kalerkantho

সোমবার  । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৭। ৩ আগস্ট  ২০২০। ১২ জিলহজ ১৪৪১

বাংলাদেশের হৃদয়ে ছিল মুজিবনগর

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

২৬ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বাংলাদেশের হৃদয়ে ছিল মুজিবনগর

বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব সম্পূর্ণ ভেঙে গেল। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার শপথ নিয়েছিল মুজিবনগরে। এই মুজিবনগর পৃথিবীর কোনো মানচিত্রে নেই, থাকার কথাও নয়। মুজিবনগর নামের জন্মকাহিনি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ঘটনাবলির চেয়ে কম আকর্ষণীয় নয়

 

 

ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টালে সময়ের নিয়ম ধরে প্রতিবছরই আসে মার্চ মাস, আর এই মার্চ মাস শুধু বাঙালিদের কাছেই নয়, বিশ্বের সব বাঙালির কাছেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাস। আর এই মার্চ মাসের ২৬ তারিখে জন্ম হয়েছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের। ভারত যেমন একটি গণপ্রজাতন্ত্রী, স্বাধীন, সার্বভৌম ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশ, বাংলাদেশও ঠিক তেমনিই একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, গণপ্রজাতন্ত্রী ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশ।

১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। আর সেটি প্রথম প্রচার করা হয় চট্টগ্রাম রেডিও স্টেশন থেকে। ২৫ তারিখে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আমি বগুড়ায় গিয়েছিলাম। দুর্গম রাস্তা, চারদিকে কারফিউ, অন্ধকার আর গোলাগুলির শব্দ। মুক্তিবাহিনীর কর্মীরা আমাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে আমাকে সশরীরে বালুরঘাটে ফিরিয়ে দেবেন, কথা ছিল ২৫ তারিখ রাত ১০টার আগেই আমি বালুরঘাট পৌঁছে যাব, কিন্তু তা হলো না। আমি সাত-আট ঘণ্টা দেরিতে পৌঁছেছি। বালুরঘাটের সামনেই একাধিক শরণার্থী শিবির গিজগিজ করছে, আমি সার্কিট হাউসের যে ঘরে ছিলাম হঠাত্ দেখি হুড়মুড় করে ১৫-২০ জন মুক্তিবাহিনীর লোক (যারা আমাকে নিয়ে গিয়েছিল।) চিত্কার করে বলতে থাকেন—‘স্যার, শোনেন আমাগো দ্যাশ স্বাধীন হইয়া গ্যাছে।’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম—‘আপনারা কোথায় খবর পেলেন?’ উত্তর এলো হিলিতে বসে আমাদের মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধারা চট্টগ্রাম রেডিওতে শুনেছে, আমি প্রশ্ন করলাম তোমাদের মধ্যে কে কে শুনেছে? তিন-চারটি ছেলে ঠেলেঠুলে আমার সামনে এসে বলল, আমরা শুনছি। আমি তখন ওদের বললাম, তোমরা একটু বাইরে যাও। আমি কলকাতার সঙ্গে কথা বলব। কলকাতায় ফোন করে বলার পর ওরা জানাল যে এখনো কোনো খবর আসেনি, তবে সংবাদ সংস্থা কোনো খবর দিয়েছে কি না তা দেখে নিচ্ছি। আমাকে বলা হলো—তুমি এখনই কলকাতায় চলে এসো, কারণ তুমি না এলে সঠিক খবর পাওয়া যাবে না। তা ছাড়া আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে তোমারই যোগাযোগ আছে।

