kalerkantho

বুধবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৭। ৫ আগস্ট  ২০২০। ১৪ জিলহজ ১৪৪১

বঙ্গবন্ধুর অভ্যন্তরীণ সমাজবিপ্লব

সৌমিত্র শেখর

২৬ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বঙ্গবন্ধুর অভ্যন্তরীণ সমাজবিপ্লব

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন : ‘আমার সরকার অভ্যন্তরীণ সমাজবিপ্লবে বিশ্বাসী।’ ‘অভ্যন্তরীণ সমাজবিপ্লব’ কী? পাকিস্তানে আটক থাকাবস্থায়ও সাহসী সেনাপতির মতো উন্নতশিরে যিনি ছিলেন, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণও যাঁকে সামান্য বিচলিত করতে পারেনি, সেই অমিততেজি নেতা বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে প্রথমেই বলেন, তিনি জানতেন বাংলাদেশ স্বাধীন হবে, বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বাস করবে, খেয়ে-পরে সুখে থাকবে—এটাই ছিল তাঁর সাধনা। তিনি বলেছেন, ‘সাধনা’—‘চাওয়া’ নয়, ‘কামনা’ নয়, ‘প্রত্যাশা’ও নয়—‘সাধনা’! ‘সাধনা’র সঙ্গে মন-প্রাণ-কর্মের দীর্ঘদিন ধরে লেগে থাকার একটি ব্যাপার আছে, উল্লিখিত অন্য শব্দগুলোর সঙ্গে যা নেই। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ফসল বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্থেও তাই—ক. বাংলাদেশ স্বাধীন হবে—অর্থাত্ রাজনৈতিকভাবে স্বতন্ত্র দেশ হবে; খ. বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বাস করবে—অর্থাত্ এখানে থাকবে গণতন্ত্র, সুমত প্রকাশের স্বাধীনতা; গ. মানুষ খেয়ে-পরে সুখে থাকবে—অর্থাত্ মৌলিক চাহিদা পূরণ হওয়ায় মানুষের মন থাকবে প্রফুল্ল।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নই ছিল এটি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু তাই জনতার উদ্দেশে বলেছেন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য কিছুদিন সময় দেওয়ার জন্য। কত সময়? বঙ্গবন্ধুই উত্তর দিয়েছেন: প্রকৃতপক্ষে লাগে দশ বছর। কিন্তু তিনি নিরুপদ্রব মাত্র তিনটি বছর চান। বঙ্গবন্ধু বলেছেন : ‘একজন বাঙালি বেঁচে থাকতেও এই স্বাধীনতা নষ্ট হতে দেব না। বাংলাদেশ ইতিহাসে স্বাধীন দেশরূপেই বেঁচে থাকবে। বাংলাকে দাবায়ে রাখতে পারে এমন কোনো শক্তি নাই।’ তাহলে কি বঙ্গবন্ধুর সন্দেহ ছিল, স্বাধীনতা ‘নষ্ট’ হতে পারে? সন্দেহ ছিল। কারণ বঙ্গবন্ধুই বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানে আটকাবস্থা থেকে বিশ্বনেতাদের চাপে তিনি যখন মুক্ত হয়ে স্বদেশের উদ্দেশে প্রথমে লন্ডনে যান, তার আগে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করেন : ‘দুই অংশের মধ্যে বাঁধনের সামান্য হলেও রাখা যায় কি না।’ পাকিস্তানি নেতাদের কী আশা! সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর—তেইশ বছরের শোষণ আর যুদ্ধের ৯ মাস ধরে বাংলাদেশে তাণ্ডব চালিয়ে হত্যা-ধর্ষণ-লুণ্ঠন ইত্যাদির রেকর্ড গড়ার পরও ‘বাঁধন’ জিইয়ে রাখার ইচ্ছে, তাও আবার ‘দুই অংশ’ বলছেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ভুট্টো, ‘বাংলাদেশ’ কথাটি উচ্চারণ করেননি! অর্থাত্ স্পষ্ট বোঝা গিয়েছিল, ভুট্টোর পাকিস্তান বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মন থেকে মেনে নেয়নি। বঙ্গবন্ধু এটি শুরু থেকেই বুঝেছিলেন এবং তিনি প্রকাশ্য জনসভায় বিশ্ববাসীর উদ্দেশে পাকিস্তানকে লক্ষ্য করে বলেন : ‘আজ আমি বলতে চাই—ভুট্টো সাহেব, আপনারা সুখে থাকুন। আপনাদের সাথে আর না। মরে যাবে, তবু বাঙালি স্বাধীনতা হারাতে পারে না। [...] আমরা স্বাধীন, এটা মেনে নিন।’ ফলে পাকিস্তান যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা মন থেকে মানেনি এটা বঙ্গবন্ধু ভালো করেই বুঝেছিলেন এবং বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্র যে চলবে এটিও তিনি ধারণা করেছিলেন। তাই বঙ্গবন্ধু বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে আবেদন জানান বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য। আশার ব্যাপার, মাত্র এক বছরের মধ্যে ৫৪টি দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়; যদিও বিশ্বের মোড়ল দেশগুলোর কূটকৌশলের কারণে জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্যের পদ পেতে বাংলাদেশের খানিকটা বিলম্বই হয়। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্যের পদ লাভ করে।

