kalerkantho

রবিবার । ২ অক্টোবর ২০২২ । ১৭ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

বঙ্গবন্ধুকন্যাদের সেই দুঃসহ দিনগুলো

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় তাঁর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ছিলেন জার্মানিতে। নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের পর প্রবাসে কিভাবে সময় কেটেছে তাঁদের? ওই চরম দুঃসময়ে কারা ছিলেন তাঁদের পাশে? সেসব নিয়ে ‘প্রবাসে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার দুঃসহ দিন’ বইটি লিখেছেন জার্মানিপ্রবাসী সাংবাদিক সরাফ আহমেদ। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহফুজার রহমান

১৫ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



বঙ্গবন্ধুকন্যাদের সেই দুঃসহ দিনগুলো

সরাফ আহমেদ

কালের কণ্ঠ : আপনার লেখা বইটিতে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার ওই দুঃসময়ের অনেক অজানা কথা উঠেছে এসেছে। এই কাজটি করতে গিয়ে কোন বিষয়টি আপনার মনে বেশি দাগ কেটেছে?

সরাফ আহমেদ : হ্যাঁ, কাজটি করতে গিয়ে অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছে, অনেক নথিপত্র ঘেঁটেছি। সেই সময়ের জার্মান পত্রিকাগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি। ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট জার্মানির বনে বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ের সঙ্গে জার্মানির যে সাংবাদিকরা সাক্ষাৎ করেছিলেন, তাঁদের কারো কারো সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি।

বিজ্ঞাপন

ওই সময়ে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে বনে তৎকালীন বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূতের বাসায় বন্দি করে রাখা হয়েছে। আসলে তাঁদের বন্দি করা হয়নি। সেটি প্রমাণ করতে দুই বোনকে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করেন রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। সাংবাদিকরা যখন ওই বাসায় যান, তখনো ওপরতলা থেকে কান্নার আওয়াজ পান তাঁরা। জার্মানির দ্য ভেল্ট পত্রিকায় ওই বিষয়ে করা প্রতিবেদনে লেখা হয়, ‘শোকে মুহ্যমান শেখ হাসিনা সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন। তাঁর পরনে হলুদ পাড়ের সবুজ রঙের শাড়ি। ডান হাত দিয়ে তিনি আঁচল ধরে আছেন। বাঁ হাতে থাকা সাদা রুমাল দিয়ে বারবার চোখ মুছছেন। তাঁর পেছন পেছন নেমে এলেন ছোট বোন শেখ রেহানা। তিনিও ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। তাঁরা দুজনই ড্রয়িংরুমের খয়েরি রঙের সোফাটিতে বসলেন। তাঁদের মুখে কথা নেই। তাঁরা নিচের দিকে তাকিয়ে অঝোরে কাঁদছেন। কান্নার সময় তাঁরা বারবার কেঁপে কেঁপে উঠছেন। দুই বোনের কান্নায় বড় ড্রয়িংরুমটির পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল। এভাবে তাঁরা তিন-চার মিনিট সোফায় বসে রইলেন। রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী উঠে দাঁড়িয়ে তাঁদের সোফার কাছে গেলেন এবং শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার মাথায় হাত দিলেন। পরে তাঁদের নিয়ে ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে ওপরের দিকে উঠে গেলেন। ’ এই পরিস্থিতি-পরিবেশ সবার মনেই দাগ কাটতে বাধ্য।

 

কালের কণ্ঠ : ড. ওয়াজেদ মিয়ার (শেখ হাসিনার স্বামী) বিষয়ে ওই সময়ের কোনো স্মৃতি কারো কাছ থেকে জানতে পেরেছেন?

