kalerkantho

শনিবার । ২৬ নভেম্বর ২০২২ । ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

বঙ্গবন্ধু ও পরিকল্পনাধীন অর্থনীতির নবযাত্রা

ড. শামসুল আলম

১৫ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বঙ্গবন্ধু ও পরিকল্পনাধীন অর্থনীতির নবযাত্রা

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিকে শুধু রাজনৈতিক মুক্তি ও স্বাধিকার দেননি, তিনি বাঙালি জাতিকে অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তিনি শুধু স্বপ্ন দেখিয়ে ক্ষান্ত হননি, দেশ পুনর্গঠনের একেবারে শুরুতেই সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথনকশা অঙ্কন করেছিলেন এবং তা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছিলেন। অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য শুরুতে দরকার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তিনি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের তিনটি মূলভিত্তি গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সময়ে সংবিধানে জাতীয়তাবাদ অন্তর্ভুক্ত হয়। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার না করার মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টার জন্য অমর্ত্য সেন বঙ্গবন্ধুকে ‘বিশ্ববন্ধু’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সমাজতন্ত্র বলতে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন বা গণচীনের আদলে সমাজতন্ত্র চাননি। তিনি বলেছেন, ‘সমাজতন্ত্র আমি দুনিয়া থেকে ভাড়া করে আনতে চাই না। ’ তিনি বোঝাতে চেয়েছেন ‘এ সমাজতন্ত্র হলো বাংলার মানুষের সমাজতন্ত্র, তার অর্থ হলো শোষণহীন সমাজ, সম্পদের সুষম বণ্টন’। তিনি আরো পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, ‘দুনিয়ায় আমি বাংলার মাটি থেকে দেখাতে চাই যে গণতন্ত্রের মাধ্যমে আমি সমাজতন্ত্রকে কায়েম করব। কেননা আমি ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। ’

বাংলাদেশের যখন জন্ম হয়, যখন পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের থেকে ৭০ শতাংশ বেশি ছিল। আর এখন প্রত্যেক বাঙালির মাথাপিছু আয় ৪৫ শতাংশ বেশি, যা এখন ৪৬৫ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৯০ ডলার আর দারিদ্র্যের হার ছিল ৮৪ শতাংশ। জিডিপির আকার ছিল মাত্র ৬.৩ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বৈদেশিক রিজার্ভ ছিল না। হানাদার বাহিনী যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে জেনে তত্কালীন স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সব টাকা পুড়িয়ে দেয়। স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তনের ২১ দিনের মাথায় সেই কপর্দকহীন সময়ে অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু। ভারতে পরিকল্পনা কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫০ সালে স্বাধীনতার আড়াই বছর পর। পাকিস্তানে পরিকল্পনা কমিশন গঠন করা হয় ১৯৫২ সালে। স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ বছর পর। এর মাধ্যমে বোঝা যায় বঙ্গবন্ধু দ্রুত দেশ গঠনে কতটা আন্তরিক ছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন দেশ পুনর্গঠন করতে হলে দেশপ্রেমিক দূরদর্শী অর্থনীতিবিদদের সহযোগিতার প্রয়োজন। তাই তিনি চিন্তা, চেতনা ও আদর্শে সমমনা অর্থনীতিবিদদের নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন গঠন করলেন। তিনি নিজেই ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে। মন্ত্রী পদমর্যাদার ডেপুটি চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর খুব কাছের মানুষ অধ্যাপক নুরুল ইসলামকে রাখলেন। অধ্যাপক ইসলাম হার্ভার্ড থেকে ১৯৫৫ সালে অর্থনীতিতে পিএইচডি করেছিলেন। পরিকল্পনা কমিশনের আরো তিন খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাসম্পন্ন সদস্য ছিলেন। তাঁরা হলেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান, অধ্যাপক আনিসুর রহমান ও অধ্যাপক মোশারফ হোসেন। অধ্যাপক আনিসুর রহমানও হার্ভার্ড থেকে অর্থনীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রিপ্রাপ্ত আর অধ্যাপক মোশারফ হোসেন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করা। অন্যদিকে অধ্যাপক রেহমান সোবহান কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে উচ্চতর ডিগ্রিপ্রাপ্ত। রেহমান সোবহান ও নুরুল ইসলাম ১৯৬১ সালের দিকে দুই অর্থনীতি বিষয়ে প্রথম পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য তুলে ধরেন। এই দুই অর্থনীতি তত্ত্বই পরবর্তীকালে রাজনৈতিক স্বাধিকারের অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছিল। বঙ্গবন্ধু পরিকল্পনা কমিশন এমনভাবে গঠন করেছিলেন, যাতে এটি বাংলাদেশের কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূলচিন্তা কেন্দ্র ও সমন্বয়কারী কেন্দ্রীয় সংস্থা হিসেবে পরিণত হয়। এর মাধ্যমে যাতে এটি সরকারের অর্থনৈতিক নীতিমালা বিষয়ে পরামর্শক হিসেবে কাজ করতে পারে। সে জন্য তিনি এটিকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে খুব শক্তিশালী করেছিলেন, যার ফলে ডিভিশন চিফের পদও তখন সচিবের মর্যাদার সমান ছিল। এই কমিশন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠন, দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দ্রুততম সময়ে ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩-৭৮) প্রণয়ন করে। তিনি মুখবন্ধে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাগুলোকে আলাদা করা যায় না। এগুলোকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে দেশ পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য এই পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। ’ তিনি চেয়েছিলেন এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যাতে গণমানুষের সম্পৃক্ততা থাকে।

প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এমন সময়ে করা হয়, যখন বৈশ্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে ছিল না। ১৯৭৩ সালের অক্টোবরের দিকে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ বেধে যায় এবং এর ফলে জ্বালানি তেলের বিশ্বসংকট তৈরি হয়। এর আগেই অবশ্য বিশ্বে শেয়ারবাজারে ধস পড়া শুরু হয়। বিশ্বজুড়ে তখন অর্থনৈতিক নিশ্চলতা (স্ট্যাগফ্লেশন) শুরু হয়। মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে এবং এর সঙ্গে সঙ্গে অনেক দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এবং দেশীয় বাস্তবতাও খুবই প্রতিকূল ছিল।  

প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দারিদ্র্য দূরীকরণ। দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি ছিল পুনর্গঠনের কাজ চলমান রাখা এবং অর্থনীতি, বিশেষত কৃষি ও শিল্পের উত্পাদন বৃদ্ধি করা; তৃতীয়টি হলো—জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমপক্ষে ৫.৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা।

অন্যান্য উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যে, বিশেষত খাদ্য, বস্ত্র, ভোজ্য তেল, কেরোসিন, চিনির উত্পাদন বৃদ্ধি করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রাখা, কৃষি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা আনয়নের লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সাধন, মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি সরবরাহে উন্নয়ন বরাদ্দ বৃদ্ধি করা এবং সর্বোপরি দেশের সর্বস্তরে আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।

প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধু কৃষি খাতকে শুরুতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে চেয়েছেন। এ লক্ষ্যে তিনি বিভিন্ন কৃষি সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন, যা আজকের কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করেছিল। স্বাধীনতার প্রথম বছরে বার্ষিক বাজেটের (১৯৭২-৭৩) পরিমাণ ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৫০১ কোটি টাকাই বরাদ্দ করা হয়েছিল কৃষি উন্নয়ন খাতে।

বঙ্গবন্ধু কৃষি উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি শিক্ষা খাতকে গুরুত্ব দিতে চেয়েছেন। সে কারণে ১৯৭২-৭৩ সালের বাজেটে মোট বরাদ্দের ২১.৪ শতাংশ রাখা হয়েছিল শিক্ষার জন্য। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১৭(ক) ধারা—‘রাষ্ট্র সকল শিশুর জন্য একটি মানসম্পন্ন, গণমুখী, সর্বজনীন, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থা আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত চালু করার লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে’-এর বাস্তবায়নে তিনি সচেষ্ট ছিলেন। এ লক্ষ্যে তিনি ৩৮ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয় করেন।

বঙ্গবন্ধুর ধ্যান ও জ্ঞান ছিল গ্রামীণ উন্নয়ন, দরিদ্র কিষান-কিষানি ও মেহনতি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন। তিনি উচ্চারণ করেছেন, ‘স্বাধীনতা তখনই প্রকৃত স্বাধীনতা হয়ে উঠবে, যেদিন বাংলাদেশের কৃষক, মজুর ও দুঃখী মানুষের সকল দুঃখের অবসান হবে। ’

বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন ও বিকাশের জন্য বৈদেশিক সহায়তা প্রয়োজন হবে। সে কারণে তিনি পরিকল্পনা কমিশনের একটি ইউনিট হিসেবে পরিকল্পনা কমিশনের সঙ্গেই বৈদেশিক সম্পদ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন, যদিও পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ নামে পরিবর্তন হয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি বিভাগে পরিণত হয়। শুধু বৈদেশিক সম্পদ আহরণ নয়, দেশীয় সম্পদ আহরণের জন্য তিনি ১৯৭২ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর লালিত স্বপ্ন ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তি দিয়েছে। পরিকল্পনামাফিক দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা থেকে তিনি যদি আরো ২০ বছর বেঁচে থাকতেন, তাহলে বাংলাদেশ আজ হয়তো সমৃদ্ধিশালী এক দেশের কাতারে চলে যেত।

লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও প্রতিমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য।



সাতদিনের সেরা