বঙ্গবন্ধু নিজেকে কখনোই রাষ্ট্রক্ষমতার পদ দিয়ে পরিচয় দেননি। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে নন, বাঙালির ঘরের সন্তান, ভাই হিসেবে সবার সহযোগিতা চান, যাতে তিনি প্রতিটি মানুষের মুখে অন্ন দিতে পারেন, বেকারদের কর্মসংস্থান করতে পারেন। স্বাধীনতার আগেই বাঙালির জন্য একটি সুখী ও সমৃদ্ধিশালী দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বাঙালি ও তাদের ভবিষ্যত্ বংশধরদের জন্য সুখী ও উন্নততর জীবনের কথা বলে এসেছেন। দেশ স্বাধীন হলে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করার জন্য উদ্যোগী হন এই মহান নেতা। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে অবস্থা দেখতে পান তাকে তিনি অভিহিত করেন ‘মহাসংকটের ক্রান্তিলগ্ন’ হিসেবে। সদ্যঃস্বাধীন দেশে যে সংকটগুলো নিয়ে এই ‘মহাসংকটে’র সৃষ্টি, সেগুলোকে বঙ্গবন্ধু শনাক্ত করেন এভাবে : উদ্বাস্তু সমস্যা, বেকারত্ব, অচল বন্দর, নিশ্চল কারখানা, বিদ্যুত্হীনতা, বিশৃঙ্খল বাণিজ্য, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা, দারিদ্র্য, খাদ্যাভাব, আমলাদের অপরিবর্তিত চরিত্র ইত্যাদি। তিনি এই ‘মহাসংকট’ কাটিয়ে তোলার ‘চ্যালেঞ্জ’ গ্রহণ করেন। আর পুরনো আমলের জীর্ণ সমাজ ভেঙে তিনি নতুন সমাজ গড়ার ডাক দেন এবং ‘অভ্যন্তরীণ সমাজবিপ্লবে’র মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করতে তিনি এগিয়ে যান।