সরাফ আহমেদ : এ বিষয়ে গবেষক শহীদ ভাই (গবেষক ড. শহীদ হোসেন) আমার বইয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন। তাঁর স্মৃতিচারণা এমন—‘দেখতাম, ওয়াজেদ ভাই যেন কেমন ভেঙে পড়েছেন। সেই তুলনায় হাসিনা আপাকে দেখতাম শোকে ভেঙে না পড়ে ধকল সহ্য করার অদ্ভুত রকম ক্ষমতা যেন বিধাতা দিয়েছেন। হতে পারে, তাঁর অন্তরের দুঃখ ও ক্ষরণ তিনি বাইরে প্রকাশ করতেন না। সবার অভিভাবক হিসেবে হয়তো তিনি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করতেন। তবে ওয়াজেদ ভাইয়ের মধ্যে একটা আতঙ্ক কাজ করত। ওয়াজেদ ভাই আমাকে বলেছিলেন, আমার কেমন ভয় ভয় করছে। তুমি কদিন আমাদের সঙ্গে থাকো। ’

 

কালের কণ্ঠ : ওই সময় শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল অনেক ছোট। তাঁদের সম্পর্কে বিশেষ কোনো স্মৃতিচারণা করেছেন কেউ?

সরাফ আহমেদ : ওই সময় বলতে বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকার সময়ের একটি ঘটনা শহীদ ভাইয়ের কাছ থেকে জেনেছি। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি হিসেবে জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে জ্যামাইকা গিয়েছিলেন। তাঁর ট্রানজিট ছিল জার্মানির ফ্রাংকফুর্ট। বঙ্গবন্ধু ফ্রাংকফুর্ট বিমানবন্দরে নামলে প্রটোকল ও প্রবাসী নেতাকর্মীদের ভিড়ের মধ্যে ড. ওয়াজেদ মিয়া বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেছিলেন দেশে ছেলে জয়ের জন্য ছোট একটি সাইকেল পাঠাতে। জয় তখন তাঁর মায়ের সঙ্গে বাংলাদেশে। কুরিয়ার বা অন্য কোনো মাধ্যমে সাইকেল দেশে পাঠাতে বেশ খরচ। তাই বঙ্গবন্ধুর সফরের জন্য অপেক্ষা করছিলেন ড. ওয়াজেদ। পরে বঙ্গবন্ধু নাতির জন্য সেই সাইকেল সঙ্গে নিয়ে দেশে ফেরেন।

 

কালের কণ্ঠ : বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার জার্মানি থেকে ভারতে পৌঁছানোর বিষয়ে কিছু বলবেন?

সরাফ আহমেদ : ১৫ই আগস্টের পর বঙ্গবন্ধুকন্যাদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কা সৃষ্টি হয়। এই চরম দুঃসময়ে অনেকেই তাঁদের কাছ থেকে দূরে চলে যায়। হাতে গোনা কিছু মানুষ তাঁদের পাশে ছিলেন, এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় খোঁজা শুরু হয়। এ জন্য শুরু হয় নানা ধরনের গোপন কূটনৈতিক তৎপরতা। এক পর্যায়ে ভারতীয় দূতাবাসের কর্মকর্তারা পাহারা দিয়ে তাঁদের পৌঁছে দেন ফ্রাংকফুর্ট বিমানবন্দরে। ২৪ আগস্ট তাঁরা দিল্লিতে পৌঁছে যান। দিল্লিতে কঠোর নিরাপদ আশ্রয়ে থাকলেও ছিল নিরাপত্তার আতঙ্ক। এ জন্য সবাইকে ছদ্মনাম নিতে হয়। ছদ্মনামেই আকাশবাণী দিল্লিতে কাজ করেন শেখ হাসিনা।

 

কালের কণ্ঠ : বঙ্গবন্ধুকন্যাদের ভারতে পৌঁছানো নিশ্চয়ই অজানা আতঙ্ক ও রুদ্ধশ্বাস একটা পর্যায়।

