kalerkantho

শনিবার ।  ২১ মে ২০২২ । ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৯ শাওয়াল ১৪৪৩  

গোলটেবিলে আলোচকদের অভিমত

আর্সেনিক বিষ থেকে পানি ও খাদ্যচক্র সুরক্ষা জরুরি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আর্সেনিক বিষ থেকে পানি ও খাদ্যচক্র সুরক্ষা জরুরি

ইডাব্লিউএমজিএল মিলনায়তনে ‘আর্সেনিক : জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকবৃন্দ। ছবি : কালের কণ্ঠ

আর্সেনিকের বিষক্রিয়া থেকে পানি ও খাদ্যচক্রকে সুরক্ষা দিতে রাজনৈতিক অবস্থান আরো জোরালো করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে নিরাপদ পানির সংস্থান বাড়ানো ও মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির কার্যক্রম নিতে হবে। পাশাপাশি আর্সেনিকোসিসে আক্রান্তদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা জোরদার করাটাও জরুরি। ‘আর্সেনিক : জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকরা এই অভিমত তুলে ধরেছেন।

বিজ্ঞাপন

কালের কণ্ঠ, আর্সেনিক মিটিগেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (এএমআরএফ) ও ওয়াটার এইড বাংলাদেশ যৌথভাবে গতকাল মঙ্গলবার এই বৈঠকের আয়োজন করে। এতে অংশ নিয়ে আলোচকরা বলেন, আর্সেনিক সমস্যাটি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার আড়ালে পড়ে ছিল। কিন্তু তাই বলে আর্সেনিকের প্রভাব থেমে থাকেনি। বরং তা অনেক বেশি বিস্তৃত হয়েছে। তাই সময় এসেছে ইস্যুটিকে জনস্বাস্থ্যের স্বার্থেই জোরালোভাবে প্রচারের আলোয় নিয়ে আসা।

ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন। ভূগর্ভস্থ পানি ও আর্সেনিকের ঝুঁকি বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও এএমআরএফের উপদেষ্টা ড. কাজী মতিন উদ্দীন আহম্মেদ। স্বাগত বক্তব্য দেন এএমআরএফের নির্বাহী পরিচালক ডা. ফারিবা মাসুদ।

অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আরো আলোচনা করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (এনসিডি) ডা. ফারুক আহম্মেদ ভূইয়া, ওয়াটার এইড বাংলাদেশের প্রধান ডা. খাইরুল ইসলাম, এএমআরএফের সহকারী দেশীয় প্রতিনিধি ডা. জাহেদ মো. মাসুদ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক মো. মোস্তফা, প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন বাংলাদেশের পরিচালক হাসিন জাহান, ব্র্যাকের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিভাগের প্রধান ডা. মাহফুজুর রহমান, ওয়াটার এইড বাংলাদেশের পলিসি ও অ্যাডভোকেসি বিভাগের প্রধান সামিয়া আহমেদ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ঢাকার নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুর রহমান, মুন্সীগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ সাদী রহমত উল্লাহ, মেহেরপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মুন্সি মো. হাসানুজ্জামান, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি তৌফিক মারুফ প্রমুখ।

বৈঠকে কালের কণ্ঠ সম্পাদক বলেন, ‘আর্সেনিকের ঝুঁকি থেকে মানুষকে রক্ষায় সরকারি ও বেসরকারি যেসব উদ্যোগ চলছে তা আরো গতিশীল হওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন মানুষের সচেতনতার মাত্রা আরো বাড়ানো। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের কর্মীদেরও আরো সজাগ হতে হবে। ’ তিনি বলেন, ‘মুন্সীগঞ্জের মতো জায়গায় এখনো যদি নারীদের নিরাপদ পানির জন্য এক-দেড় মাইল দূরে যেতে হয় তা খুবই অবাক হওয়ার মতো বিষয়। মাঠপর্যায়ের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাকে জনমানুষের জন্য আরো সহজ করে দিতে হবে। ’

মূল প্রবন্ধে তথ্য তুলে ধরে ড. কাজী মতিন উদ্দীন আহম্মেদ জানান, ‘দেশে আর্সেনিকে আক্রান্তদের ৬৩ শতাংশই নারী। আর ৪১ থেকে ৬০ বছর বয়সের মানুষই আর্সেনিকোসিসে বেশি আক্রান্ত হয় বলে আমাদের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে। ’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক বলেন, ‘আর্সেনিকের বিষক্রিয়ার প্রভাব বাংলাদেশে আছে। মানুষ আক্রান্তও হচ্ছে। তবে তাতে এখনো বড় কোনো ভয়ের কারণ নেই। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আর্সেনিকোসিসে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা আগের চেয়ে অনেক বিস্তৃত হয়েছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়েও এখন চর্ম রোগের চিকিৎসক রয়েছেন, যাঁরা এর প্রাথমিক পর্যায়ে সেবা দিতে পারেন। ’ ওই কর্মকর্তা জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে ইতিমধ্যে আর্সেনিকোসিস নিয়ন্ত্রণ ও এর থেকে সুরক্ষায় গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে।

ডা. খাইরুল ইসলাম বলেন, ‘কেবল পানি নয়, খাদ্যচক্রেও মারাত্মকভাবে আর্সেনিক ঢুকে পড়েছে। তাই মুক্ত নিরাপদ পানির সংস্থানে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি খুবই জরুরি। তা না হলে কোনো সিদ্ধান্ত বা আলোচনা-পর্যালোচনাই কাজে দেবে না। ’ তিনি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রতি দাবি তুলে ধরে বলেন, ২০০৮ সালের মতোই আগামী জাতীয় নির্বাচনেও যেন তাদের দলীয় ইশতেহারে আর্সেনিকমুক্ত দেশ ও নিরাপদ পানির সংস্থানের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা রাখা হয়।

একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী এবং সচিবকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তাঁদের উদ্যোগেই সরকার নিরাপদ পানির জন্য ১৮ শ কোটি টাকার বিশেষ কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এই উদ্যোগের বাস্তবায়ন হলে মানুষ অনেক বেশি উপকৃত হবে। ’

ডা. জাহেদ মো. মাসুদ বলেন, আর্সেনিকোসিসে আক্রান্তদের চিকিৎসায় দেশ এখনো পিছিয়ে আছে। এই ব্যবস্থাপনা আরো বাড়ানো দরকার। ’ তিনি বলেন, ‘নিরাপদ পানি আর আর্সেনিকমুক্ত পানি এক কথা নয়। দুটি বিষয়কে এক করে ফেললে চলবে না। তা ছাড়া আর্সেনিকোসিস থেকে এখন ক্যান্সারের মতো ভয়ানক রোগের প্রকোপ বেড়ে যাচ্ছে। ’

ডা. ফারিবা মাসুদ বলেন, নদীভাঙনের কবলে পড়ে ভাসমান বা দারিদ্র্যের শিকার মানুষের মধ্যে আর্সেনিকের বিপদের মাত্রা বেশি। বিশেষ করে মুন্সীগঞ্জের কোনো কোনো এলাকায় এর প্রকোপ খুবই মারাত্মক। কিন্তু সেই তুলনায় চিকিৎসা ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থাপনা অনেক কম। একই সঙ্গে কয়েক বছর ধরে আর্সেনিকের বিষয়টি বিভিন্ন কারণে চাপা পড়ে থাকায় মানুষ এর ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকতে পারছে না। এর ফলে অজান্তেই তারা বিপদের মুখে পড়ছে। সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের এ অবস্থা থেকে রক্ষায় সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।



সাতদিনের সেরা