রাত ১১টায় কলকাতায় পৌঁছে আর অফিসে গেলাম না। ভোর হতেই আমার সুরেন্দ্রমোহন এভিনিউর ফ্ল্যাটের বিপরীত দিকে বসবাসকারী মুক্তিযুদ্ধের চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, আবু হেনা কামারুজ্জামান ও অধ্যাপক ইউসুফ আলী আমাকে বললেন, তুমি ১২টার সময় তাজউদ্দীন সাহেবের কাছে এসো, আমরা সবাই থাকব। ওদের অনুরোধ অনুযায়ী ১২টার সময় তাজউদ্দীন সাহেবের কাছে গেলাম। তাজউদ্দীনের কাছে তখন বসে ছিলেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। তাজউদ্দীন সাহেব বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার একটি কপি আমাকে দিয়ে বললেন—এটা আগেই আমাদের পরিকল্পনা ছিল। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ ছিল—ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের যেকোনো রেডিও স্টেশন দখল করে তাঁর এই ঘোষণা কেউ পাঠ করে দেবেন। তাঁরা সবাই মিলে আমাকে বললেন, একটু বিভ্রান্তি হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীর নায়ক মেজর জিয়াউর রহমান ওই স্বাধীনতা ঘোষণার পত্রটি নিজের নামে চালিয়ে দেন, অর্থাত্ জিয়াই যেন স্বাধীনতা ঘোষণা করছেন, জিয়ার এই নিন্দনীয় দুর্মতি এবং নিজেকে প্রধানরূপে জাহির করার খবরটি পুরো চট্টগ্রামে রটে যায়, তখন চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের সংগঠক জহুর আহমদ চৌধুরী কয়েক হাজার স্বাধীনতা যোদ্ধাকে নিয়ে জিয়াকে ঘেরাও করেন। জিয়াকে দিয়ে বলানো হয় যে আমি যা করেছি তা অন্যায়, এটা বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা। আমি ক্ষমা চাইছি। এই ঘোষণাটি আমি বঙ্গবন্ধুর নাম করে আবার পাঠ করছি। এভাবেই জিয়াকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি পাঠ করানো হলো। বাংলাদেশ হলো একটি স্বাধীন-সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র।

বস্তুত ৭ই মার্চের বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এই ঘোষণাই স্বাধীনতার ঘোষণা, আর সেদিনই ছাত্ররা চেয়েছিলেন স্বাধীনতা ঘোষণা করা হোক। কিন্তু তিনি দেখতে চেয়েছিলেন ইয়াহিয়া, ভুট্টো তাঁদের দোসরদের নিয়ে আর কত অত্যাচার করতে পারেন। পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের হঠাত্ ন্যায়নীতিবহির্ভূত ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা মাত্র ৫০টি শব্দের মধ্যে ছিল—‘ইহাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাইতেছি যে, যে যেখানে আছ, যাহার যাহা কিছু আছে, তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও, সর্বশক্তি দিয়ে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করো। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও।

শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ ১৯৭১।’

এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব সম্পূর্ণ ভেঙে গেল। ছাত্রাবস্থায় বঙ্গবন্ধু মুসলিম লীগের ছাত্রসংগঠন করলেও তাঁর মোহ ভঙ্গ হয় গত শতকের চারের দশকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সিরাজগঞ্জ সফর ও জনসভায়। সিরাজগঞ্জে জিন্নাহর বক্তৃতা শুনে বঙ্গবন্ধু হতাশ হয়ে পড়েন, সে কথা তিনি চেপে রাখেননি। কলকাতার সাংবাদিকদের সে কথা তিনি জানিয়েছিলেন সেদিনই। ১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি যে বক্তৃতাটি ইংরেজিতে দেন তার বঙ্গানুবাদ এখানে তুলে ধরছি। এখানে পরিষ্কার ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে পাকিস্তানের প্রতি তাঁর মোহ ভঙ্গ হয়েছে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য তিনি স্বায়ত্তশাসন দাবি করেন। তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে সেই ভাষণটি ছিল এই রূপ—

