাই মিলে সকাল সাড়ে ১০টায় সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত গাওয়ার পর বেলুন উড়িয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, বাংলাদেশ ফিজিকস অলিম্পিয়াড কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আবদুস ছাত্তার। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ফিজিকস অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. খোরশেদ আহমেদ কবির।

সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রাণবন্ত আলোচনা পর্বে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘বর্তমানে বেশ কয়েক বছর থেকে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় (পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, গণিত) নিয়ে অলিম্পিয়াড শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে আমাদের শিক্ষার্থীরা অনেক নতুন নতুন বিষয় শিখতে পারছে এবং পরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। ’ তাদের ভেতরে আমাদের ভবিষ্যৎ নিহিত রয়েছে বলে জানান তিনি।

ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘মানুষ হওয়ার জন্য আমাদের প্রয়োজন শিক্ষা। একটি হাতির বাচ্চা হাতি হয়েই জন্ম নেয়। বাঘের বাচ্চা বাঘ হয়ে জন্ম নেয়। কিন্তু আমরা মানুষ হয়ে জন্মাবার পরও আমাদের গুরুজনরা আমাদের মানুষ হওয়ার কথা বলেন। কারণ শুধুমাত্র মানুষ হয়ে জন্মালেই মানুষ হওয়া যায় না। মানুষ হওয়ার জন্য প্রয়োজন শিক্ষা। ’ তিনি বলেন, সবাইকে সাহিত্য পড়তে হবে, বিজ্ঞান পড়তে হবে। সাহিত্য ও বিজ্ঞানের আলোয় একদিন বাংলাদেশ আলোকিত হবে, যা ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বময়।

আরেফিন সিদ্দিক বলেন, কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য পুরস্কারপ্রাপ্তি নয়। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সবার প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত একজন ভালো মানুষ হওয়া। সেই লক্ষ্য নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে জাফর ইকবাল বলেন, ‘তোমরা জিপিএ ৫, গোল্ডেন জিপিএ ৫-এর পেছনে দৌড়ানো বন্ধ করো। তোমরা যেটা পড়বে, সেটা বোঝার চেষ্টা করো, শেখার চেষ্টা করো। তাহলে দেখবে জিপিএ ৫ তোমার পেছনে দৌড়াচ্ছে। তোমরা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য পড়াশোনা করবে না, শেখার জন্য পড়াশোনা করবে, দেখবে পড়াশোনার মধ্যে কত আনন্দ। ’ পদার্থবিজ্ঞানের মতো এমন মজার বিষয় আর হতে পারে না বলেও অভিহিত করেন তিনি। তোমরা বাংলাদেশের সবচেয়ে মেধাবী, পরিশ্রমী এবং আগামী দিনের বিজ্ঞানী। তোমরাই একদিন আমাদের দেশের জন্য সুনাম বয়ে নিয়ে আসবে।

বাংলাদেশ ফিজিকস অলিম্পিয়াডের সভাপতি অধ্যাপক ড. খোরশেদ আহমেদ কবির জানান, সপ্তমবারের মতো বাংলাদেশ ফিজিকস অলিম্পিয়াডের চূড়ান্ত পর্ব হচ্ছে। এত বড় আয়োজনের পৃষ্ঠপোষকতা করার জন্য ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেড এবং মিডিয়া পার্টনার হওয়ার জন্য কালের কণ্ঠ’র প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।

ফিজিকস অলিম্পিয়াডের উদ্বোধনের পর সকাল সাড়ে ১১টা থেকে প্রযুক্তি মেলা শুরু হয়। প্রযুক্তি মেলায় দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মোট ১১টি দলের স্টল স্থান পায়। দুপুর ২টা থেকে শুরু হয় ফিজিকস অলিম্পিয়াডের পরীক্ষা। চলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।

বাংলাদেশ ফিজিকস অলিম্পিয়াড কমিটির সাধারণ সম্পাদক এফ এ জাহাঙ্গীর মাসুদ জানান, এ বছর ১২টি জেলায় বাংলাদেশ ফিজিকস অলিম্পিয়াডের আঞ্চলিক পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে। সপ্তম-অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ‘এ’ ক্যাটাগরি, নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ‘বি’ ক্যাটাগরি এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ‘সি’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করে এ অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আঞ্চলিক পর্বে ১০ সহস্রাধিক প্রতিযোগী অংশ নেয়। তাদের মধ্য থেকে আঞ্চলিক পরীক্ষা বিবেচনায় ৪৫০ জন চূড়ান্ত পর্বে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছে। আগামীকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে প্রতিটি ক্যাটাগরি থেকে ২০ জন করে মোট ৬০ জনকে জাতীয় পর্বে পুরস্কৃত করা হবে। এ বছর বিজয়ীদের মধ্য থেকে পাঁচজন প্রতিযোগী ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক ফিজিকস অলিম্পিয়াড এবং আটজন প্রতিযোগী রাশিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য এশিয়ান ফিজিকস অলিম্পিয়াডে অংশ নেবে।

আজ শনিবার সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে শুরু হবে প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং বিজয়ীদের পুরস্কার বিতরণ করা হবে।  

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ফিজিকস অলিম্পিয়াডের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেড, মিডিয়া পার্টনার কালের কণ্ঠ এবং ইভেন্ট পার্টনার কালের কণ্ঠ শুভসংঘ।



সাতদিনের সেরা