সরাফ আহমেদ : সেটি তো অবশ্যই। বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় দূতাবাসের তৎকালীন কর্মকর্তা সি ভি রঙ্গনাথনের সঙ্গে আমি কথা বলতে পেরেছি। ভারতে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ড. ওয়াজেদ মিয়াকে কার্লসরুয়েতে যেতে বলেন তাঁর জরুরি জিনিসপত্র আনতে। কিন্তু সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় ওয়াজেদ মিয়া কার্লসরুয়েতে গিয়েও পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র বন্ধ থাকায় তাঁর বই ও জিনিসপত্র আনতে পারেননি। ওই দিন সন্ধ্যার পর বন শহরে ফিরে আসেন তিনি। এরপর রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ফোন করে তারিক এ করিমকে তাঁর গাড়ি নিয়ে আসতে বলেন। বেশ রাতে ওই গাড়িতে ওয়াজেদ মিয়াকে পূর্বনির্ধারিত এক স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। গাড়িতেই তাঁকে (ওয়াজেদ মিয়া) জানানো হয়, আরেকটি গাড়ি নিয়ে ভারতীয় দূতাবাসের একজন তাঁর জন্য অপেক্ষায় আছেন। ওই গাড়িতে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হবে ভারতের রাষ্ট্রদূতের কাছে। সেদিন গাড়ি নিয়ে ওয়াজেদ মিয়ার জন্য অপেক্ষাকারী ব্যক্তিই হলেন ভারতীয় দূতাবাসের কর্মকর্তা সি ভি রঙ্গনাথন। ওয়াজেদ মিয়া সেই গাড়িতে ভারতের রাষ্ট্রদূতের বাসভবনের দিকে রওনা হন। সেখানে ঠিক হয়, কিভাবে কী হবে। বঙ্গবন্ধুকন্যাদের ২৪ আগস্ট ভারতে যাওয়া ঠিক হলেও কোথায় যাবেন, সেটি জানানো নিষেধ ছিল। তবে ড. শহীদ বিশেষ ব্যবস্থাপনায় প্লেনে উঠেছিলেন। তিনি প্লেনে উঠে শেখ হাসিনা ও রেহানাকে নির্দিষ্ট আসনে দেখেছিলেন। সেদিন তাঁরা ভারতে চলে যান।

 

কালের কণ্ঠ : ওই সময়ের শেখ রেহানা সম্পর্কে আপনার বই থেকে এই মুহূর্তে মনে পড়ছে এমন কোনো ঘটনা যদি বলেন।

সরাফ আহমেদ : পশ্চিম জার্মানির কার্লসরুয়েতে ওয়াজেদ মিয়ার ঘনিষ্ঠজন ছিলেন শহীদ হোসেন। দিল্লিতে যাওয়ার আগের দিন সন্ধ্যার দিকে শহীদ হোসেনকে ওয়াজেদ মিয়া বলেন, ‘আগামীকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আমরা ফ্রাংকফুর্টে যাব, তোমাকেও সঙ্গে থাকতে হবে। ’ শহীদ হোসেন তাঁর সম্মতি জানান।

এ সময় রেহানা কাঁদতে কাঁদতে শহীদ হোসেনকে একটি ছোট মিনোল্টা ক্যামেরা দিয়ে বলেন, ‘শহীদ ভাই, এটি আপনার কাছে রেখে দেন। এটি সঙ্গে এনেছিলাম আমাদের ইউরোপভ্রমণের কিছু ছবি তুলব বলে। কিন্তু সে সুযোগ আর হলো না। কিন্তু ক্যামেরায় ছবি তোলা একটি রিল আছে, যেটি বের করতে হবে। ’ শেখ রেহানা শহীদ হোসেনকে আরো বলেন, ‘এই ক্যামেরা দিয়ে আমার দুই ভাই শেখ কামাল ও শেখ জামালের বিয়ের ছবি তুলেছিলাম, এই রিলে সেই ছবিগুলিই আছে। ভেবেছিলাম ছবিগুলি এখানে ওয়াশ ও প্রিন্ট করব, সেই সুযোগ তো আর হলো না। কোনো সময় পারলে ফিল্ম ওয়াশ করে ছবিগুলি আমাকে প্রিন্ট করে দেবেন। ’ এই কথা বলে রেহানার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়তে থাকে। শেখ রেহানার এই কথাগুলো শুনে শহীদ হোসেনও কাঁদতে থাকেন।