বঙ্গবন্ধু অন্যদের কথিত ও অতি চর্চিত ‘অবাস্তব তাত্ত্বিকতা’র বদলে এই ‘অভ্যন্তরীণ সমাজবিপ্লবে’র ডাক দেন। ‘অভ্যন্তরীণ সমাজবিপ্লবে’র মূলকথাই হলো গৃহযুদ্ধ না বাধিয়ে অপেক্ষাকৃত স্বল্পতম সময়ের মধ্যে ‘শোষণ ও অবিচারমুক্ত’ সমাজ ও সম্পদে জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা। বঙ্গবন্ধু এ কাজটি অতি দ্রুততার সঙ্গেই সম্পন্ন করে যাচ্ছিলেন। আটকাবস্থা শেষে পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরে মাত্র তিন মাসের মধ্যে তিনি—ক. ব্যাংকসমূহ; খ. সাধারণ ও জীবন বীমা; গ. সব পাটকল; ঘ. সব বস্ত্র ও সুতাকল; ঙ. সব চিনিকল; চ. নৌযানের কারখানাগুলো; ছ. পনেরো লাখ টাকা মূল্যের বেশি হলে অবাঙালিদের ফেলে যাওয়া সম্পদ ও সম্পত্তিসমূহ; জ. বিমান ও শিপিং সংস্থা; ঝ. বহির্বাণিজ্য সংস্থাসমূহ ইত্যাদিকে জাতীয়করণ করেন। বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনা ছিল, জাতীয়করণকৃত প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যবস্থাপনার অংশে সেই প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী-কর্মকর্তাদের যুক্ত করতে। এতে সম্পদে তাদের মালিকানার অধিকারও জন্ম নেবে এবং তারা লভ্যাংশ পাবে অধিক হারে। প্রতিষ্ঠানটি যাতে রুগ্ণ বা অলাভজনক না হয়, মালিকানা থাকলে সে আগ্রহ কর্মচারী-কর্মকর্তাদের আরো বেশি হবে এবং শ্রম ও পুঁজির মধ্যে আবহমানকালের বিরোধিতা বিলুপ্ত হবে বলে বঙ্গবন্ধু মনে করেছেন। তিনি শ্রমিকদের ওপর অধিক আস্থা স্থাপন করে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে জোর দেন এবং কী করে রাষ্ট্র আরো শ্রমিকবান্ধব হতে পারে সে পথনির্দেশ করেন। বাস্তবসম্মত শিক্ষানীতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ সমাজবিপ্লবে’র লক্ষ্যে শিক্ষায়ও বিপ্লব আনা জরুরি। যে শিক্ষা উত্পাদনবিমুখ, দেশের মাটি ও সংস্কৃতির সঙ্গে যে শিক্ষার যোগসূত্র নেই সে শিক্ষা সমাজের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। তাই তিনি বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-এ-খুদাকে প্রধান করে শিক্ষাকে গণ ও দেশমুখী করার লক্ষ্যে শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। ‘অভ্যন্তরীণ সমাজবিপ্লবে’ কৃষক ও কৃষিকে বঙ্গবন্ধু বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই কৃষকদের আগে নেওয়া ঋণ মওকুফ, পঁচিশ বিঘা পর্যন্ত জমি খাজনামুক্তকরণ, কৃষকদের স্বল্পমেয়াদি সাহায্য প্রদান, দুর্যোগের কারণে কৃষিঋণ (তাকাবি ঋণ) গ্রহণের জন্য দশ কোটি টাকা বরাদ্দ, ষোলো কোটি টাকা টেস্ট রিলিফ হিসেবে বিতরণ, ভূ-মালিকানার ক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণের জন্য পরিবারপিছু এক শ বিঘা জমির সিলিং বেঁধে দেওয়া, ভূমিহীনদের সরকারি জমিতে পুনর্বাসন করা ছিল এই পরিকল্পনার অংশ। শিল্পেও নীরব পরিবর্তনের সূচনা করার লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পকে জাগ্রত করে সেখানে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো; স্বাস্থ্য খাতের উন্নতির জন্য গ্রামপর্যায়ে ডাক্তার প্রেরণ ইত্যাদি যুক্ত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

প্রকৃতপক্ষে তিনি এই ‘অভ্যন্তরীণ সমাজবিপ্লবে’র সুফল সম্পর্কে বলেন, ‘বাংলাদেশে মানুষে মানুষে, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বৈষম্য থাকবে না। সম্পদের বণ্টনব্যবস্থায় সমতা আনতে হবে এবং উচ্চতর আয় ও নিম্নতর উপার্জনের ক্ষেত্রে যে আকাশচুম্বী বৈষম্য এত দিন ধরে বিরাজ করছিল সেটা দূর করার ব্যবস্থাদি উদ্ভাবনের জন্য আমি একটি বিশেষ কমিটি গঠন করার কথা বিবেচনা করছি। আজ আমরা বিশ্বসভ্যতার এক ক্রান্তিলগ্নে উপস্থিত। একটি নতুন বিশ্ব গড়ে তোলার স্বপ্নে আমরা বিভোর, একটি সামাজিক বিপ্লব সফল করার প্রতিশ্রুতিতে আমরা অটল, আমাদের সমস্ত নীতি—আমাদের সমস্ত কর্মপ্রচেষ্টা এ কাজে নিয়োজিত হবে।’ আর এ লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালেই ঘোষণা করেছিলেন, দেশের মহকুমাগুলোকে তিনি জেলা পর্যায়ে উন্নীত করে প্রশাসক ও জনগণের নৈকট্য স্থাপন করতে চান। আর প্রাদেশিক প্রশাসনের আমলাদের স্বাধীন দেশের উপযোগী করে গড়ে তুলতে তাদের মনোজগতে আনতে চান পরিবর্তন। মূলত এভাবেই সমাজের বিভিন্ন অংশে অন্তর্গত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বপ্নের ‘অভ্যন্তরীণ সমাজবিপ্লব’ সূচনা করেছিলেন। 

 

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য