“স্যার, আপনি দেখবেন ওরা ‘পূর্ব বাংলা’ নামের পরিবর্তে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম রাখতে চায়। আমরা বহুবার দাবি জানিয়েছি যে আপনারা এটাকে বাংলা নামে ডাকেন। ‘বাংলা’ শব্দটার একটা নিজস্ব ইতিহাস আছে, আছে এর একটা ঐতিহ্য। আপনারা এই নাম আমাদের জনগণের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে পরিবর্তন করতে পারেন। আপনারা যদি ওই নাম পরিবর্তন করতে চান তাহলে আমাদের বাংলায় আবার যেতে হবে এবং সেখানকার জনগণের কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে তারা নাম পরিবর্তনকে মেনে নেবে কি না। এক ইউনিটের প্রশ্নটা শাসনতন্ত্রে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। আপনারা এই প্রশ্নটাকে এখনই কেন তুলতে চান? বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারে কী হবে? যুক্ত নির্বাচনী এলাকা গঠনের প্রশ্নটারই কী সমাধান? আমাদের স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কেই বা কী ভাবছেন, পূর্ব বাংলার জনগণ অন্য প্রশ্নগুলোর সমাধানের সঙ্গে এক ইউনিটের প্রশ্নটাকে বিবেচনা করতে প্রস্তুত। তাই আমি আমার ওই অংশের বন্ধুদের কাছে আবেদন জানাব তারা যেন আমাদের জনগণের ‘রেফারেন্ডাম’ অথবা গণভোটের মাধ্যমে দেওয়া রায়কে মেনে নেন।”

বঙ্গবন্ধুর আগে পাকিস্তান সংসদে কুমিল্লার ধীরেন দত্ত একই সুরে বলেছিলেন—‘পূর্ব পাকিস্তান’ নয়—পাকিস্তানের সংবিধানে লেখা হোক ‘পূর্ব বাংলা’। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমতো তাঁর অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য একটি সরকার গঠন করা হয়। তাঁরা বাংলাদেশের মাটিতেই শপথ নেন।

স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার শপথ নিয়েছিল মুজিবনগরে। এই মুজিবনগর পৃথিবীর কোনো মানচিত্রে নেই, থাকার কথাও নয়। মুজিবনগর নামের জন্মকাহিনি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ঘটনাবলির চেয়ে কম আকর্ষণীয় নয়।

স্বাধীন বাংলাদেশের  প্রথম সরকার শপথ নেয় কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরে। শপথ নেওয়ার পর তাজউদ্দীন সাহেব আমাকে একপাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে অনুরোধ করলেন, ‘এই জায়গাটার নাম দেবেন না। তাহলে খান সেনারা কালই এই অঞ্চলে হামলা চালাবে।’ অনুষ্ঠান শেষে অফিসে ফিরে ‘আনন্দবাজার’-এর কার্যনির্বাহী সম্পাদক সন্তোষ কুমার ঘোষকে জানালাম তাজউদ্দীনের এই অনুরোধের কথা। তিনি আমাকে কপি লিখতে বলে নিজেও বসে পড়লেন কাগজ-কলম নিয়ে। খানিকক্ষণ পরে তিনি এসে বললেন, ‘লেখো, ডেটলাইন মুজিবনগর’। পরদিন ‘আনন্দবাজার’-এর পাঠকরা দেখলেন এই নতুন জায়গার নাম। গোটা বিশ্বের সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করেছিলেন জায়গাটা কোথায়; আমরা বলিনি। বস্তুত ঘটনাটির রেকর্ড রাখতে এবার বলতেই হলো। মুজিবনগর কোনো মানচিত্রে নয়, ছিল বাংলাদেশের হূদয়ে।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে আমাদের একান্ত ইচ্ছা ওই স্থানটির নাম সরকারিভাবে মুজিবনগরই রাখা হোক, কারণ ওই নামটি একসময় গোটা বিশ্বের কাছে একটি বড় জিজ্ঞাসা চিহ্ন হয়ে উঠেছিল। তাই ওই স্থানটির বৈপ্লবিক ঐতিহাসিকতা বিচার করে মুজিবনগরই রাখা হোক।

 

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

 

মন্তব্য