পরে দিল্লিতে পৌঁছে ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫ শেখ হাসিনা জার্মানির কার্লসরুয়ে শহরে অবস্থানরত শহীদ হোসেনকে চিঠিতে লেখেন, ‘ফটোগুলি এলে আপনার কাছে রাখবেন। সবই তো হারিয়েছি। ওগুলি থাকবে শুধু স্মৃতি হয়ে। ’

 

কালের কণ্ঠ : বইটি লিখতে গিয়ে অনেক স্থানে যেতে হয়েছে, অনেকের সঙ্গে কথা বলেছেন। কাদের সহযোগিতা বেশি পেয়েছেন?

সরাফ আহমেদ : আলাদাভাবে বলতেই হয় কবি ও সাংবাদিক তারিক-ঊল ইসলাম, সাবেক রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম, গবেষক ড. শহীদ হোসেন ও সাংবাদিক আহমদ সফি উদ্দিনের কথা। এ ছাড়া বিভিন্ন সূত্র ধরে সাংবাদিক, গবেষক, জার্মান সংবাদমাধ্যম, মহাফেজখানাসহ যেখানেই যোগাযোগ করেছি, প্রায় সবার কাছ থেকেই সহযোগিতা পেয়েছি। শুরুতে মূলত ফোন ও ই-মেইলে বিভিন্নজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকি। তখন একের পর এক নতুন সূত্রের সন্ধান পেতে থাকি। বার্লিন, বন, ফ্রাংকফুর্ট, কার্লসরুয়ে, ভিয়েনা, ব্রাসেলস, আমস্টারডাম, ওয়াশিংটন, বেঙ্গালুরু, ঢাকা—এসব জায়গায় সেই সময়ের ঘটনার সাক্ষী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে থাকি। তাঁদের অনেকেই পুরনো ছবি, চিঠিপত্র দিয়ে সহযোগিতা করেন। তাঁদের মর্মস্পর্শী স্মৃতিচারণায় অনেক অজানা ঘটনা বেরিয়ে আসে।

 

কালের কণ্ঠ : বইটিতে দুর্লভ কিছু ছবি, চিঠি, দলিলপত্র যুক্ত করেছেন এবং এগুলোর সূত্র ধরে বর্ণনাও দিয়েছেন।

সরাফ আহমেদ : হ্যাঁ, আমার দিক থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। জার্মানির হ্যানোভারের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে বারবার গিয়েছি। জার্মান পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধ বাংলায় অনুবাদ করেছি। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া ইন্দিরা গান্ধীর চিঠি, গুরুত্বপূর্ণ দলিল যুক্ত করেছি। এ ছাড়া ড. ওয়াজেদ মিয়া, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার অপ্রকাশিত কয়েকটি চিঠি, প্রেস ক্লিপিংস ও ছবি যুক্ত করেছি।

 

কালের কণ্ঠ : দুঃসহ সেই দিনগুলোতে শেখ হাসিনার কাছের মানুষদের কাছে স্মৃতিচারণা শুনেছেন। তাঁর বিষয়ে কিছু বলবেন?

সরাফ আহমেদ : সেই সময়টায় যাঁরা শেখ হাসিনাকে কাছ থেকে দেখেছেন তাঁদের মতে, তিনি অসীম ধৈর্যশক্তি ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে অবিচল থেকে চরম সেই পরিস্থিতি মোকাবেলা করে ভবিষ্যতের কথা ভেবেছেন। কখনো ভেঙে পড়েননি। এটি তাঁর অনন্য গুণ।

 

কালের কণ্ঠ : সময় দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

সরাফ আহমেদ : আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

 



সাতদিনের সেরা