kalerkantho

সোমবার । ২৪ জুন ২০১৯। ১০ আষাঢ় ১৪২৬। ২০ শাওয়াল ১৪৪০

সংস্কৃতি

চিত্রকে বর্ণিল দৃশ্যকাব্য

নওশাদ জামিল   

২২ আগস্ট, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চিত্রকে বর্ণিল দৃশ্যকাব্য

মনজুড়ানো দৃশ্য। চারদিকে সবুজ আর সুবজ। সড়কের দুই পাশে কচি ধানের সবুজ প্রান্তর। ক্ষেতের বুক চিরে আইলপথ। ছাগলের পাল ছুটে চলছে সেই পথ ধরে। পেছনে লাঠি হাতে মাথায় গামছা বাঁধা রাখাল ছেলে। আবহমান গ্রামবাংলার এই চিরচেনা দৃশ্যের দেখা মিলল রাজধানীর ধানমণ্ডির গ্যালারি চিত্রকে। সবুজ-শ্যামল গ্রাম থেকে শহুরে ব্যস্ত জীবন, নদীর বহমানতা, সবুজ গাছগাছালির নির্জনতা কিংবা নিসর্গের নিমগ্নতার নানা দৃশ্যের বৈভব ছড়িয়ে রয়েছে প্রদর্শনালয়টির দেয়ালজুড়ে। প্রতিটি চিত্রকর্মই চিত্রিত হয়েছে জলরঙের আশ্রয়ে। একেকটি ক্যানভাস যেন দৃশ্যকাব্য হয়ে উঠেছে। আর বর্ণিল ছবিগুলো এঁকেছেন কানাডাপ্রবাসী চিত্রশিল্পী হেলাল উদ্দিন। সেসব চিত্রকর্ম নিয়ে চিত্রকে চলছে প্রদর্শনী। শিরোনাম 'ভয়েজ অব নেচার'।

শরতের বৃষ্টিভেজা বিকেলে গতকাল শুক্রবার এ প্রদর্শনী ঘুরে দেখা যায়, বহু বিচিত্র বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন এই শিল্পী। বিদেশে বসবাস করলেও তাঁর শিল্পীমন পড়ে আছে এ বাংলায়। সবুজ প্রকৃতি, ধানক্ষেত, নদ-নদীর অপূর্ব দৃশ্যাবলি তিনি এঁকেছেন বাস্তব রীতিতে।

ক্যানভাসে রং আর রেখার গতিময় আঁচড়ে বহু বর্ণিল নিসর্গকে মেলে ধরেছেন শিল্পী হেলাল। তাই বলে শুধু প্রকৃতিকে উপজীব্য করেই তিনি সব ছবি আঁকেননি। নিসর্গকে মুখ্য করে এঁকেছেন চারপাশের দেখা জগৎকে। আর সেই শিল্পিত অবলোকনের সূত্র ধরে আবহমান গ্রামবাংলার সঙ্গে চিত্রপটে উদ্ভাসিত হয়েছে কর্মব্যস্ত শহুরে জীবন কিংবা রিকশাচালকের মতো শ্রমজীবীর যাপিত জীবন। তেমনই একটি চিত্রকর্মের শিরোনাম 'রিকশাচালক'। ছবিতে যাত্রীর পরিবর্তে বাহারি রঙের হুড তোলা রিকশার আসনে উপবিষ্ট রিকশাচালক। বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে একটি পা রেখেছে পাদানিতে আর অন্যটি তুলে দিয়েছে নিজের আসনে। পথচলার ক্লান্তি দূর করতে যেন টান মারছে সিগারেটে। পুড়ছে বাঁহাতে চেপে ধরা সিগারেটটি। এর ঠিক উল্টো পাশের দেয়ালে রয়েছে 'তৃণভূমি' শিরোনামের চিত্রকর্মটি। তাতে দর্শকের চোখ ফিরে যায় প্রকৃতির রাজ্যে। বিশাল চিত্রপটজুড়ে দৃশ্যমান সবুজ ঘাসে আবৃত দিগন্তবিস্তৃত একটি মাঠ। খাদ্যের জন্য মাঠের চারপাশে জড়ো হয়েছে গরুর পাল। মাঠের ঠিক সামনেই আপন অস্তিত্বে উজ্জ্বল এক জলাশয়। নীলাভ জলের বুকে ভাসমান একরাশ লাল পদ্মফুলের ছবিটিতে প্রকৃতি যেন মেলে ধরেছে আপন রূপের বিভা। আরেকটি চিত্রকর্মের শিরোনাম 'শিকারী জেলে'। তাতে ঢেউ তোলা পানিতে মাছ শিকার করছে এক জেলে। ছবিটি যেন বলে যায় নদীমাতৃক বাংলাদেশের কথা।

জলরঙের এই ভিন্নধর্মী প্রদর্শনীর সূচনা হয় গত বৃহস্পতিবার। প্রধান অতিথি হিসেবে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। সভাপতিত্ব করেন বরেণ্য শিল্পী অধ্যাপক রফিকুন নবী। গতকাল বিকেলে গিয়ে দেখা যায়, নানা বয়সের মানুষ দেখতে এসেছে এ প্রদর্শনী। দর্শকদের সবার মুখেই শিল্পীর তারিফ শোনা গেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী আদনান ফয়সাল বলেন, 'শিল্পীর দৃষ্টি সত্যিই অসাধারণ। সাধারণ বিষয়কেও তিনি অসাধারণভাবে উপস্থান করেছেন। মেলে ধরেছেন তাঁর কল্পনা ও সৃজনীসত্তার অপূর্ব মেলবন্ধন।'

প্রদর্শনীতে দেখা যায়, পাপড়ি ছড়ানো একগুচ্ছ গোলাপ, কাঁটাতারের বেড়ায় বসে শালিকের অবকাশ যাপন, বৃষ্টিভেজা মহাসড়ক, থই থই জলে ছুটে চলা নৌকাবাহী কাপ্তাই হৃদের অনাবিল সৌন্দর্য, নগরের ব্যস্ত শ্রমিকের কর্মপ্রবাহ, পুরান ঢাকার রিকশাযাত্রাসহ বৈচিত্র্যময় নানা বিষয়। প্রদর্শনীর নানা কাজে শিল্পীর শক্তিমত্তা, পথযাত্রা ও উত্তরণ কত তীব্র ও শিল্পিত জ্ঞানে প্রভাময়, তা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

শিল্পী হেলাল উদ্দিনের শতাধিক ছবি থেকে বাছাই করে জলরঙে আঁকা ৬৪টি চিত্রকর্ম দিয়ে সাজানো হয়েছে প্রদর্শনী। এর মধ্যে ২০টি ছবি কানাডায় বসে আঁকা। দু-একটি কানাডার প্রকৃতি নিয়ে আঁকা। বাকি সবই বাংলাদেশের, আবহমান বাংলার। ১৫ দিনব্যাপী প্রদর্শনী চলবে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে প্রদর্শনী।

মন্তব্য