kalerkantho

বুধবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ১ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

পিছিয়ে থাকা জনপদে আশার আলো

তৌফিক মারুফ, জৈন্তাপুর থেকে ফিরে   

২৬ জুলাই, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পিছিয়ে থাকা জনপদে আশার আলো

কাচঘেরা বিছানায় শুয়ে আছে শিশুটি। দুদিন বয়সী ফুটফুটে শিশুটির মাথার ওপর সচল মনিটর। ছোট হাতের তুলতুলে মাংস ভেদ করে ঢুকে আছে সুই। মুখে লাগানো মাস্ক। শ্বাস-প্রশ্বাসে ওঠানামা করছে অস্বাভাবিক গতিতে। পাশে দাঁড়িয়ে মনিটরে গ্রাফ দেখছেন চিকিৎসক আহম্মেদ শিবলি। নার্স সানজিদা মাপছেন গায়ের তাপমাত্রা। পাশাপাশি আরো কয়েকটি বেডে একইভাবে চলছে অন্য নবজাতকদের চিকিৎসা। আর দূর থেকে অবাক চোখে এসব কিছুই অপলক তাকিয়ে দেখছে মায়ের দল। কোনো শিশুর নড়াচড়া দেখলেই কারো কারো চোখেমুখে বয়ে যাচ্ছে হাসির ঝিলিক।

দৃশ্যটা রাজধানী ঢাকার কোনো নামিদামি হাসপাতালের নবজাতক চিকিৎসা ব্যবস্থার নয়। অন্য কোনো নগর-মহানগরের কোনো বড় হাসপাতালেরও নয়। প্রতিবেশী দেশের পাহাড়ি ঢলের পানি এসে মিশেছে এপারের পাথুরে নদীর স্রোতে। দেশের সীমান্তঘেঁষা দর্শনীয় স্থান জাফলংয়ের আগেই সিলেটের জৈন্তাপুর। এখানে কুসংস্কার আর ধর্মীয় সংস্কৃতির বেড়াজালে এখনো ঘরবন্দি নারীর সংখ্যা অনেক। জরুরি প্রয়োজনেও হাসপাতালে নেওয়ার সচেতনতা অনেকটাই নেই এ এলাকায়। এমনকি স্বাস্থ্যকর্মীদের ঢুকতেও বারণ আছে অনেক বাড়িতে। পুরনো প্রথায় দাইয়ের মাধ্যমেই চলে বেশির ভাগ প্রসূতির প্রসব কার্যক্রম। মা বা নবজাতকের সমস্যায়ও অনেক পরিবারই হাসপাতালে যেতে চায় না। বরং চলে ঝাড়ফুঁক আর তাবিজ-কবজ। শিক্ষার আলো যেমন কম, তেমনি বৈদ্যুতিক আলোও এই আছে তো এই নেই। এমন পিছিয়ে থাকা জনপদেই যেন হঠাৎ করে জ্বলে উঠেছে নবজাতক চিকিৎসার নতুন এক আলোকশিখা।

অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিতে সেজে উঠেছে জৈন্তাপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি নতুন ইউনিট- স্পেশাল কেয়ার নিউ বর্ন ইউনিট বা 'স্ক্যানু'। সদ্যোজাত শিশুদের জীবনরক্ষায় প্রয়োজনীয় লাইফ সাপোর্টসহ ৩০ আইটেমের যন্ত্রপাতি এবং ১৮ আইটেমের জরুরি ওষুধ নিয়ে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত চিকিৎসক ও নার্সদের একটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত টিম।

জৈন্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. রথীন্দ্র চন্দ্র দেব বলেন, বাংলাদেশ সরকার ও ইউএসএআইডির সহায়তায় সেভ দ্য চিলড্রেন পরিচালিত মা-মণি প্রকল্প উপজেলা পর্যায়ে একমাত্র জৈন্তাপুরে এ কাজ বাস্তবায়ন করছে। এই কমপ্লেক্স ভবনের একটিমাত্র কক্ষে ছোট্ট পরিসরে এ ইউনিট স্থাপন করা হলেও এর কার্যক্রম হাসপাতালের গণ্ডি ছাড়িয়ে মাঠ পর্যায়ে রয়েছে। এর আওতায় মনিটরিং করা হয় প্রসূতির স্বাস্থ্য পরিস্থিতি। কোনো নবজাতকের সমস্যা দেখা দিলেই নেটওয়ার্ক অনুসরণ করে দ্রুত তাকে স্ক্যানুতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়। এ ছাড়া নবজাতক তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যত সুস্থ থাকলেও তার ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় কম হলে তাকেও স্ক্যানুতে পাঠানো হয় ঝুঁকিমুক্ত রাখার জন্য।

সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. আজহারুল ইসলাম বলেন, গত বছরের মার্চ মাস থেকে উপজেলা পর্যায়ে দেশের এই একমাত্র স্ক্যানু কার্যক্রমটি শুরু হয় পরীক্ষামূলকভাবে। এমন প্রত্যন্ত এলাকায় এ রকম কার্যক্রম নবজাতকদের জীবন বাঁচাতে খুবই ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। এমন স্ক্যানু সারা দেশে করা গেলে জাতীয় পর্যায়ে অনেক বড় ফল পাওয়া যেতে পারে।

স্ক্যানুর স্থানীয় সমন্বয়কারী রিক্তা দাস জানান, গত বছরের ১ মার্চ থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হিসাবে জৈন্তাপুর উপজেলার ছয় ইউনিয়নে মোট তিন হাজার ৯৯১টি ডেলিভারি হয়। এর মধ্যে জীবন্ত শিশুর জন্ম হয় চার হাজার ১৭টি। আর মৃত শিশু বের হয় ১৪০। ৮০ শতাংশ ডেলিভারিই হয়েছে বাড়িতে। জন্মের পর থেকে চার দফায় ছয় ঘণ্টার মধ্যে, তৃতীয় দিবস, সপ্তম দিবস ও ২৮তম দিবসের পর্যবেক্ষণ করে থাকে স্ক্যানুর কর্মীরা। এর মাধ্যমে যাদের জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন তাদের পাঠানো হয় স্ক্যানুতে। এ ছাড়া স্ক্যানু থেকে প্রয়োজনমতো অনেককে পাঠানো হয় সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. মনোজ্জির আলী বলেন, 'আমরা মাঝেমধ্যেই জৈন্তাপুরে গিয়ে কার্যক্রমটি দেখে আসি। আবার এখানে যাদের পাঠানো হয় তাদের চিকিৎসা দিই এমনকি ফোনেও জরুরি পরামর্শ দিয়ে থাকি।'

রিক্তা দাস বলেন, যাদের অবস্থা একেবারেই খারাপ তাদের বাঁচানো মুশকিল হয়ে পড়ে। তবে মৃত্যুর হার কমানো গেছে- এটাই এ প্রকল্পের অন্যতম সার্থকতা। কারণ এখনো আমরা এলাকার অনেককেই হাসপাতালমুখী করতে পারিনি।'

স্ক্যানুতে গত বছরের ১ মার্চ থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভর্তি করা ৪২১ নবজাতকের অসুস্থতার কারণ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ১৬২টি শিশুর শরীরে জটিল কোনো না কোনো সংক্রমণ ছিল, ১৩৯টি শ্বাসকষ্টে ভোগে, ৮৮টির জন্ম হয় নির্দিষ্ট সময়সীমার আগে কিংবা কম ওজন নিয়ে, ২৩টি শিশুর ছিল জন্ডিস। ৯টি শিশু ছিল অন্যান্য সমস্যায় আক্রান্ত। সূত্র জানায়, উল্লিখিত সময়সীমায় স্ক্যানুর কার্যক্রমের মধ্যেও জন্মের পর থেকে ২৮ দিবসের মধ্যে ৯৫ নবজাতকের মৃত্যু ঘটেছে। এদের ৬২ জনের জন্ম হয়েছিল বাড়িতে এবং ৩৩ জনের জন্ম হয়েছিল স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। ২৮ দিবসের মধ্যে এই মৃত্যুর হার (প্রতি এক হাজার জীবিত জন্মের ক্ষেত্রে) ২৫ দশমিক ৫। অথচ জাতীয় পর্যায়ে যে হার এখনো ৩২ এবং ওই উপজেলার বেইসলাইন সার্ভে অনুযায়ী তা ২৯.৭। সেভ দ্য চিলড্রেনের মা-মণি প্রকল্পের প্রধান ডা. ইসতিয়াক মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, কার্যক্রমটি চালু করে দেখা গেছে নিরাপদ প্রসব ও জন্ম-পরবর্তী উপযুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে পারলে নবজাতকের মৃত্যু কমিয়ে আনা এবং রোধ করা সম্ভব।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা